কারো বাবা রিক্সা চালান, আবার কারো মা কাজ করেন মানুষের বাসায়। আবার অনেকে রয়েছে পথ শিশু। আর তাইতো এসব শিশুদের কাছে শিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন ছিল অনেকটাই আকাশ-কুসুম। কিন্তু এই শিশুদের কঁচি হৃদয়ে লালন করা সেই স্বপ্নকে বাস্তবতা দিয়েছে নওগাঁ জেলা পুলিশ। নওগাঁর অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের স্বপ্নজয়ের সারথি হয়েছে জেলা পুলিশ পরিচালিত ‘আই ড্রিম’ নামের একটি বিদ্যালয়।
আই ড্রিমের উদ্যোক্তা নওগাঁর পুলিশ সুপার (এসপি) ইকবাল হোসেন। পাঁচ মাস আগে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় আসে তাঁর। তার সেই ভাবনার কথা তার অধিনস্ত অন্য পুলিশ সদস্যদের জানালে তারাও এসপির এই ভাবনাকে বাস্তবতায় রূপ দিতে এগিয়ে আসেন। সবার সঙ্গে কথা বলে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন এসপি ইকবাল হোসেন। স্কুলটির নাম দেওয়া হয় ‘আই ড্রিম’।
অবশেষে জেলা পুলিশের উদ্যোগে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে যাত্রা শুরু করে আই ড্রিম। নওগাঁ পুলিশ লাইনসের ড্রিল শেডের একটি অংশে সুবিধা বঞ্চিত অর্ধশতাধিক শিশুকে শিক্ষাদান করানো হচ্ছে। শিশুদের পাঠদানের পাশাপাশি বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে খাতা, কলম-পেনসিল। পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে শিশুদের প্রতিদিন দেওয়া হচ্ছে চকলেট ও নাশতা।
স্কুলটি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এসব শিশুদের পাঠদান দিয়ে যাচ্ছেন বেশ কিছু পুলিশ সদস্য। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত এখানে শিশুদের পড়ানো হয়।
নওগাঁ পুলিশ লাইনস এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ লাইনস ড্রিল শেডের পশ্চিম অংশে মঞ্চের পাশে বসেছেন প্রায় ৫০-৬০জন শিশু। তাদেরকে পাঠদান করাচ্ছেন পুলিশ সদস্য শফিকুল ইসলাম। শিশুদের পাঠ দেখিয়ে দিতে তাকে সহযোগিতা করছেন নাজমুল ও শহিদুল নামের আরও দুইজন পুলিশ সদস্য।
এখানে পড়তে আসা শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই আগে কখনও স্কুলে যায়নি। গেলেও শিশু শ্রেণি কিংবা প্রথম শ্রেণি থেকে অনেকের পাঠ চুকিয়ে গেছে। সংসারের অভাবের কারণে অল্প বয়সেই কেউ আয়-রোজগারে নেমে পড়ত। কিন্তু এই স্কুলে আসার পর থেকে তাদের জীবন পাল্টে গেছে। বিকেলে স্কুলে এসে পড়ালেখা শেখার সঙ্গে চকলেট ও নাশতা পেয়ে তারা খুশি।
কথা হয় এই স্কুলে পড়তে আসা পথশিশু সুমাইয়ার মা স্বামী পরিত্যক্তা আয়েশা খাতুনের সঙ্গে। তিনি অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। তিনি জানান, দেড় বছর আগে শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয় সুমাইয়া। শিশু শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণিতে উঠে সে। এক সময় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় সে। কিন্তু কিছু দিন আগে তার মতো ঝড়ে পড়া পাড়ার অন্য শিশুদের আই ড্রিম স্কুলে যাওয়া দেখে সুমাইয়াও তাদের সঙ্গে ওই স্কুলে যায়। সেখানে গিয়ে নতুন বই-খাতা পেয়ে সে দারুন খুশি হয়। এখন প্রতিদিন বিকেল হলেই সে স্কুলে যাওয়ার জন্য আকুল হয়। স্কুলে না গেলে ওর ভালো লাগে না।
এই স্কুলে পাঠদান করান নওগাঁ পুলিশ লাইনসে নবনিযুক্ত পুলিশের উপ-পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, কাজের ফাঁকে এসব শিশুদের পাঠদান দিতে পেরে বেশ ভাল লাগে। পাঠদানের পাশাপাশি তাদের সাথে মজার মজার গল্প করা হয়। আবার সবার সাথে খেলাধূলা করা হয়। এতে করে কাজের পর আমার অবসর সময়টুকু ভাল কাটে।
জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ফারজানা হোসেন জানান, শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এখানে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পাঠদান করানো হয়। এখানে শিশুদের পালাক্রমে পাঠদান করান পুলিশের কিছু চৌকস সদস্য। এখানে শিশুদের দেখাশোনা করার জন্য সব সময় দুইজন পুলিশ সদস্য থাকে। পাঠদান শেষে নিরাপদে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, দরিদ্র এসব শিশুদের কেবলমাত্র শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার যে উদ্যোগ আমরা নিয়েছি এটা খুব ক্ষুদ্র প্রয়াস। আমরা চাই, আমাদের পাশাপাশি সমাজের আরও মানুষ এ ধরনের ভালো কাজে এগিয়ে আসুক। তাহলেই সমাজে পজিটিভ পরিবর্তন সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, এখানে প্রাথমিকভাবে শিশু থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এদের বেশির ভাগই ঝড়ে পড়া শিশু। আমরা শিশুদের বই-খাতা, কলম-পেনসিল থেকে শুরু করে খেলাধুলার ব্যবস্থাও পুলিশি খরচে করেছি। ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ স্কুল করে এসব গরীব শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে আমাদের।
নওগাঁর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি এ্যাড. আব্দুল বারী বলেন, সমাজে পুলিশ সম্পর্কে সব সময় একটা নেগেটিভ ধারনা কাজ করে। নওগাঁর পুলিশ যে উদ্যোগ নিয়েছে এতে পুুলিশের প্রতি মানুষের খারাপ ধারনা দূর হবে। পুলিশ সদস্যরা রাষ্ট্রের প্রতি নিয়মিত দ্বায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজের জন্য মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা সত্যিই অনন্য। এভাবে সবাই ভালো কাজে এগিয়ে এলে দেশ সামনে এগিয়ে যাবে, গোটা জাতি আলোকিত হবে।
বিডি প্রতিদিন/২৮ জুলাই ২০১৮/হিমেল