Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১২ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ জুন, ২০১৬ ২৩:০৩
পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠছে গার্মেন্ট খাত
বাংলাদেশের পোশাক হবে বিশ্বব্র্যান্ড
জিন্নাতুন নূর
পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠছে গার্মেন্ট খাত

রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে এবং বিদেশি ক্রেতাদের আকর্ষণে দেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোকে পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিশ্বব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোক্তারাও পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা নির্মাণে এখন আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে গার্মেন্ট খাতে যারা ভালো করছেন তাদের অধিকাংশই সবুজ পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণ করছেন বা এ প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছেন। আর এ বিষয়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকেও বিক্রেতারা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। পোশাক কারখানা মালিকদে সংগঠন (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা যায়, এরই মধ্যে পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার স্বীকৃতি হিসেবে দেশের ২৮টি কারখানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের লিড সনদ পেয়েছে। আর এ স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে আরও ১১৮টি কারখানা। উদ্যোক্তারা জানান, পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় রোধ করে পরিবেশবান্ধব কারখানায় তৈরি পোশাক বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য যেমন আলাদা সুনাম বয়ে আনবে একইভাবে ভালো পরিবেশে কাজ করায় শ্রমিকরাও বেশি পোশাক উৎপাদন করতে পারবেন। বিশ্ববাজারে সবুজ কারখানায় তৈরি পোশাকের চাহিদা ভালো থাকায় বেশি দামে পোশাক বিক্রি করে আগের চেয়ে উদ্যোক্তাদেরও অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিখ্যাত পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানায় তৈরি পোশাক বেশি পরিমাণে কিনবে। বিজিএমইএর দেওয়া তথ্য, ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা পেলে ২০১৬ সালের শেষে বাংলাদেশের দেড়শর বেশি কারখানা লিড সনদ অর্জন করবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘লিড’ হচ্ছে সবুজ কারখানা নির্মাণের ব্যাপারে সনদ প্রকল্প, যার মাধ্যমে একটি মানসম্পন্ন ও ভালো কারখানা ভবন শনাক্ত করা হয়। আর সবুজ কারখানা হিসেবে সনদ পেতে একটি কারখানাকে সব ধরনের কমপ্লায়েন্স সুবিধা পূরণ করতে হবে। এ ছাড়া কারখানায় ব্যবহূত সব পণ্যই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (জিবিসি)-এর মাধ্যমে পরীক্ষিত হতে হবে। বর্তমানে বড় বড় কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যবসার প্রসার করতে সবুজ কারখানা তৈরির দিকে মনোযোগী হচ্ছে। এর মাধ্যমে পানির অপচয় রোধ ও জ্বালানি সাশ্রয় করে বয়লারের স্টিম অন্য কাজে লাগিয়ে এবং ইটিপির ময়লা পানি অন্য কাজে ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় পোশাক উৎপাদন করা সম্ভব। সাধারণত ধরন অনুযায়ী গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল সবুজ কারখানাগুলোকে ‘প্লাটিনাম’, ‘গোল্ড’, ‘সিলভার’ ও সাধারণ ক্যাটাগরিতে সনদ দেয়। বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাককে বিশ্বব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দেশীয় পোশাক উদ্যোক্তারা এখন পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা নির্মাণে আগ্রহী। বিশেজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা থেকে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। এর ফলে একদিকে শতকরা ২৪ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ৫০ শতাংশ পানির অপচয়ও কমে। এর পাশাপাশি কারখানার পরিবেশ সুন্দর হয়, এর সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া গেলে, নিরাপত্তা বজায় থাকলে পোশাক উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। যদিও সবুজ কারখানা তৈরিতে সাধারণ কারখানার চেয়ে খরচ বেশি হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কারখানার মালিক ও শ্রমিক উভয়ের জন্য লাভজনক। উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ গ্রিন নিট পোশাক কারখানা নির্মাণে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করবে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইডিএস গ্লোবালের সঙ্গে বিকেএমইএ চুক্তিও করেছে; যার মেয়াদ দুই বছর। এ চুক্তির আওতায় যেসব প্রতিষ্ঠান সবুজ কারখানা করতে আগ্রহী তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। এজন্য বিকেএমইএতে ‘গিন ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট’ নামে একটি সেল গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই বছরে বিকেএমইএ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও অন্য অঞ্চলে ৫০টি সবুজ কারখানা উন্নয়ন করবে। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছে কানাডাও। দেশের সবুজ কারখানাগুলোর মধ্যে ‘ক্ল্যাসিক ফ্যাশন’ এরই মধ্যে লিডের প্লাটিনাম সনদ পেয়েছে। গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরের এ কারখানায় এখন মোট চার হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল্লাহ আজিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হলে আমাদের আরও বেশি সবুজ কারখানা নির্মাণ করতে হবে। এখন যারা পোশাক ব্যবসায় ভালো করছেন তারা সবাই সবুজ কারখানা নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহী।’ তিনি বলেন, “ভালো পরিবেশে শ্রমিকরা ভালোমতো কাজ করছেন। বিদেশি ক্রেতারা জানিয়েছেন যে, আমাদের তৈরি পোশাকে যদি ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ লেখা ট্যাগ থাকে তখন বিদেশি ক্রেতাদের কাছে তার কদর আরও বেড়ে যায়। এর ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে আমরা এখন পোশাকের জন্য বাড়তি মূল্যের দাবিও জানাতে পারব। এতে রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে। আশা করছি পরিবেশবান্ধব কারখানা তৈরির মাধ্যমে পোশাক খাতে ‘সবুজ বিপ্লব’ ঘটবে।”

 

বাংলাদেশে প্রথম দিকে এবা গ্রুপ, ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও, ভিয়েলাটেক্স, প্লামি ফ্যাশন লি. এবং এনভয় টেক্সটাইল সবুজ কারখানা গড়ে তুলে নতুন এ ধারণার সঙ্গে অন্যদের পরিচয় করিয়ে দেয়। এ কারখানাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পোশাক তৈরি এবং বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি ‘ব্র্যান্ড’ ইমেজ তৈরিতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরিতে এ কারখানাগুলোর অনেকটিতেই এখন সোলার প্যানেল লাগানো হয়েছে। আবার কারও পুরো কারখানাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।

এবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিল্লুর রহমান মৃধা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গ্রিন কারখানা তৈরির কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাকের ব্র্যান্ড তৈরি হবে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষই লাভবান হবেন। মালিকরা শ্রমিকদের থেকে বেশি উৎপাদন পাবেন আর শ্রমিকরাও নিরাপদ পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার সুযোগ পাবেন। আন্তর্জাতিক বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সবুজ কারখানা, তার কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে অনেক গুরুত্ব দেয়। এমনকি পশ্চিমা দেশের ক্রেতারাও যে পোশাকটি কিনছেন তা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে কিনা, তা বিবেচনায় এনে পোশাক কেনেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow