শিরোনাম
প্রকাশ : ৮ মে, ২০১৯ ১৪:৪৮

রমজানে ভেজাল সিন্ডিকেট

মুড়িতে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড, বেগুনি পিয়াজু চপ জিলাপিতে টেক্সটাইল রং কেক জেলি সসে কৃত্রিম সুগন্ধি, খেজুর সেমাই হলুদ ঘি সবই বিষাক্ত

সাঈদুর রহমান রিমন

রমজানে ভেজাল সিন্ডিকেট

প্রতি বছরের মতো এবারও পবিত্র রমজান মাসকে ঘিরে ভেজাল বিষের খাদ্যপণ্যে সারা দেশ সয়লাব হয়ে পড়েছে। সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও প্রশাসনিক কঠোর তৎপরতা সত্ত্বেও ভেজাল খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকারী সিন্ডিকেটকে থামানো যাচ্ছে না। বছরজুড়ে ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির রমরমা বাণিজ্য চললেও রমজান মাস ঘিরে এ তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইফতারির শরবত, খেজুর থেকে শুরু করে সাহরির দুধ-কলা, মাছ কোনো কিছুই মিলছে না ভেজালমুক্ত। ইফতারির চাহিদায় গুরুত্ব পাওয়া ফল-ফলাদি আপেল, কমলা, আঙ্গুর, খেজুর, বেদানা, নাশপাতি, পাকা পেঁপে, বেল, আনারস, তরমুজসহ সব ফলে মেশানো হচ্ছে ফরমালিন, কার্বাইড এবং রাইপেন নামের বিষাক্ত কেমিক্যাল।

এ ছাড়া ইফতারের অপরিহার্য পাঁচটি সামগ্রী ছোলা, পিয়াজু, বেগুনি, মুড়ি ও জিলাপির প্রতিটিতেই নানাভাবে মেশানো হয় ভেজাল। মুড়ি আকারে বড় ও সাদা করতে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড। বেগুনি, পিয়াজু, চপ কিংবা জিলাপিতে ব্যবহৃত হচ্ছে টেক্সটাইল কালার। কম খরচে বেশি লাভের আশায় একশ্রেণির বিক্রেতা এসব  বিষাক্ত রং ব্যবহার করছেন ইফতার সামগ্রীতে। মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ভেজাল চিনি। এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম সাইক্লামেট। খাবারকে অধিকতর মিষ্টি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে স্যাকারিন, সুকরালেস ইত্যাদি। ইফতারির আরেক আইটেম হালিমে মাংসের দেখা মেলে খুব কম। মেশানো হয় আগের দিনের অবিক্রিত ডাল ও মাংসের উচ্ছিষ্ট। ইফতারে রোজাদারদের খুব পছন্দ ফল কিংবা এর জুস। কিন্তু বাজারের প্রায় সব ধরনের ফলে মেশানো হচ্ছে রাসায়নিক। জিলাপি দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখতে তেলের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে গাড়ির পোড়া লুব্রিকেন্ট। অন্যদিকে ফরমালিন-মিশ্রিত বিভিন্ন ফল, মাছ, সবজি বিক্রি চলছে বরাবরের মতো। রাজধানীসহ জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোর বিরাট জনগোষ্ঠী হোটেল রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল। অথচ রাস্তার পাশের হোটেল-রেস্তোরাঁর বেশিরভাগ খাবারই অস্বাস্থ্যকর। এতে আটা, ময়দা, বেসন, ডিম, তেলসহ যত উপকরণ ব্যবহার করা হয় তার প্রায় সবই ভেজালে পূর্ণ। খাবারে সরাসরি ওয়াসার পানি দেওয়া হয়। কৃত্রিম রং দিয়ে খাবারের অবয়ব সুন্দর করা হয়। সড়কের পাশে ভ্যানে রঙিন শরবত বিক্রি হয়। বেলের শরবত, লেবুর শরবত। শরবতে যে বরফ দেওয়া হয় তা মাছে ব্যবহার করা বরফ গলা নোংরা পানিতে তৈরিÑ সেটাই শরবত বিক্রেতারা কিনে আনে। বরফ বিক্রেতারাই এমন তথ্য জানিয়েছেন। টাকায় কেনা খাবার খেয়ে নানারকম যন্ত্রণা পোহানো ভোক্তারা জানান, প্রতি বছর রমজান মাস এলেই বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা হোটেল-রেস্তোরাঁ, ইফতারি বিক্রেতাদের দোকানে অভিযান চালাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সেসব অভিযান-জরিমানার জাল কেবল ক্ষুদ্র ও মাঝারি হোটেল-রেস্তোরাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ভেজাল পণ্যের ছড়াছড়ি : রমজান মাস ও ঈদকে টার্গেট করে রাজধানীজুড়ে নকল কারখানা এবং ভেজাল পণ্যের বিস্তার চলছে। ইফতারির খাদ্যপণ্যেই ভেজালের বিষ বেশি থাকছে। রমজানকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে নকল, মানহীন-অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাংলা সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, নুডলস, ঘি, হলুদ, মরিচ, মসলা, বেসন, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, পাউরুটি, কেক ইত্যাদি। এসব ভেজাল পণ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নানা উপকরণ ও রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামাল, ফরমালিন-কার্বাইড, সুতা রাঙানোর বিষাক্ত রং, ভেজাল পামতেল, পারফিউম, পচা ডিম ইত্যাদি মেশানো হচ্ছে এসব খাদ্যপণ্যে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে অনেকটা কৌশলে বাইরে তালা ঝুলিয়ে আলো-আঁধারি পরিবেশে উৎপাদন করা হয় সেমাই, নুডলস, ঘিসহ অন্যান্য পণ্য। ভেজালবিরোধী নানা উদ্যোগ : রমজানে দেশব্যাপী ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করবে প্রণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। ঢাকা মহানগরীতে বিএসটিআই ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে প্রতিদিন তিনটি, ঢাকা মহানগর ছাড়া পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলায় প্রতিদিন কমপক্ষে দুটি এবং বিএসটিআইয়ের ১০টি আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে প্রতিদিন একটি করে ১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া র‌্যাবের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিদিন একাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় বিএসটিআই প্রতিনিধি অংশ নেবে।

বিডি-প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য