শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:১৬

কেমন আছেন সাভারবাসী শেষ

মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধ

মোস্তফা কাজল, সাভার থেকে ফিরে

মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধ

সাভারবাসীর অহংকার বীর বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রেখেছে সাভারের মাটি। এখানে এলেই দেখা যাবে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী অসংখ্য শহীদের স্মরণে তৈরি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধ আপামর জনসাধারণের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্মরণে নিবেদিত এবং শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সাভারে নির্মিত এই সৌধ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধ বাঙালির অস্তিত্ব আর জাতীয়তাবোধের প্রতীক। ইতিহাসের স্মারক। প্রতিবছর স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে জাতীয়ভাবে এ স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু জাতীয় স্মৃতিসৌধ শুধু মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি স্মরণের জন্য নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আরও ইতিহাস। যে ইতিহাস, যে ঘটনা স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে দ্রুতগতিতে এবং স্বল্প সময়ে। বাঙালি হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। একটি স্বাধীন দেশের নেশায় বাংলার নারী-পুরুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ছিনিয়ে এনেছেন বিজয়। বীর বাঙালির গৌরবগাথা সংগ্রাম ও বিজয়ের প্রতীক হিসেবে দ ায়মান জাতীয় স্মৃতিসৌধ।

স্মৃতিসৌধে প্রবেশের পর প্রথমেই চোখে পড়ে নজরকাড়া উন্মুক্ত মঞ্চ। সোজা হেঁটে গেলে মূল স্মৃতিসৌধ। ১৫০ ফুট বা ৪৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট স্মৃতিসৌধটিতে রয়েছে সাতটি ফলক, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সাতটি পর্যায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাতটি পর্যায়ের প্রথমটি সূচিত হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। এরপর চুয়ান্ন, আটান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুথানের মাধ্যমে অগ্রসর হয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা বিবেচনা করে এবং মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচনা করে রূপদান করা হয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সৌধটি ভিন্ন ভিন্নভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। ঢাকা শহর থেকে ২৫ কি.মি. অদূরে সাভারের নবীনগরে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। পুরো এলাকাটির আয়তন ৩৪ হেক্টর। এর চারপাশে আরও ১০ হেক্টর জায়গাজুড়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের বেষ্টনী। এই সবুজ বেষ্টনী সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের প্রতীক। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ বিশেষ জাতীয় দিবসে এখানে লাখো জনতার ঢল নামে।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের প্রতি নিবেদিত হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান যখন এ দেশে আসেন, এ দেশের জাতীয় বীরদের শ্রদ্ধা জানাতে তারা জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান এবং সফরের স্মৃতিস্বরূপ স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে রোপণ করেন বিভিন্ন গাছের চারা। এসব ছাড়াও স্মৃতিসৌধে রয়েছে হেলিপ্যাড, মসজিদ, অভ্যর্থনা কক্ষ, ক্যাফেটেরিয়া। এ ছাড়া জাতীয় স্মৃতিসৌধের অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ সব সময়ই সঙ্গ দেয় দর্শকদের। যারা শুধু স্মৃতিসৌধের সামনের ছবি দেখেছেন, তারা কখনই এর গঠন সম্পর্কে জানতে পারবেন না। ভালোভাবে দেখলেই বোঝা যাবে স্মৃতিসৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজ নিয়ে গঠিত। জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাত জোড়া দেয়াল স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ভিন্ন পর্যায় নির্দেশ করে। পর্যায়গুলো হলোÑ ১) ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। ২) ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। ৩) ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন। ৪) ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন। ৫) ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন। ৬) ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭) ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনা করেই সৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই সাত সংখ্যাটি একটু অন্যভাবেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতা-সংগ্রামের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এই সালটির দুটি সংখ্যার যোগফল ৫+২ = ৭। আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ৭ তারিখে। বাংলাদেশের বিজয় দিবস হচ্ছে ১৬ ডিসেম্বর। এই তারিখের দুটি সংখ্যার যোগফল ১+৬ = ৭। আবার ৭ দিয়ে বোঝানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠকে। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে নবীনগরে এই স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৭৯ সালে মূল স্মৃতিসৌধের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৮২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগে নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর