Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৩৫
জঙ্গিবাদের হুমকি গুরুত্ব না দেওয়ায় আজ এ দশা
জিন্নাতুন নূর
জঙ্গিবাদের হুমকি গুরুত্ব না দেওয়ায় আজ এ দশা
ড. দেলোয়ার হোসেন

জঙ্গিবাদের হুমকিকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড.  দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী ‘টেররিজম’ বা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নত দেশগুলোর যে ধরনের প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল তা নেওয়া হয়নি।

এমনকি এ বিষয়টিকে যতটা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার কথা ছিল তাও করা হয়নি। জঙ্গি হামলার ফলে বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে ভয়ঙ্কর প্রভাব তৈরি হতে পারে তা খতিয়ে দেখা হয়নি। আর বর্তমানে জঙ্গিবাদের হুমকিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে সেটি ‘অকার্যকর’। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন এসব কথা বলেন। অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, তুরস্কে গতকালের সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনাটি রাজনৈতিক কিন্তু কিছুদিন আগেও সেখানে জঙ্গি হামলা হয়েছিল। অর্থাৎ একাধিকবার একটি রাষ্ট্রে হামলার পাশাপাশি বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা, শক্তিশালী সুরক্ষিত রাষ্ট্র এবং যেসব রাষ্ট্র এ হামলার জন্য প্রস্তুত নয় সেখানেও হামলা হচ্ছে। এ মুহূর্তে এ হুমকি প্রতিরোধে কী ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ বিশ্ব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একে বড় হুমকি বিবেচনা করে একে যে ধরনের গুরুত্ব দেওয়ার কথা তা দেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের গৃহীত পদক্ষেপে পরিবর্তন আনা উচিত। তিনি আরও বলেন, তুরস্কের ঘটনাটি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। এটি দেশটির জন্য নতুন কিছু নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীনদের উত্খাত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা এক সময় সামরিক শাসকরা নিয়মিত ঘটাত। সম্প্রতি মিসরেও আমরা এক ধরনের সফল সামরিক অভ্যুত্থান দেখেছি। আর এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে যতটা না আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক বিষয় যুক্ত তার চেয়ে বেশি দেশটির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিষয় জড়িত। কিন্তু অতি সম্প্রতি কাকতালীয়ভাবে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের বিশাল হুমকি আমরা লক্ষ্য করছি, যা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক। সেখান থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জঙ্গি হামলা হচ্ছে। এটি বিশ্বের জন্য এক ধরনের নতুন হুমকি। সমগ্র বিশ্বই নাইন/ইলেভেনের পর নতুন একটি হুমকির সঙ্গে পরিচিত হয়। সে হুমকিকে যতটা গুরুত্বসহকারে মোকাবিলা করা উচিত ছিল, তা করা হয়নি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে জঙ্গি দমনের জন্য যেভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল সেটি সফল হয়নি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ করার বিষয়টি যুক্ত হয়। এর ফলে আজ ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়া এই পুরো বেল্টের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা জন্ম নিয়েছে। আমি মনে জঙ্গিবাদী এই শক্তিটি বেশ বড় আকারে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে, অনেক সময় বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যখন জঙ্গি হামলা হয় তখন এ হামলা প্রতিরোধে দেশগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু আমরা যখন দেখি যথেষ্ট সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্সের মতো একটি দেশে বারবার হামলা চালানো হয় তখন বুঝতে হবে, জঙ্গিবাদী হামলা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে হতে পারে এবং এটি প্রতিরোধে যত ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হোক না কেন, তা থামানো যাবে না।   অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, জঙ্গিবাদের বিষয়টিকে ক্ষুদ্র কূটনৈতিক বা জাতীয় স্বার্থের বাইরে থেকে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলোর এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর যেসব দেশ এর ভিকটিম নয়, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার বাইরের দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে, রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে জঙ্গিবাদকে সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তবে জঙ্গিবাদ দমনের জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন উপায়ের কথাও বিবেচনায় আনতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত জরুরি এবং এই পদক্ষেপগুলো আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সাধারণের মনে প্রশ্ন উঠবে এ ভূমিকা কতদিন স্থায়ী হবে। কিংবা দ্বিধা থাকতে পারে যে, এর পেছনে বিভিন্ন ক্ষুদ্র স্বার্থ বিবেচনা করে এ ভূমিকায় কোনো শিথিলতা আসবে কিনা। আমি মনে করি, এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন তৈরি করতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে যুক্ত করার জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকারকেও রাজনৈতিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে নাগরিক সমাজকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বড় বিষয় হচ্ছে সদিচ্ছা। এখানে উগ্রবাদী চেতনা বিকশিত হচ্ছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলাগুলো সংগঠিত হচ্ছে। জঙ্গিবাদ দমনে আমাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। কোনো একটি ঘটনা ঘটলেই যে সরকার প্রতিক্রিয়া দেখাবে এমন অবস্থান থেকে সরে এসে সরকারকে প্রোঅ্যাক্টিভলি কাজ করতে হবে। তরুণদের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদে তরুণদের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি এক ধরনের ‘গ্লোবাল ফেনোমেনা’। যারা ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকে সিরিয়া চলে যাচ্ছে, সেখানে যুদ্ধ করছে তারাও কিন্তু তরুণ। আমাদের দেশে যেসব তরুণরা এই ধরনের হামলা করছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা রাষ্ট্র পরিবর্তন করছে। কিন্তু এই আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে যে তরুণরা তারা শুধু বাহক। তাদের এ কাজে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, এসব কাজের জন্য রিক্রুট করা হচ্ছে। আর দেশে বা দেশের বাইরে যারা তাদের রিক্রুট করছে তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্য আছে। এই শক্তি তরুণদেরই সব সময় টার্গেট করে, তাদের ওপর বিনিয়োগ করে। মাদ্রাসাভিত্তিক এবং যারা আর্থিকভাবে দুর্বল, আবার যারা সচ্ছল ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সেই তরুণদের এই শক্তি এক ধরনের উগ্র ধর্মীয় চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত করছে। আমরা জানি বাংলাদেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, এখানে এক ধরনের সংকট আছে। এখানে যুবসমাজের বড় অংশই দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তাদের সামনে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রলোভন আবার আমাদের দেশীয় মূল্যবোধের মধ্যেও সংকট দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তরুণরা যাতে বিপথগামী হতে না পারে সে জন্য দেশের রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ ও ক্ষমতাসীনরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন না। গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেখানে কোনো ধরনের দিক-নির্দেশনা নেই। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে তরুণদের যে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা তা দেখা যাচ্ছে না। যুবসমাজ জানে না তারা কোনদিকে যাবে। ফলে তাদের সহজেই এ ধরনের নেতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এমনকি আমাদের সমাজের সংকটগুলোও ‘অ্যাড্রেস’ করা হচ্ছে না। সমাজে এক ধরনের নৈরাজ্যজনক অবস্থা চলছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে তদারকি করা হচ্ছে না। আমাদের সামাজিক জীবনধারায় যে নৈরাজ্য চলছে তা চিহ্নিত করা হচ্ছে না। সমাজ শুধু রাজনীতি, ক্ষমতা ও লাভ এগুলোর পেছনেই ছুটছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow