Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২০ এপ্রিল, ২০১৮ ২২:০৫
পাট থেকে সোনালি ব্যাগ
শনিবারের সকাল ডেস্ক
পাট থেকে সোনালি ব্যাগ

পাট নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন অনেক দিন। অবশেষে সুফল মিলল তার। পাট থেকে পলিথিন ব্যাগ উদ্ভাবন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান। তিনি এই ব্যাগের নাম দিয়েছেন  ‘সোনালি ব্যাগ’। পাট থেকে সেলুলোজ আহরণের পর প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় সিট। তা থেকেই তৈরি হয় ব্যাগ। উদ্ভাবক ড. মোবারক আহমদ খান বলেন, পাট থেকে তৈরি পলিথিন ব্যাগ প্রচলিত পলিথিনের তৈরি ব্যাগের চেয়ে অধিক কার্যকর। এ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করার পর ফেলে দিলে সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। উপরন্তু তা মাটিতে সারের কাজ করে। সহজলভ্য উপাদান এবং সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এ পলিথিন ব্যাগ বিদেশে রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ সোনালি ব্যাগ আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রাথমিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে দৈনিক ৩ টন। সরকারিভাবে এ ব্যাগ উৎপাদন হলেও বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পাটকলগুলোতেই এর উৎপাদন হতে পারে। তাছাড়া যে কেউ ক্ষুদ্র পরিসরে এর কারখানা স্থাপন করতে পারে। স্বল্প পরিমাণে সোনালি ব্যাগ উৎপাদিত হওয়ায় এর বিপণন এখনো সীমিত। প্রতি ব্যাগের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা। অধিক পরিমাণ উৎপাদিত হলে দাম প্রতিটি ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন অনেকে।  এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সোনালি ব্যাগ প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হতে পারে। প্রচলিত ‘অক্ষয়’ পলিথিন ব্যাগের কারণে পরিবেশ দূষণ, ভূমির উর্বরতাশক্তি হ্রাস, নদনদী ভরাট, শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি ইত্যাদি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব যদি সোনালি ব্যাগ প্রয়োজন মতো উৎপাদন, বাজারজাত ও ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এর ফলে পাটের অর্থনীতিও অনিবার্যভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে বাজারে প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ১৯৮২ সালে। কিন্তু যে ইথাইলিন থেকে পলিথিন বা পলিথাইলিন উৎপাদিত হয় তা পরিবেশের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকারক। এ পলিথিন ব্যাগ কোনোভাবেই এমন কি পুরিয়েও ধ্বংস করা যায় না। ফলে জমিতে, পানিতে, ড্রেনে যেখানেই ফেলা হোক না কেন, তা অক্ষত থাকে।

পাটের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। উড়োজাহাজ শিল্প, গাড়িশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাটের ব্যবহার হচ্ছে। পাটের মন্ড থেকে কাগজ তৈরির কথা আমরা অনেকবার শুনেছি। এক সময় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী কাগজ তৈরির মন্ডের যে চাহিদা রয়েছে তার ১৫ শতাংশও যদি পাট পূরণ করতে পারে তবে বাংলাদেশের পাট-অর্থনীতি গার্মেন্টর চেয়েও বেশি অবদান রাখতে পারবে। বাংলাদেশেরই এক বিজ্ঞানী পাট থেকে ‘মিহিতন্তু’ আবিষ্কার করেছেন। এই তন্তু হতে পারে তুলাজাত তন্তুর বিকল্প। আবিষ্কার কর্তার দাবি, গুণে-মানে তুলাজাত তন্তুর চেয়ে পাটের মিহিতন্তু উত্তম। এ দিয়ে উত্তম কাপড় তৈরি হতে পারে এবং দেশের পাটকলগুলোতে সামান্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সাধন করে মিহিতন্তু দিয়ে কাপড় উৎপাদন করা সম্ভব। অত্যন্ত দুঃখজনক, পাটের মন্ড দিয়ে কাগজ তৈরির কথা যেমন আর শোনা যায় না, তেমনি মিহিতন্তু দিয়ে কাপড় তৈরির কথাও শোনা যায় না। আমরা জানি না, পাটের পলিথিন ব্যাগ তৈরির সম্ভাবনাও অবহেলা-উপেক্ষার শিকার হবে কিনা। পাটকে বলা হয় ‘সোনালি আঁশ’। পাট যে এর চেয়েও অনেক কিছু, বিভিন্ন আবিষ্কারে তার প্রমাণ আমরা পাই। একমাত্র পাটই দেশের অর্থনীতিকে আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জমিতে এই পলিথিন ব্যাগ পড়ার কারণে জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। নদনদী ও জলাশায়ে পতিত হওয়ার ফলে সেগুলোর বুক ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর জলাবদ্ধতার সে সংকট, তার পেছনেও রয়েছে এই পলিথিন ব্যাগ। তা ড্রেনে পড়ে তার পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা অকার্যকর করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে তোলার পেছনে এর বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। ভূমিকম্প, বজ্রপাত, আল্ট্রাভায়োলেট রেডিয়েশন ইত্যাদির জন্যও এই পলিথিনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পলিথিন বা পলিথিন ব্যাগের এই পরিবেশ বিপর্যয়কর নানামুখী প্রতিক্রিয়ার কারণে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এর বদলে পাটের, কাগজের ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করার কথা বলা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ হয়নি। বিকল্প ব্যাগের ব্যবহার তেমনভাবে বাড়েনি।

পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ঢাকা শহরেরই প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহূত হচ্ছে। যা এই শহরের জলাবদ্ধতার জন্য ৮০ শতাংশ দায়ী এই পলিথিন ব্যাগ। সারা দেশে পলিথিন ব্যাগ কত ব্যবহূত হয় এবং তার কী ধরনের বিরূপতা পরিবেশ, উৎপাদন ও জীবনযাত্রায় পতিত হয়, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব এবং ব্যবস্থা গ্রহণের অক্ষমতাই এজন্য মূলত দায়ী। এটা কি, পলিথিন ব্যাগ সহজে বহনযোগ্য, হাত বাড়লেই পাওয়া যায়, এবং দামও কম। এ কারণেই মানুষ তা ব্যবহার করছে। তাদের মধ্যে সচেতনতারও অভাব রয়েছে। বলা নিষ্প্রয়োজন, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ যদি বন্ধ করা সম্ভব হতো তাহলে এর ব্যবহারও আপনা আপনি রহিত হতো। আরও লক্ষ্য করার বিষয়, বাজারে উপযুক্ত বিকল্পও যথেষ্ট পরিমাণে নেই। এমতাবস্থায়, সোনালি ব্যাগ সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প হতে পারে। একদিকে প্রচলিত পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার ডেডস্টপ অন্যদিকে সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার জনপ্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে পরিবেশ ঘাতক পলিথিন ব্যাগের ক্ষতি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow