শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২৩:০৮

ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার সবক দিয়েছে কোরআন

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার সবক দিয়েছে কোরআন
Google News

‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বোঝাতে চেয়েছেন, ক্ষুধার্ত মানুষের মনে খাবার ছাড়া আর কোনো ভাবনাই জাগে না। এ জন্যই রসুল (সা.) বলেছেন, নামাজের সময় খাবার এলে আগে খাবার খেয়ে তারপর নামাজে দাঁড়াও। ইসলাম এমনই বাস্তবভিত্তিক ধর্ম। গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২০ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আধপেটা খেতে পায়, ক্ষুধা পেটে রাতে ঘুমাতে যায় ২০১৯ সালে বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৫০ লাখ। মহামারীকবলিত পৃথিবীতে এ সংখ্যাটি আরও বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।  অথচ কোরআনের সবকই ছিল ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার। রসুলের (সা.) মিশনই ছিল, না খেয়ে থাকবে না একজন মানুষও। হজরত ওমর (রা.) অভুক্ত কুকুরের কথাও ভাবতেন।  অন্যকে খাওয়ানোর ধর্মীয় গুরুত্ব নিয়ে আজকের আয়োজন।

 

সমাজ ও সভ্যতাকে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে হবে

পবিত্র কোরআন এবং রসুল (সা.)-এর হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে কটি কাজ করলে নিশ্চিত জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব, মানুষকে খাবার খাওয়ানো তার একটি। যে সমাজ ও সভ্যতার মানুষ ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে না, অভুক্ত মানুষকে নিয়ে ভাবে না- কোরআন সরাসরি তাদের জাহান্নামি বলে ঘোষণা করেছে। সুফিদের দৃষ্টিতে জাহান্নাম দুই প্রকার। দুনিয়া ও আখেরাতের আজাব। দুনিয়ার আজাব হলো অশান্ত হৃদয় বা মানসিক অশান্তির জীবন। দেখা যায়, মানুষটির সবই আছে কিন্তু মনে শান্তি নেই। বিত্তশালী অথচ হৃদয়টা খালি খালি। আর আখেরাতের আজাব মানে হলো অনন্তকাল জাহান্নামের দাউ দাউ আগুন। যার শুরু আছে শেষ নেই। শেষ হলে শুরু আবার।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, যারা মানুষকে খাবার খাওয়ায় না, তারা সরাসরি জাহান্নামি। আল্লাহ বলেন, ‘জাহান্নামিদের জিজ্ঞাসা করা হবে, সব থেকেও কেন তোমরা অশান্তির আগুনে পুড়ছ? তারা বলবে- আমরা নামাজ পড়তাম না। অভাবীদের খাদ্য দিতাম না। (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত ৪২-৪৪)।

মুফাসসিরগণ বলেন, এ আয়াতে একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার ইঙ্গিত করেছেন আল্লাহতায়ালা। জাহান্নামি হওয়ার দুটি কারণ। একটি হলো নামাজ না পড়া। অন্যটি হলো মানুষকে খাদ্য না দেওয়া। আয়াতের বর্ণনাভঙ্গিই বলে দেয়, নামাজি মানুষের প্রথম সংগ্রাম হবে ক্ষুধামুক্ত সমাজ গড়া। সমাজে একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে না। এ জন্যই হজরত ওমর (রা.) ফোরাতের তীরে হাঁটতেন আর কাঁদতে কাঁদতে বলতেন, আমার সাম্রাজ্যের একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, এজন্য আল্লাহর কাঠগড়ায় আমাকেই আসামি হতে হবে।

পবিত্র কোরআনে নামাজের কথা বলার পরপরই জাকাতের কথা বলা হয়েছে। এ থেকেও বোঝা যায়, নামাজি সমাজে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কোনো চিহ্নও দেখতে চায় না কোরআন। সুরা বাকারায় মুত্তাকির পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘এই কিতাব আল্লাহ-সচেতনদের জন্য হেদায়াত বা পথপ্রদর্শক। আল্লাহ-সচেতন তথা মুত্তাকিদের পরিচয় হলো- তারা গায়েবে অর্থাৎ মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানে বোধগম্য না হওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য বাস্তবতায় বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে, প্রাপ্ত রিজিক থেকে অন্যের জন্য ব্যয় করে অর্থাৎ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়ার সংগ্রাম করে। (সুরা বাকারা, আয়াত ২-৩)।

যাদের কর্ম ও চিন্তায় ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন নেই, কোরআন সরাসরি তাদের ধর্ম অস্বীকারকারী বলে ঘোষণা করেছে। এ ক্ষেত্রে কোরআন কোনো রাখঢাক করেনি। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! তুমি কি কখনো চিন্তা করেছ, কোন ধরনের লোকেরা ধর্মকে অস্বীকার করে? এ ধরনের লোকেরা এতিমের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে, অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে কোনো আগ্রহবোধ করে না এবং অন্যকেও উৎসাহিত করে না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা সচেতনভাবেই নামাজে অমনোযোগী, শুধু লোক দেখানোর জন্য নামাজে শামিল হয়। দুর্ভোগ তাদের জন্যও, যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো সাহায্য দানেও বিরত থাকে। (সুরা মাউন, আয়াত ১-৬)।

যারা এতিম দরিদ্র শ্রেণিকে নীচু নজরে দেখে, যারা অভাবীদের খাদ্যসংস্থান তথা কর্মসংস্থান সম্পর্কে ভাবে না, উদ্যোগও নেয় না; এমনকি দারিদ্র্য মুক্তির ব্যাপারে অন্য কাউকে উৎসাহ পর্যন্ত দেয় না- এরা যতই নামাজ পড়ুক না কেন, যতই ধর্মকর্ম করুক, তারা আসলে ধর্ম অস্বীকারকারী।

এদের নামাজ কিংবা নির্মিত জমকালো মসজিদ দেখে বিশ্বাসীরা যেন বিভ্রান্ত না হয়। সে জন্য আল্লাহ বলেছেন, এসব নামাজির জন্য দুর্ভোগপূর্ণ জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। আসলে এরা মানুষকে দেখানোর জন্য ধর্মকর্ম করে, মসজিদ নির্মাণ করে, নামাজ পড়ে। মূলত এদের আত্মা এতই ছোট যে, নিত্য প্রয়োজনীয় ছোটখাটো সাহায্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা পিছপা হয়ে পড়ে।

 

খাদ্যের বিনিময়ে জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছেন নবীজি (সা.)

মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো পুণ্য আর নেই। পূর্ববর্তী যুগের এক ভয়ঙ্কর পাপীর ঘটনা বলেছেন রসুল (সা.)। ইমাম বুখারি তাঁর সহি গ্রন্থে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন হাদিসটি। রসুল (সা.) বলেন, হে আমার সাহাবিরা! তোমাদের এক পাপিষ্ঠ নারীর গল্প শোনাই। জীবনভর পাপে ডুবে ছিল। আল্লাহকে ডাকেনি কোনো দিনও। ধর্মেকর্মে ছিল চরম অনাগ্রহ। নারী হলেও হৃদয় ছিল পাথরের মতো শক্ত। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। ফেরেশতারা ধরেই নিয়েছেন, উত্তপ্ত জাহান্নামের লাকড়ি হবে এই নারী। আল্লাহর খেলা বোঝা দায়। মৃত্যুর পর ভয়ঙ্কর এই পাপীই হয়ে গেল জান্নাতের মেহমান। কীভাবে? প্রশ্ন করলেন রসুল (সা.)।

সাহাবিদের অভ্যাস ছিল, জানা সত্ত্বেও খুব একটা উত্তর দিতেন না। বলতেন, আল্লাহ ও তাঁর রসুলই ভালো জানেন। এটা আসলে বিনয়েরই প্রকাশ। শুধু বিনয় না, একজন শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্যও এমনই হওয়া উচিত। নিজের জ্ঞানের বহর না দেখিয়ে শিক্ষক থেকে জেনে নেওয়া। তখনো সাহাবিরা তাই করলেন। বললেন, হে আল্লাহর রসুল! আপনি এবং আপনার প্রভু আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন।

রসুল (সা.) বললেন, একদিন একটি বিড়াল খুব পিপাসার্ত ছিল। নারীটি কুয়ার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হয়তো পাপ করে এসেছে, অথবা না। পিপাসায় বিড়ালের ঝুলে যাওয়া জিহ্বা দেখে নারীটির মনে দয়ার ফুল ফুটল। কুয়া থেকে পানি তুলে বিড়ালকে পান করাল। বিড়ালের জীবন বেঁচে গেল। আল্লাহর কাছে নারীটির জন্য দোয়া করল। ব্যস! কপাল খুলে গেল তার। মাত্র একটি ভালো আমলের বিনিময়ে আল্লাহ তার সব গোনাহ ক্ষমা করে জান্নাতে জায়গা করে দিলেন।

সুরা বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতে পুণ্যের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ ইমানের পরই মানুষকে সাহায্যের কথা বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘পূর্ব বা পশ্চিমমুখী হওয়ার মধ্যে কোনো পুণ্য নেই। পুণ্য রয়েছে আল্লাহ, আখেরাত, ফেরেশতা, সব কিতাব ও নবীদের ওপর বিশ্বাসে। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন, অসহায়, মুসাফির ও সাহায্যপ্রার্থীকে সাহায্য এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থদানে। নামাজ কায়েম ও জাকাত আদায়ের মধ্যে। ওয়াদা রক্ষায়। দুঃখকষ্ট, বালা-মুসিবত ও সত্যের পথে যে কোনো দুর্যোগে ধৈর্যধারণ করায়। যারা তা করবে, তারাই প্রকৃত সত্যানুসারী ও আল্লাহ-সচেতন।

সৃষ্টিকে খাবার খাওয়ানো স্রষ্টার কাছে কেন এত প্রিয় কখনো ভেবে দেখেছেন? মুসলিম শরিফে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘সব সৃষ্টি আমার পরিবার।’ এ গ্রন্থেরই আরেক হাদিসে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষকে খাওয়ানো মানে আমাকেই খাওয়ানো।’ কেয়ামতের দিন আল্লাহ আমাকে-আপনাকে ডেকে বলবেন, হে আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান! ক্ষুধার্ত-অভুক্ত পেটে তোমার দুয়ারে হাত বাড়িয়েছিলাম খাবার পাওয়ার আশায়। তুমি তখন বিরক্ত হয়ে ধমক দিয়ে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে। এ কথা শুনে আমাদের চোখ কপালে উঠে যাবে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলব, হে পরওয়ারদিগার! আপনি জগতের রিজিকের মালিক! রব্বুল আলামিন! আমি অধম আপনাকে কীভাবে খাওয়াব? তখন আল্লাহ বলবেন, দুনিয়ার জীবনে অভুক্ত মানুষ যখন তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, তাকে খাবার দিলেই আমাকে খাওয়ানো হতো। তখন আমরা আফসোস করে বলব, হায়! সেদিন যদি ওই অভুক্তকে জঞ্জাল ভেবে ধমক দিয়ে বিরক্ত হয়ে তাড়িয়ে না দিতাম!

 

অন্যকে খাওয়ালে নিজের লাভ

অন্যকে খাওয়ালে পরকালীন মুক্তির পাশাপাশি আছে জাগতিক তৃপ্তিও। আজকের এ আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বের সেরা ধনীরা অবলীলায় স্বীকার করেছেন সে কথা। শিব খেরা নামে একজন বিখ্যাত মোটিভেশনাল লেখক বলেছেন, দুনিয়া কাঁপানো পুঁজিপতিদের সঙ্গে কথা বলে আমি একটি সত্যিই উপলব্ধি করেছি- ‘যারা নেয় তারা খায় ভালো; আর যারা দেয় তারা ঘুমায় ভালো।’ অর্থাৎ দেওয়ার অভ্যাস মানসিক প্রশান্তির চাবিকাঠি- কথাটি আজ আর কোনো থিওরি নয়, চরম বাস্তবতা। বিল গেটস, মার্ক জুকারবার্গের মতো বণিকরা তাদের সম্পত্তির বড় অংশ বিলিয়ে দিচ্ছেন মানবতার কল্যাণে। কেন? মানসিক তৃপ্তি ও আত্মার প্রশান্তির জন্য।

হাদিস শরিফে রসুল (সা.) বলেছেন, আসসাদাকাতু তারুদ্দুল বালা। অর্থাৎ, দান-সদকা বিপদাপদ দূর করে। ঐশী জগতের খেলা বোঝা বড় দায়। দান কীভাবে বিপদ থেকে রক্ষা করে তার একটি উদাহরণ চাক্ষুষ দেখেছেন হজরত মুসা (আ.)। সুরা কাহাফের ৭১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘খিজির (আ.) ও নবী মুসা (আ.) একসঙ্গে যাত্রা শুরু করলেন। তাঁরা পৌঁছলেন সমুদ্রতীরে। সাগর পাড়ি দিয়ে নৌকা থেকে নামার সময় দরবেশ নৌকার তলদেশে ফুটো করে দিলেন। তখন মুসা (আ.) বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনি এ কী করলেন? আপনি কি আরোহীসমেত নৌকা ডোবানোর জন্য তলায় ফুটো করলেন? এ তো গুরুতর অন্যায়!

আসলে জ্ঞানী খিজির (আ.) ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ ইলমপ্রাপ্ত। মুফাসসিরগণ লিখেন, নৌকার মাঝি মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর কাছ থেকে কোনো পয়সা নেননি। এ দানের ফলে খিজির (আ.) তার আসন্ন বিপদ দূর করে দিয়েছেন। আর এ জন্য তার নৌকার তলা ফুটো করা জরুরি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ছোট্ট ক্ষতির বিনিময়ে বড় উপকার ভাগ্যে জোটে। মাঝির ক্ষেত্রেও তাই হলো। সে রহস্য খোলাসা করে মুসা (আ.)-এর উদ্দেশে খিজির (আ.) বলেন, নৌকার ব্যাপারটি খুব সহজ। নৌকাটি ছিল কয়েকজন গরিব মানুষের। এ নৌকাই ছিল তাদের জীবিকা অর্জনের উপায়। আমি ইচ্ছা করেই নৌকায় ফুটো করে দিলাম। কারণ আমি জানতাম রাজার বাহিনী পেছনে আসছে।  যারা সমস্ত ভালো নৌকা জোর করে জব্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ওদের জীবিকা অর্জনের উপকরণটি রক্ষা পেল। (সুরা কাহাফ, আয়াত ৭৯)।

 

দীর্ঘ জীবন চাইলে দুই হাত ভরে দান করুন

অন্যকে খাওয়ালে আমার লাভ কী? বস্তুবাদী দর্শনে এ প্রশ্ন ওঠতেই পারে। এর জবাবে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘দান রিজিক ও সম্পদ বাড়ায়।’ (তিরমিজি)। মুসা নবীর এক উম্মতের দুয়ার থেকে আজরাইল (আ.) ফিরে গেছেন দানের কারণেই। আল্লাহ বলেন, আজরাইল! ফিরে এসো। তার হায়াত আরও কয়েক বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আজরাইল (আ.) অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এর রহস্য কী! আল্লাহ বললেন, মাত্রই সে একজন মানুষকে এক মুষ্টি চাল দিয়েছে। (কিমিয়ায়ে সাআদাত)।

বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চিকিৎসকরা যখন ব্যর্থ হয়ে রোগীর বাঁচার আশা ছেড়ে দেন তখন দান-সদকা করলে অলৌকিকভাবে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। আমেরিকায় এমন অনেক মেডিটেশন সেন্টার গড়ে উঠেছে যেখানে বলা হয়, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের জন্য নিয়মিত মানবতার কল্যাণে অর্থ ব্যয় করতে হবে।

বাংলাদেশের মেডিটেশন সেন্টারগুলোতেও এর ব্যাপক চর্চা রয়েছে। দুরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধি থেকে শুরু করে বহু জটিল রোগ থেকে কেবল দানের বরকতে মুক্ত হয়েছে এমন অসংখ্য স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে।

 

শ্রেষ্ঠ আমল অন্যকে খাওয়ানো

ইসলামী শরিয়তে ইবাদত দুই প্রকার। আল্লাহ সম্পর্কিত ইবাদত এবং বান্দার হক বিষয়ক ইবাদত। বান্দার হক বিষয়ক ইবাদতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো- মানুষকে খাওয়ানো। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, একবার এক সাহাবি রসুল (সা.) এর কাছ এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল! ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ইবাদত কোনটি? রসুল (সা.) বললেন, ‘মানুষকে খাবার খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।’ এ হাদিসের লক্ষণীয় ব্যাপার হলো- অনেকেই মনে করেন, শুধু গরিব-অভাবীকেই খাওয়াতে হবে। কিন্তু আসল ব্যাপার তা নয়। খাওয়ানো এমন এক ইবাদত, একজন সম্ভ্রান্ত ধনীকে এমনকি নিকৃষ্ট পাপীকে খাওয়ালেও তা শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। অনেক হাদিসেই সাহায্য করার ব্যাপারে কোনো ধরনের শর্তারোপ করেননি রসুল (সা.)। যেমন- মুসলিম শরিফের এক হাদিসে হুজুর (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে থাকবে, যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্যে লেগে থাকে।’ একই গ্রন্থের আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া মানে সে আল্লাহর পথেই বের হয়েছে। এ অবস্থায় যদি সে মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে শহীদ হিসেবে গণ্য হবে। এসব বলে মূলত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন নবীজি (সা.)।

 

অঢেল সম্পদের চাবিকাঠি

নিজের জন্যই করতে হয় দান। দানের অর্থ বহুগুণে ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা করেছেন আল্লাহতায়ালা। সুরা বাকারার ২৪৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে দানের মাধ্যমে উত্তম ঋণ দাও, আল্লাহ তা বহুগুণে ফিরিয়ে দেবেন। আর দান করতে ভয় পেয়ো না। মনে রেখ, তোমাদের রিজিক ও সম্পদ আল্লাহই কমান এবং বাড়ান। সহায়-সম্পদ রেখে তোমাদের একদিন আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে।’ একই সুরার ২৬১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা নিজেদের ধনসম্পত্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের এ সৎদান এমন একটি শস্যবীজ, যাতে উৎপন্ন হয় সাতটি শিষ আর প্রতিটি শিষে থাকে শত শস্যদানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণ প্রবৃদ্ধি দান করেন। আল্লাহ অনন্ত প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু আল্লাহর পথে খরচ কর তিনি তার বিনিময় প্রদান করেন। তিনিই উত্তম রিজিকদাতা। (সুরা সাবা, আয়াত ৩৯)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, ‘যারা আল্লাহর পথে খরচ করে, আল্লাহ তাদের এর বিনিময় দুনিয়া এবং আখেরাত দুই জগতেই দান করেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা আল্লাহর বান্দার কাছে আসে। একজন দোয়া করে, হে আল্লাহ, তোমার পথে দানকারীকে উত্তম বিনিময় দাও। আর দ্বিতীয়জন বলে, হে আল্লাহ, তোমার পথে যারা খরচ করে না তাদের ধন-সম্পদ নিঃশেষ করে দাও (সহি বুখারি)।

 

যদিও অভাবী

‘আল্লাহর পথে দান-সদকার প্রতিযোগিতায় দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ রয়েছে। অভাব-অনটন এবং সম্পদের প্রতি লোভের সময় দান-সদকায় রয়েছে বেশি সওয়াব লাভের ঘোষণা। প্রিয়নবী (সা.) তাঁর উম্মতকে আল্লাহর ক্ষমা লাভ এবং প্রশস্ত জান্নাতের দিকে এগিয়ে যেতে দান-সদকার প্রতিযোগিতা করতে বলেছেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, একবার এক লোক রসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রসুল! সবচেয়ে বেশি সওয়াব কোন সদকায়? তিনি বললেন, তুমি এমন অবস্থায় দান করবে যে, তুমি শারীরিকভাবে সুস্থ; ধনসম্পদের প্রতি লোভ আছে; অভাব-অনটনকে ভয় করছ এবং ধনসম্পদের আশাও পোষণ করছ। ওই অবস্থায় এ আশঙ্কায় তুমি দান করার ব্যাপারে এমন কার্পণ্য কর না যে, শেষে মৃত্যুর সময় এসে যায়। আর তখন তুমি এটা ঘোষণা কর যে, এ পরিমাণ অমুকের এবং সে পরিমাণ অমুকের। অথচ অমুকের জন্য সেই মাল আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। (বুখারি ও মুসলিম)।

এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জান ধর্মের দুর্গ কী? ধর্মের দুর্গ অর্থাৎ নেক আমল বা সৎকর্মের সুউচ্চ স্তর হচ্ছে- দাসমুক্তি অর্থাৎ একজন মানুষকে মনোজাগতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অর্থাৎ সব ধরনের দাসত্ব থেকে মুক্ত করা, দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান, নিকটবর্তী এতিম বা ধূলিমলিন মিসকিন-অসহায়কে লালন এবং বিশ্বাসীদের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে পরস্পরকে বিশ্বজনীন মমতা ও সবরে অর্থাৎ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা ও আত্মসংযমে উদ্বুদ্ধ করা। এরাই সফলকাম। (সুরা বালাদ, আয়াত ১২-১৮)।

 

ভিন্ন ধর্মগ্রন্থে দান

শুধু ইসলাম তথা কোরআন ও হাদিস নয় ঋগ্বেদ, গীতা, বাইবেলেও দানের ব্যাপারে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, ‘নিঃশর্ত দানের জন্য রয়েছে চমৎকার পুরস্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব। (ঋগ্বেদ-১.১২৫.৬)। বাইবেলে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যখন দান কর গোপনে কর। তোমার নীরব দান সদা প্রভু দেখছেন। তিনি তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। (মথি ৬:৩-৪)।