Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ২১:৪৪
পাওয়ার অব শি
নারী অধিকার বাস্তবায়নে
তানিয়া তুষ্টি
নারী অধিকার বাস্তবায়নে
ছবি : রাফিয়া আহমেদ

নারীর অধিকার সংরক্ষণে নতুন প্ল্যাটফরম ‘পাওয়ার অফ শি’। কাজ করবে নারীদের জীবনে আসা নানা রকম বাধা-বিপত্তির বিরুদ্ধে। সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে পাওয়ার অফ শি তুলে আনবে আলোকিত নারীদের, যারা এক সুতোয় গাঁথবে সব নারী শক্তিকে। আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে শি ক্লাব।

সমাজের নানা স্তরে নারীদের অপদস্তের শিকার হতে হয়। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সব সমাজে নারী নির্যাতনের মাত্রা একই। পার্থক্য শুধু অপদস্তের ধরনে। তথাকথিত পুরুষ শাসিত সমাজে নানা বিষয়ে সচেতনতা বাড়লেও নারী নির্যাতনের এই সংস্কৃতির যেন বিকার নেই। আজ যখন নারীর হাতে অর্থনৈতিক মুক্তি মিলেছে, পুরুষের ওপর নির্ভরতা কমেছে, সংসারে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা বেড়েছে, তখনো নারীকে হতে হচ্ছে নির্যাতনের শিকার। সমাজের উঁচুতলার ভদ্রলোকের হাত থেকেও রেহাই নেই সেসব নারীর। অথচ তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত সংস্কৃতির চর্চা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিক্ষাগত যোগ্যতায় বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক। যেখানে নারীর অবদান কোনো অংশে কম নেই। তখনও ক্রমাগত নারী নির্যাতনের বিষয়টি চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে মিডিয়াকর্মী সাবিনা স্যাবির। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সাংবাদিকতা, সংবাদ উপস্থাপনের সঙ্গে তিনি জড়িত। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন নারীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনেক অসামঞ্জস্য। তাই নিজেই উদ্যোগী হয়ে গড়ে তুলেছেন পাওয়ার অফ শি নামের একটি ক্লাব। সেখানে আটজনের একটি স্বেচ্ছাসেবক টিম কাজ করে। যারা কাজ করবে প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, নিজের এলাকায় বা নিজের প্রতিষ্ঠানে। প্রতিটি জায়গায় বিভিন্ন গ্রুপ বা ইউনিট এর মাধ্যমে সচেতনতামূলক এবং সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

পাওয়ার অফ শি যাত্রা শুরু করেছে ২০১৮ সালের জুন মাসে। এর মূল উদ্দেশ্য মেয়েদের ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা, মাদক, সাইবার ব্লাকমেইলিং, পারিবারিক নির্যাতন ও সামাজিক হেনস্তায় আইনিসহ নানাভাবে সহায়তা করা। সমাজের যেকোনো স্তরের নারী যখন তখন এই ধরনের সমস্যায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ আর্থিক মানসিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল অবস্থানে আছেন। পাওয়ার অফ শি সেসব নারীর পাশে দাঁড়াতে চায় সহায়তা নিয়ে। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, গার্মেন্টসে হ্যাপি পিরিয়ড নামে প্রোগ্রামের আয়োজন করেছে। এই সচেতনতামূলক প্রোগ্রামের মাধ্যমে মেয়েদের ঋতুকালীন সচেতনতা বাড়ানো হয়। প্রতিটি অফিসে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফার্স্ট এইড বক্সের সাথে কয়েকটি সেনেটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট রাখার পরিকল্পনা দিয়েছে পাওয়ার অফ শি। পাওয়ার অফ শি এর আয়োজনে অনলাইনে বেশ কিছু লাইভ প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। সেখানে নারীদের সমস্যা তুলে ধরে সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরামর্শদাতা হিসেবে থাকেন সমস্যা সম্পর্কিত ক্ষেত্রের বিজ্ঞজনেরা। যেমন স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ দেন কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তার, আইনি পরামর্শ দেন বিশিষ্ট আইনজীবীরা। সমস্যাপীড়িত ও আর্থিকভাবে অসহায় নারীদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা রাখছে পাওয়ার অফ শি। এই ক্লাবের উদ্যোক্তা সাবিনা স্যাবি চান বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তের সমস্যাপীড়িত নারী যেন এর সুবিধা ভোগ করতে পারেন। তাই যে কেউ চাইলে পাওয়ার অফ শি ক্লাবে সদস্য হতে পারেন। সদস্যরা নিজেদের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সাহায্য করতে পারবেন তার পরিচিতদেরও। এই ক্লাবে শুধুমাত্র নারীরা সদস্য হতে পারেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তদূর্ধ্ব যে কোনো বয়সী কেউ আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করতে পাওয়ার অফ শি এর অফিসিয়াল পেজের লিংকwww.facebook.com/shespower- এ যেতে হবে।

এমন একটি সময় উপযোগী উদ্যোগে নিজেকে শামিল কেন করলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সাবিনা স্যাবি জানান, আমার মেয়ে যখন থ্রিতে পড়ে তখন তার স্কুলে একটি ফ্যাশন্য শো তে নাম দেয়। উচ্ছ্বাস আনন্দে তার ঘুম খাওয়া ছিল না। কিন্তু হঠাৎ একদিন মন খারাপ করে স্কুল থেকে বাসায় ফিরল। কিন্তু কারণ কিছুতেই বলবে না। অনেক কষ্টের পর মেয়ে বলল, ‘মা টিচার বলেছেন আমি আর আমার বান্ধবী তা কালো তাই আমরা বাদ। কালোদের দিয়ে নাকি ফ্যাশন শো হয় না।’

আমি আমার মেয়ের বুকের চাপা কষ্ট টের পাচ্ছিলাম। আমি আমার চোখের পানি লুকাতে পারছিলাম না মেয়ের সামনে। অথচ আমি যেন কষ্ট না পাই সেজন্য খুব সহজ-সরলভাবেই আমাকে সব বলল। মুখে হাসিও ছিল।’ আমি সেদিন সারাদিন কাঁদছি। বুকের ভিতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। ফ্যাশন শো থেকে বাদপড়া বড় কথা নয়, সে এই বয়সে যে বৈষম্যের শিকার হলো সেটা ভেবে। তাই আমার এই ক্লাবের অন্যতম উদ্দেশ্য বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার সময় পজিটিভ মোটিভেশন। তারা যেন ছোট থেকেই কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার না হয়। শুধু আমার মেয়ে নয়, আমার মাকেও দেখেছি তার সংসারে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে। তিনি ছিলেন ভিনদেশি একজন মেয়ে। আমার বাবার সংসারে এসে তাকে অনেক কিছু মানাতে হয়েছে। অনেক ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। তবে আমার আশপাশের পরিবেশ, পরিচিত, পরিজনসহ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এই ধরনের নানা রকম সমস্যা বিদ্যমান। আমি সব সময় ঐকান্তিক প্রচেষ্টা রেখেছি এই ধরনের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখা। আর সে জন্য আমাদের ক্লাব পাওয়ার অফ শি এগিয়ে যাচ্ছে। সাবিনা স্যাবি চান, সমাজের সচেতন নাগরিকরাও এই উদ্যোগে এক হওয়ার ঘোষণা দিয়ে অসহায় নারীর পাশে এসে দাঁড়াবে। নাগরিক জীবনের মানোন্নয়নে এটি হতে পারে এক অনন্য যাত্রার নাম।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow