শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়—এটি হলো মানুষ গড়ার এক অবিরাম যাত্রা। সেই যাত্রার এক নিরলস পথিক মো. নুরুল ইসলাম, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি ব্যয় করেছেন জ্ঞানের আলো ছড়াতে, ভালোবাসা ও মানবিকতার পাঠ দিতে। কিন্তু অবসর তাকে থামাতে পারেনি। বরং জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে তিনি আরও এক নতুন স্বপ্ন বুনেছেন—গড়ে তুলেছেন এক উন্মুক্ত পাঠাগার, যার দরজা সবার জন্য খোলা।
নিজের টাকায়, নিজের স্বপ্নে বইয়ের সংসার
অবসরের পর নিজের অবসর ভাতা, সঞ্চিত অর্থ, এমনকি ধারকর্জ করে তিনি বই সংগ্রহ শুরু করেন। তার বিশ্বাস—যেখানে বই, সেখানেই আলোকিত মানুষ। আজ সেই বিশ্বাসই রূপ নিয়েছে এক বাস্তবতায়। তার হাতে গড়া পাঠাগারটি এখন গ্রামের মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে জ্ঞানের এক আলোকশিখা। এখানে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক কিংবা সাধারণ পাঠক—সবাই অবাধে বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
নুরুল ইসলাম বলেন, আমি সারা জীবন শিশুদের পড়িয়েছি। এখন চাই, গ্রামের মানুষ বই পড়ুক, আলো দেখুক। বই-ই পারে মানুষকে পরিবর্তন করতে।
বসুন্ধরা শুভসংঘের মহৎ উদ্যোগ
নুরুল ইসলামের এই মানবিক উদ্যোগের কথা পৌঁছে যায় বসুন্ধরা শুভসংঘের কাছে। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুভসংঘের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই তারা এগিয়ে আসে এই মহৎ প্রচেষ্টায়।
দুই বাংলার বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বপ্নদ্রষ্টা ইমদাদুল হক মিলন তার লেখা অসংখ্য বই উপহার হিসেবে পাঠান নুরুল ইসলামের উন্মুক্ত পাঠাগারের জন্য।
সম্প্রতি জীবননগর উপজেলা শুভসংঘ কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বইগুলো তার হাতে তুলে দেওয়া হয়। বই হাতে পেয়ে নুরুল ইসলামের চোখে জল টলমল করছিল— কিন্তু সে জল দুঃখের নয়, গর্বের। আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, এই বইগুলো একদিন আমার থেকেও বড় কিছু হয়ে উঠবে। আমি শুধু বীজ বপন করছি, ফল পাবে আমাদের সমাজ।
মানুষ গড়ার এক দৃষ্টান্ত
অবসর জীবনের শান্ত পরিসরেও নুরুল ইসলাম দেখিয়েছেন—মানুষের স্বপ্ন কখনো বয়সের বাঁধনে থেমে থাকে না। তার এই প্রচেষ্টা শুধু একটি পাঠাগার গড়া নয়, বরং একটি প্রজন্মকে জ্ঞানের আলোয় জাগিয়ে তোলার উদ্যোগ।
বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তায় এখন তার সেই ছোট্ট উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হচ্ছে—গ্রামের মানুষ বই পড়ছে, শিশুরা বই ভালোবাসছে। নুরুল ইসলাম আজ এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, অবসর মানে শেষ নয়, অবসর মানে নতুন করে শুরু—আলো বিলানোর শুরু।
শিক্ষকতার দীর্ঘ যাত্রা
বই হস্তান্তরের পর আলাপ হয় সাবেক এই স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। তিনি জীবননগর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা, রাজনগর গ্রামের মৃত মতলেব উদ্দিন ও মৃত জামেলা খাতুনের সন্তান। ১৯৬৯ সালে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন জীবননগর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত দৌলতগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই ২০০৭ সালে অবসরগ্রহণ করেন।
তার তিন ছেলে—বড় ছেলে জীবননগর ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক, মেজো ও ছোট ছেলে এনজিওতে চাকরি করেন। পরিবারের প্রতিটি সদস্যই গর্ব করেন তার এই অনন্য উদ্যোগে।
বসুন্ধরা শুভসংঘের মতো সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় এমন উদ্যোগগুলো একদিন সারা দেশে বই ভালোবাসার এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে। এমন আলোকিত মানুষদের গল্পই প্রমাণ করে—স্বপ্ন থাকলে গ্রামেও গড়ে উঠতে পারে আলোর বিশ্ববিদ্যালয়।
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি