শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ মার্চ, ২০২১ ২৩:৪৯

পানিতে ডুবে ১৪ মাসে ৭৩৫ শিশুর প্রাণহানি

থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল

জিন্নাতুন নূর

পানিতে ডুবে ১৪ মাসে ৭৩৫ শিশুর প্রাণহানি

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কলমা গ্রামে ২১ ফেব্রুয়ারি বাড়ির পাশেই পদ্মা নদীতে চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে গোসল করতে নেমেছিল এলাকার মো. কর্নেল ব্যাপারীর একমাত্র মেয়ে সামিয়া আক্তার (১১)। সাঁতার না জানায় নদীতে তলিয়ে যায় ছোট্ট সামিয়া। বড়রা খোঁজাখুঁজি করেও শিশুটিকে উদ্ধার করতে পারেনি। আধঘণ্টা পর ভেসে ওঠে সামিয়ার মৃতদেহ। অথচ পানিতে ডুবে যাওয়া রোধে সরকারের পক্ষ থেকে এ উপজেলাতেই ‘পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধকল্পে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক কর্মসূচির কাজ চলমান রয়েছে। এর পরও পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না। গণমাধ্যম উন্নয়ন ও যোগাযোগবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’র দেওয়া তথ্যে জানা যায়, গত বছর জানুয়ারি থেকে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে পানিতে ডুবে ৫০৯টি দুর্ঘটনায় ৮৮৫ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ৭৩৫টিই শিশুমৃত্যুর ঘটনা, যা মোট মৃত্যুর ৮৩ শতাংশ। ৪ মার্চ ‘সমষ্টি’ এ তথ্য প্রকাশ করে। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যে জানা যায়, পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে ঢাকা বিভাগে, ১৯৩ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১৭২ জন, রংপুরে ১৪১, রাজশাহীতে ১১০, ময়মনসিংহে ১০০, বরিশালে ৬৬ ও খুলনায় ৬১ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। পানিতে ডুবে সবচেয়ে কম মৃত্যু হয় সিলেট বিভাগে, ৪২ জন। দেখা যায়, মৃতদের মধ্যে চার বছর বা এর কম বয়সীদের মধ্যে আছে ৩১০ জন, পাঁচ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৮৪ জন, ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু ১১০ জন এবং ১৫ ধেকে ১৮ বছর বয়সী ৩১ জন। অবশিষ্ট ১৫০ জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি। প্রাপ্ত তথ্যে, ৬৫টি পরিবারের ১৭৪ জন সদস্য পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে শিশুর সঙ্গে ভাই বা বোনসহ ৫৯ জন, বাবা-মাসহ ১৭ জন, দাদা-দাদি এবং নানা-নানিসহ চারজন, চাচাতো ও খালাতো ভাইবোনসহ ৮১ জন এবং চাচা-খালাসহ ১৩ জন মারা যায়। পানিতে ডুবে মৃতদের মধ্যে ২৯৫ জন মেয়েশিশু এবং ৪৩৪ জন ছেলেশিশু। তথ্য বিশ্লষণে দেখা যায়, দিনের প্রথম ভাগে অর্থাৎ সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে ৩৫৫ জন এবং দুপুর থেকে সন্ধ্যার আগে ৩৫৬ জন মারা যায়।

সন্ধ্যায় মারা যায় ১৪৬ জন। আর ১৭ জন রাতের বেলা পানিতে ডুবে যায়। গত বছর জুন থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ৫৭৭ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে আগস্ট মাসে, ১৭১ জন। জুনে ৯১, জুলাইয়ে ১৬৩, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে যথাক্রমে ৭৪ ও ৭৮ জনের মৃত্যু হয়। তবে ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা কম ছিল, ১০ জন। জানা যায়, ৭১৬ জন কোনো না কোনোভাবে পানির সংস্পর্শে এসে ডুবে যায়। বাকি ১১৬ জন মারা যায় নৌযান দুর্ঘটনায়। আর ৫৫ জন মারা যায় বন্যার পানিতে ডুবে। মূলত পরিবারের সদস্যদের যথাযথ নজরদারির অভাবেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিশু পানিতে ডুবে যায়। এর মধ্যে ৭০০ জন বড়দের অগোচরে বাড়ি-সংলগ্ন পুকুর বা অন্য জলাশয়ে চলে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘প্রিভেনটিং ড্রাওনিং : অন ইমপ্লিমেন্টেশন গাইড’-এ শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে স্থানীয় পর্যায়ের মানুষজনকে সম্পৃক্ত করে দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে। এ ছাড়া পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি ও জাতীয়ভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করার ওপরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সুপারিশ করে।

সরকারিভাবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে ‘পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধকল্পে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক কর্মসূচি গ্রহণ করে। মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর, লৌহজং ও মীরকাদিম পৌরসভা, সুনামগঞ্জ জেলার সুনাামগঞ্জ সদর, দোয়ারা বাজার ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা এবং সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, তাড়াশ ও কাজীপুর উপজেলা এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এটি বাস্তবায়নের কথা। পিপলস এডুকেশন হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এটি বাস্তবায়ন করছে। এতে ব্যয় হবে ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৮ হাজার শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। এর অংশ হিসেবে ১০ হাজার শিশুকে এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া শেষ হয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (শিশু ও সমন্বয়) এবং কর্মসূচিটির মনিটরিং টিমের সভাপতি তানজিনা ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোয় সাঁতার শেখানো হচ্ছে কি না আমরা তা দেখতে যাই। তবে শুধু কর্মসূচির আওতায় সবাইকে সাঁতার শেখানো সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার বৃহদাকারের প্রকল্প গ্রহণ। এটি পর্যায়ক্রমে শেখাতে হবে।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর