শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ মার্চ, ২০২০ ২১:১০

উপমহাদেশে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ

জয়ন্ত ঘোষাল, সিনিয়র সাংবাদিক, দিল্লি, ভারত

উপমহাদেশে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ

সংবাদপত্র গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম, এখনো পর্যন্ত বলিষ্ঠতম মাধ্যম রূপেই স্বীকৃত। সমাজে রেডিও টেলিভিশন চলচ্চিত্র প্রভৃতির বিস্তার ও প্রভাব যতই বাড়ুক না কেন সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রভাব কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ন হয়নি...

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক সেমিনারের একটি পুরনো ঘটনা বার বার মনে পড়ে। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। আলোচনা শেষে এক ছাত্রী খুব উত্তেজিত হয়ে আমাকে প্রশ্ন করেন, ভারতের সীমান্ত রক্ষাবাহিনী বিএসএফ যেভাবে এক অসহায় বাংলাদেশের কিশোরীকে হত্যা করেছে গুলি চালিয়ে তার জন্য আপনারা কী করছেন? অত্যাচারের পর সেই কিশোরীর ঝুলন্ত দেহ টাঙিয়ে তার ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। আপনাদের সরকার এহেন কাজ করেছে আর আপনারা এখানে এসে মৈত্রীর কথা বলছেন? তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ড. মনমোহন সিং।

সেদিন সেই সংবেদনশীল ছাত্রীটিকে বলেছিলাম আমি বা আমার মতো ভারতীয় সাংবাদিকরা আমরা কিন্তু ভারত সরকারের প্রতিনিধি নই। আমরা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন সাংবাদিক। আমরা রাষ্ট্রযন্ত্রের অঙ্গ নয়। কাজেই তুমি যেভাবে বিএসএফের এ অমানবিক বর্বর ঘটনার নিন্দা করছ, আমিও করছি। আমরা দেশ চালাই না। আমরা উপদেষ্টাও নই। আমরা সাংবাদিক। আমরা আমাদের সংবাদমাধ্যমে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছি। অবৈধ অনুপ্রবেশ যদি একটি পৃথক বিষয় হয় এহেন বর্বরোচিত আক্রমণ আরেকটি ভিন্ন বিষয়। এটি মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয়। রাষ্ট্রসংঘ পর্যন্ত যে বিষয়ে সর্বদা সচেতন। একইভাবে আমরা কাশ্মীরের উপত্যকায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে তার নিন্দা করি। কাশ্মীর সেনাবাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনীর নিন্দা নিয়েও আমরা সোচ্চার হই। যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে।

এ পুরনো ঘটনাটি আজ এত বছর পর আবার বললাম কেন? বললাম কারণ আজ শুধু ভারত বাংলাদেশ নয়, গোটা উপমহাদেশের মিডিয়াই ঠিক এ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রথমত সংবাদপত্রের সংবাদকর্মীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে কতটা মুক্ত থাকতে পারছে? এই সাংবাদিকরা শুধু রাষ্ট্রের ভিতরেই নয়, এ উপমহাদেশের একটা সীমান্ত থেকে আর এক সীমান্তে অনায়াসে চলে যেতে পারে। ভৌগোলিক সীমানা পেরোতে পাসপোর্ট ভিসা লাগে। কিন্তু একজন সাংবাদিকের মন হৃদয়ের অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ পেরিয়ে অন্য দেশের সাংবাদিকের মন তথা সেদেশের মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে। মানব জমিন অখন্ড। সেখানে মানুষ এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলে।

সংবাদমাধ্যম আর সাংবাদিকতার পরিসরটি তাই স্বাধীন, নিজস্ব, ভৌগোলিক সীমানার দ্বারা তাকে খন্ডিত করা ঠিক নয়। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ যতই তীব্র হোক, ভারত এবং পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। ভারত এবং বাংলাদেশের সাংবাদিকদের মধ্যেও তো কোনো মতাদর্শগত বিরোধ থাকতেই পারে না। তবে আজ আমরা যে অসময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি তা এ উপমহাদেশের এক সংকটজনক অধ্যায়। রাজনীতিতে এসেছে গণতন্ত্রের বদলে স্বৈরতন্ত্রের ঝোঁক। এ এক নতুন ধরনের একনায়কতন্ত্র, নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদ, নতুন ধরনের Populism, আমরা অতীতে এ রাজনীতিটা দেখিনি।

সংবাদমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ অবশ্য আজ হঠাৎ নতুন নয়। ১৯৪৩-৪৪ সালে যখন বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়েছে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারত স্টেটসম্যান আর অমৃতবাজার পত্রিকার মাধ্যমে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ তথ্যের ওপর প্রখর সেন্সরশিপ প্রয়োগ করত। সরকারি খাদ্য আমজনতার ওপর কতটা কীভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে তা গোপন করা প্রয়োজন ছিল যাতে মানুষের মধ্যে আশঙ্কা ছড়িয়ে না পড়ে। এমনকি দুর্ভিক্ষ শব্দটিও লিখতে বারণ করা হয়েছিল। সমস্যা হচ্ছে আজও এ নিয়ন্ত্রণ সংবাদমাধ্যমের ওপর আছে। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে ভারতে, পাকিস্তানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক শাসন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেও সেনাবাহিনীই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। পাক সংবাদমাধ্যমের ওপরও তাই আজ যতটা ইমরান খানের তথাকথিত রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর, তার চেয়ে বেশি সেনা নিয়ন্ত্রণের।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস তো বড় গর্বের। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে তো রাশি রাশি বই লেখা হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সামরিক শক্তি যখন গোটা দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছিল তখন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যে সাহস দেখিয়েছিলেন তা তো কেউ ভোলেনি। বহু ভারতীয়, বিশেষত ভারতের বাঙালি সাংবাদিকও তাদের পাশে দাঁড়ান। আবার শুধু ভারত কেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা সাংবাদিক তখন হাতে হাত মেলান। ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ১৯৭১ সালে ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি তখন ঢাকায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কভার করতে গিয়েছিলেন। পাক সেনা তখন পাশবিক গণহত্যা শুরু করার আগে বিদেশি সাংবাদিকদের এক লিখিত চিঠি দিয়ে নির্দেশ দেয় যে, তারা যেন সত্বর ঢাকা ছেড়ে চলে যায়। সাইমন ড্রিং একটি হোটেলের রান্নাঘরে লুকিয়ে ছিলেন। প্রচন্ড ঝুঁঁকি নেন। কিন্তু ২৫ মার্চ ঢাকায় কী হয়েছিল সেটা তিনিই প্রথম দুনিয়ার কাছে ফ্লাস করে দিয়েছিলেন। এম আর আখতার মুকুল নামের সাংবাদিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ‘চরমপত্র’ নামের একটি অনুষ্ঠানে সব পড়ে শোনাতেন। সেই ভয়াবহ সেনা নিয়ন্ত্রণকে উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়ায় সাংবাদিকরা। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে যে বিপ্লব তার পাশে দাঁড়ানোতেও Media blash আছে কিন্তু এই blash  হলো মানবিকতার স্বার্থে।

সংবাদপত্র গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম, এখনো পর্যন্ত বলিষ্ঠতম মাধ্যম রূপেই স্বীকৃত। সমাজে রেডিও টেলিভিশন চলচ্চিত্র প্রভৃতির বিস্তার ও প্রভাব যতই বাড়ুক না কেন সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রভাব কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ন হয়নি। তবে ইলেকট্রনিক মাধ্যম এবং তারপর ডিজিটাল মাধ্যমও এখন অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। কিন্তু ইলেকট্রনিক এবং বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যম এখন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আর এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফেক নিউজ বা অসত্য খবরের প্রচার। এ ধরনের অসত্য খবরের মোকাবিলা মস্ত বড় সমস্যা, বিশেষত সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেওয়ার জন্য, সন্ত্রাসের বীজ বপন করতে কায়েমি স্বার্থ যখন এ ধরনের অসত্য প্রচার ডিজিটাল বা সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যবহার করা হয় তখন সাংবাদিকরা তার মোকাবিলা করবে কীভাবে? বাংলাদেশের ছবি বলে ফেসবুক টুইটে দেখানো হচ্ছে কোন ছবি দেখা যাচ্ছে তা আদৌ বাংলাদেশেরই নয়।

সংবাদমাধ্যমের মালিক আর সাংবাদিকদের সর্বদা এক করে দেখা ঠিক নয়। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক প্রয়াত অশোক মিত্র একদা আমাকে বলেছিলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তো সংবাদপত্রের মালিকের স্বাধীনতা। তোমরা তো উৎপাদন ব্যবস্থার একটি নাটবল্টু। আজ এত বছর পরও মাঝে মাঝেই সে কথা মনে পড়ে।

এ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই তাই আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। প্রথমত ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নানা দিক আছে, তার মধ্যে সাংবাদিককুল এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। দুই দেশের মধ্যে যৌথ উদ্যোগে আরও পত্র-পত্রিকা এমনকি সংবাদপত্র প্রকাশিত হলে আমি খুশি হব। খুব প্রয়োজন বলেও মনে হয় কিন্তু এ প্রকল্পের অনেক বাণিজ্যিক দিক আছে এটি কতটা সম্ভব কতটা অসম্ভব তাও বিচার করতে হবে।

পাকিস্তানে ১৯৮৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত নানা সময়ে পাঁচবার গিয়েছি। সব সময়ই মনে হয়েছে, পাকিস্তানে সাংবাদিকরাও আমাদের মতোই রক্ত মাংসের মানুষ। তারাও যে সরকারের ক্ষমতাসীন হন তারা ভালো কাজে সাধুবাদ দেয় আর খারাপ কাজে নিন্দা করেন। সব পেশাতেই ভালো থাকে খারাপ থাকে। চিকিৎসক পুলিশ শিক্ষক ভালো হয়, খারাপ হয় তার জন্য সব সংবাদমাধ্যমকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়।

গণতন্ত্র সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শক্তি। সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্র নামক ধারণীর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম নিয়েছে। বাংলাদেশ পাকিস্তান ভারত তথা এ উপমহাদেশের সর্বত্র সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এক জরুরি দাবি। শাসক দলের চরিত্র শুধু এ উপমহাদেশে কেন গোটা বিশ্বেই একই রকম। তাই শাসক দলের দমননীতির বিরুদ্ধে চিরকাল যেভাবে সংবাদমাধ্যম ঐক্যবদ্ধ থেকেছে আজও তা থাকা প্রয়োজন।


আপনার মন্তব্য