Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ অক্টোবর, ২০১৭ ২৩:৪৮

চিওড়া কাজীবাড়ির অপর নাম ‘তারায় ভরা বাগান’

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

চিওড়া কাজীবাড়ির অপর নাম ‘তারায় ভরা বাগান’
কাজীবাড়ি মসজিদ ও কবরস্থান। এখানে কাজী জহিরুল কাইয়ুম, কাজী জাফর ও কাজী সিরাজের কবর রয়েছে

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের স্বনামখ্যাত চিওড়া কাজীবাড়ি। বহু বছর আগে এই বাড়ির এক সন্তান বিচারক পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তখন বিচারককে বলা হতো ‘কাজী’। সেই সুবাদে এই বাড়ির নাম হয়ে যায় কাজীবাড়ি। এই বাড়ির সন্তানদের অনেকেই নিজ গুণে সরকারি ও বেসরকারি উচ্চপদে আসীন হয়ে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের সেবা করেছেন। এখনো অনেকে করে চলেছেন। তারা প্রতিভার দ্যূতি ছড়িয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। এ জন্য এই বাড়িকে বলা হয়, ‘তারায় ভরা বাগান’।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ বাড়ির এক সন্তান উজ্জ্বল তারা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি শিল্পপতি কাজী জহিরুল কাইয়ুম। বঙ্গবন্ধু তাকে ‘কাইয়ুম ভাই’ বলে ডাকতেন। কাজী কাইয়ুম (জন্ম : ১৪ ডিসেম্বর ১৯১৮-মৃত্যু : ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১) ছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ছিলেন তিনি। দলের জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করার সুখ্যাতিও ছিল তার। দেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়তে বিভিন্ন দেশে গিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। জহিরুল কাইয়ুমের ছেলে কাজী রফিক বলেন, বাবা সারা জীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তিনি নেওয়া নয়, দেওয়ার রাজনীতি করতেন। এই বাড়ির আরেক সন্তান কাজী জাফর আহমেদ (জন্ম : ১ জুলাই ১৯৩৯, মৃত্যু : ২৭ আগস্ট ২০১৫) জেনারেল এরশাদের আমলে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তার মেয়ে কাজী জয়া বলেন, বাবা মানুষের জন্যই রাজনীতি করেছেন। তথাকথিত রাজনীতিকদের মতো সম্পদের পাহাড় গড়েননি। সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা কাজী সিরাজ ছিলেন একজন দক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। চমৎকার লিখতেন। তার বিরুদ্ধবাদীরাও গভীর মনোযোগে তার লেখা পড়তেন। ৭০ বছর বয়সে গত ৩১ আগস্ট তিনি মারা যান।

কাজী পরিবারের আদি পুরুষ বিচারক কাজী শাহাবুদ্দিন। এ বাড়ির সন্তান কাজী সিরাজুদ্দিন ছিলেন নিজামের শাসনামলে ভারতের হায়দরাবাদের প্রধান বিচারপতি। কাজী সিরাজুদ্দিনের তিন পুরুষ পর চাকলা-রওশনাবাদ পরগনার প্রধান বিচারপতি হন কাজী আজগর আলী। তার সময় থেকেই এই বাড়ি কাজীবাড়ি নামে পরিচিত হতে শুরু করে। এ পরিবারের ৪র্থ পুরুষ নবাব মোশারফ হোসেন চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা ও আইনমন্ত্রী। তার ভাই খান বাহাদুর মোখলেসুর রহমান ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ)। ৫ম পুরুষ কেজি আহমেদ ছিলেন পাকিস্তানে প্রথম বাঙালী শিল্পপতি। চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ও মিশুক মুনীর তার মেয়ের জামাতা। কাজী মকবুলার রহমানও ছিলেন শিল্পপতি। তার ভাই ড. কাজী নঈমুর রহমান পাকিস্তানে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের (বর্তমান পূবালী ব্যাংক) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ড. নঈমুর রহমানের স্ত্রী সারোয়ারী রহমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। এ পরিবারের আরেক সদস্য কাজী বজলুর রহমান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। ১৯২০ সালে তিনি চট্টগ্রামের কুখ্যাত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডেভিডকে হত্যা করেন। ষষ্ঠ পুরুষ হাবিব উদ্দিন মনি স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি স্বাধীনতা পদক অর্জন করেন। কৃষক-শ্রমিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কাজী আফতাবুল ইসলাম গেদু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। কাজী আজিজুল হক বরিশালের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করায় পাকিস্তানিরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। আজিজুল হক মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। এ বাড়ির কাজী আনোয়ারুল আজীম পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কাজী জাফরের ছোট ভাই কাজী ফারুক আহমেদ বিখ্যাত শিক্ষক নেতা।

কাজী পরিবারের সদস্য ভাষাসৈনিক কাজী হাবিবুর রহমান (৮৮) বলেন, আমরা মানুষের পাশে থাকায় তারা সব সময় আমাদের ভালোবাসা দিয়েছেন। তাই এক ধরনের গৌরব বোধ করি। বাংলাদেশ মোটর পার্টস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কাজী ফজলুর রহমান (৮১) বলেন, পরিবারের সদস্যদের কৃতিত্বের জন্য গর্বিত। পরবর্তী প্রজন্মও যেন জনসেবায় ব্রতী হয়, এটাই প্র্রত্যাশা। ৭ম পুরুষ ব্যাংক কর্মকর্তা কাজী ফখরুল আলম বলেন, এই পরিবার থেকে জহিরুল কাইয়ুম ও কাজী জাফরের মতো আরও সমাজসেবক বেরিয়ে আসুক। কুমিল্লার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আহমেদ আলী বলেন, জহিরুল কাইয়ুমের সংগ্রামী জীবন থেকে এই প্রজন্মের অনেক কিছুই শেখার আছে। কিন্তু জন্ম ও মৃত্যুর দিনেও তাকে স্মরণ করা হয় না। কাজীবাড়ির সামনে বিরাট পুকুর। শান বাঁধানো ঘাট আর সুদৃশ্য মসজিদ। সামনে বড় কবরস্থান। সেখানে ঘুমিয়ে আছেন বাড়ির কৃতী সন্তানরা। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছে এ পরিবারের ১০ হাজারেরও বেশি সদস্য।


আপনার মন্তব্য