BSRM
৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:২৯
সাক্ষাৎকার

দেশের বিপণন ব্যবস্থায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছি (ভিডিও)

তাঁকে বলা হয় বাংলাদেশের ফিলিপ কটলার। তিনি দেশের মার্কেটিং কিংবদন্তি সৈয়দ আলমগীর, আকিজ ভেঞ্চারসের গ্রুপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওদের মধ্যে সৈয়দ আলমগীর স্বনামখ্যাত। তাঁর দেওয়া স্লোগান ‘শতভাগ হালাল সাবান’ এক সময় একটি নতুন সাবানের ব্র্যান্ডকে বাজারের শীর্ষে তুলেছিল। সৈয়দ আলমগীরের বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সাইফ ইমন ও ছবি তুলেছেন রোহেত রাজীব

দেশের বিপণন ব্যবস্থায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছি (ভিডিও)

সৈয়দ আলমগীর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, আকিজ ভেঞ্চারস লিমিটেড

বাংলাদেশ প্রতিদিন : বাংলাদেশের বিপণন ব্যবস্থায় কিংবদন্তি বলা হয় আপনাকে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

সৈয়দ আলমগীর : আমি বাংলাদেশের মার্কেটে অনেক দিন ধরে কাজ করে যাচ্ছি। অনেক অনেক ভালো পণ্য তুলে দিতে পেরেছি ভোক্তাদের জন্য। আমার দেওয়া ব্র্যান্ডগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভোক্তারা উপভোগ করছেন। এই জন্যই হয়তো অনেকে এমনটা বলে থাকেন। সামনেও আরও ভালো কাজ করে যেতে চাই।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিপণন ব্যবস্থায় আপনি চেঞ্জ মেকার। পেশাগত জীবনে বিপণন ব্যবস্থায় কেন আগ্রহী হলেন?

সৈয়দ আলমগীর : আমার মনে হয় বিপণন ব্যবস্থা খুবই আনন্দের কাজ। এখানে ক্রিয়েটিভিটির সুযোগ রয়েছে। আমার একটা পণ্য বা ব্র্যান্ড যখন মানুষ পছন্দ করছে, ব্যবহার করছে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পণ্যগুলো আমার নিজের সন্তানের মতোই। অনেক যত্ন নিয়ে পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেছি। অনেক সময় একদম নতুন পণ্য নিয়ে কাজ করেছি যা মানুষ ভালোবেসে গ্রহণ করেছে। আর চেঞ্জ মেকার বলা হয় কারণ হতে পারে আমি অনেক পরিবর্তন এনেছি বিপণন ব্যবস্থায়। যেমন বলতে পারেন সাবানের সঙ্গে হালালের কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু আমি আমার সাবানকে ১০০ ভাগ হালাল বলেছি। এ ক্ষেত্রে আমি সফল হয়েছি। এসিআইতে যখন ছিলাম তখন আমি বলেছি এসিআই লবণ মেধা বিকাশে সাহায্য করে। এই কথাটি সম্পূর্ণ সত্য তবে আমার আগে কেউ কখনো চিন্তা করে নাই। আর দেখবেন হালাল মানেই মানুষ খাদ্যপণ্য মনে করে কিন্তু আমি দেখিয়েছি সাবানও হালাল হতে পারে। অর্থাৎ এর উপকরণ থেকে উৎপাদন প্রক্রিয়া পুরোটাই হালাল উপায়ে হয়েছে। যা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য- সেটাই আমি বলতে চেয়েছি। এমন করে আমি অনেক রকম পণ্য নিয়ে বিপণন ব্যবস্থায় সফলতা পেয়েছি। আরও একটা বিষয়- আমি দেশের মানুষের জন্য প্রথম সাদা লবণ নিয়ে এসেছি। এটাও মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে। আবার আমি বাংলাদেশে প্রথম লেমিনেটিং টিউবে টুথপেস্ট বাজারজাত করি। এর আগে সবাই অ্যালুমিনিয়াম টিউবে টুথপেস্ট বাজারজাত করতেন। আজকের যে আধুনিকায়ন তা আমার হাত দিয়েই হয়েছে। এ রকম অনেক  ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছি দেশের বিপণন ব্যবস্থায়।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : হালাল সাবানের আইডিয়ার পেছনের গল্পটা জানতে চাই।

সৈয়দ আলমগীর :  হালাল সাবানের ধারণাটা ভালো সাড়া ফেলেছিল দেশজুড়ে। এর আগে আমি অ্যারোমেটিকের ৪২টি পণ্য নিয়ে কাজ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে দুই রকমের টুথপেস্ট, ফ্রেশ এ  ক্লিন তিন ধরনের, ট্যালকম পাউডার, বেবি পাউডার, কোল্ড ক্রিম ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই দিয়েছি। এরপর ভাবলাম সাবান দিব। সে সময় ইউনিলিভারের এমডি বলেছিলেন সাবান দিয়েন না। দেড় শ বছরের পুরনো লাক্স সাবান বাজারে তখন। এই সাবানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এসে পারবেন না। সারা বিশ্বে এই পণ্যটা পাওয়া যায়। সারা বিশ্বে এমন কোনো নায়ক নায়িকা বা মডেল নাই যে লাক্স সাবান নিয়ে কাজ করে নাই। এই কথা শুনে আমি তখন খুবই চিন্তায় পড়ে যাই। তবে আমি খুব ভালো মানের সাবান উৎপাদনে গেলাম। আমি এটির বিপণনের ক্ষেত্রে ইউনিক পয়েন্ট সেরিং ভিউ নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করি। যেন সে আর সবাইকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিতে পারে। হঠাৎ করেই আমার মাথায় আসে, আমার সাবান গরু এবং শূকরের চার্বি থেকে নয় বরং ভেজিটেবল ফ্যাট থেকে। সুতরাং আমি বলতে পারি আমার সাবান ১০০ ভাগ হালাল। অনেকেই ভেবেছিলের এটা বুমেরাং হবে। তবে আমার বিশ্বাস ছিল। আমি আমার দেশের ভোক্তাদের চিনি। আমি জানতাম হিন্দু হোক মুসলমান হোক সবাই এটা পছন্দ করবে। পরবর্তীতে প্রমাণ হলো আমার ধারণা সঠিক ছিল। এভাবেই একচেটিয়া বাজার পেয়ে যায় ১০০ ভাগ হালাল সাবান। এই আইডিয়াটি বিশ্বের এক নম্বর মার্কেটিং ব্যক্তিত্ব, লেখক ফিলিপ কটলারের মার্কেটিং বইয়ে স্থান পেয়েছে। আমি ছাড়া এই উপমহাদেশের আর কারও ব্যক্তি নাম দিয়ে আসে নাই। জীবনে অনেক কিছুই পেয়েছি কিন্তু এটা আমার জীবনে অনেক বড় পাওয়া।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : চাকরি জীবনের শুরুটার সম্পর্কে জানতে চাই।

সৈয়দ আলমগীর : আমি আইবিএ থেকে পাস করে চাকরি শুরু করি মে অ্যান্ড বেকারে। যার বর্তমান নাম স্যানোফি অ্যাভেন্টিস। বিশ্বের প্রথম সারির ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান। আমি সেখানে সুদীর্ঘ ১৬ বছর কর্মরত ছিলাম। আমি জয়েন করেছিলাম রিজিয়নাল চিফ হিসেবে। আর যখন চাকরি ছেড়ে দিই তখন আমি প্রতিষ্ঠানটির সেকেন্ড পারসন ছিলাম। পরবর্তীতে আমি যমুনা গ্রুপে গ্রুপ মার্কেটিং ডিরেক্টর হিসেবে জয়েন করি। স্যানোফিতে থাকা অবস্থায় আমি খুবই এগ্রেসিভ সেলসম্যান হিসেবে পরিচিত ছিলাম। সে সময়ের অনেক স্মরণীয় স্মৃতি রয়েছে। সে সময় আমি মাঠ পর্যায়ে সশরীরে গিয়ে কাজ করেছি। যদিও পদবি অনুযায়ী এটা করতে আমি বাধ্য ছিলাম না। তারপরও আমি ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১১৫ রাত পরিবারকে ছাড়া বাইরে কাটিয়েছি। সে সময় পঞ্চগড় থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত এমন একজন ডাক্তারও নেই যিনি আমাকে দেখেন নাই। সিনিয়র কনসালটেন্ট এমন একজনও নেই যারা আমাকে কমপক্ষে দুইবার তিনবার দেখেন নাই। যদিও আমি একদিনও বইরে না থাকলে কিছু হতো না। আমি যদি অফিসে বসেই আমার টার্গেট পূরণ করতে পারি তাহলে কারও কিছু বলার নেই। আমি টার্গেটের চেয়ে ১৬% বেশি বিক্রি করেছি। এমন অনেক জায়গা ছিল যেখানে ভালো হোটেলও ছিল না থাকার জন্য। কিন্তু আমি সর্বদাই বিশ্বাস করতাম নিজের উন্নতির জন্য। এই চেষ্টা আমি সারা জীবনই করে গেছি। নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য কাজ করে গেছি। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আকিজ ভেঞ্চারস লিমিটেডে বর্তমানে কর্মরত আছেন। এর সম্পর্কে জানতে চাই।

সৈয়দ আলমগীর : আমাকে জয়েন করার জন্য আগ্রহী ছিলেন তারা। আমিও ভেবে দেখলাম ভালো হবে। নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়া যাবে। এর আগে ২২ বছর এক জায়গায় ছিলাম, তাই পরিবর্তন চেয়েছিলাম। এর আগে আমি এসিআইতেও ভালো ছিলাম। যমুনাতে আমার ভালো সময় কেটেছে দীর্ঘদিন। আকিজের ফ্যাক্টরি খুবই আধুনিক। আকিজের পণ্য অনেক উচ্চমানের। উৎপাদন ব্যবস্থাও অনেক উন্নত।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : পণ্যের ক্ষেত্রে পছন্দসই ট্যাগলাইন নির্বাচনে আপনার সাফল্যের উৎস কী?

সৈয়দ আলমগীর :  এই বিষয়ে আমি বলব আমি মানুষকে বুঝতে পারি যা বললে সে খুশি হবে। কীভাবে বললে মানুষকে আকৃষ্ট করা যাবে এটা আমি জানি। আপনি যদি খুব গভীরভাবে মানুষকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন। এই দেশে আমার জন্ম। তাই আমি এই দেশের মানুষকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। সত্য কথাটা কত সুন্দর করে বলা যায় এটা আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছি। যেমন সাবানের বিষয়টা দেখবেন এটা আসলে হালালই ছিল। কিন্তু মানুষের কাছে কথাটা পৌঁছে দিয়েছি মাত্র। এখন দেখবেন হালাল সাবান পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনার সাফল্যমন্ডিত কর্মজীবনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাই।

সৈয়দ আলমগীর : আমার অনুপ্রেরণা আমার সহকর্মীরা। পাশাপাশি আমার পরিবার অবশ্যই আমার অনুপ্রেরণা। আমার তিন মেয়ে, আমার স্ত্রী আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে রাখছে। আমার বস যাঁরা ছিলেন তাঁরাও আমাকে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দিয়ে গেছেন।

 

 

 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর

BSRM