আওয়ামী লীগের তিন কালের নয়টি গোপন কাহিনি বলব। কাহিনিগুলো খুবই সহজসরল এবং কিছুটা ঘরোয়া ধরনের। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নব সংসদ, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার দশম সংসদ এবং রাতের ভোটের ১১তম সংসদের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয়েছিল সেই সরকারের কিছু কার্যক্রম এবং সরকারি দলের হর্তাকর্তাদের কিছু কাহিনি বললেই আপনারা বুঝতে পারবেন কীভাবে একটি গণতান্ত্রিক দল ধীরে ধীরে স্বৈরাচারীর পোশাকে নিজেদের আবৃত করল এবং ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখে বাঙালির পলায়নপর স্বভাবের ঐতিহাসিক নাটক মঞ্চস্থ করল।
শুরুটা করি ২০০৯ সাল দিয়ে। আমার যতটা মনে হয়েছে আওয়ামী লীগ জানত তারা বিজয়ী হবে কিন্তু সেবারের নির্বাচনে যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়েছিল, তা তাদের স্বপ্নের মধ্যে ছিল না। স্বয়ং শেখ হাসিনা নির্বাচনের ফলাফল দেখে কতটা বিস্মিত হলেন সেই কাহিনি বললে আপনারা চমকিত না হয়ে পারবেন না। প্রথম সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তিনি এমপিদের সংখ্যা এবং নতুন মুখ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, মোট দলীয় এমপিদের সংখ্যা কত এবং সবাই উপস্থিত কিনা। প্রথমবার এমপি হয়েছে কারা, তারা দাঁড়াও- এই কথা শোনার পর আমরা দাঁড়ালাম। তিনি মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘এ-ও কী সম্ভব!’ উল্লিখিত ঘটনার পর তিনি বললেন, ‘এক-এগারোর সময় যখন জেলে ছিলাম তখন মনে হতো আজই বোধ হয় শেষ দিন। কোনো দিন বের হব, এমপি-মন্ত্রী হব- এমন কল্পনা করার সাহস ছিল না। অথচ আজ এ কী দেখছি, আল্লাহ কী না পারেন।’ এতটুকু বলার পর তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন এবং এক-এগারোর সময় সংস্কারবাদী রূপে পরিচিত র্যা ট গ্রুপের সদস্যদের দিকে তির্যকভাবে তাকালেন। বললেন, ‘বুঝেছি। আল্লাহ আমাকে ক্ষমতায় এনেছেন, তোমরা যারা আমার সর্বনাশ করার চেষ্টা করেছ তাদের কথায় আর চলব না। যেহেতু আল্লাহ ক্ষমতা দিয়েছেন সেহেতু তিনিই আমাকে রক্ষা করবেন। কাজেই শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমার মন যা বলে জ্ঞানবুদ্ধি-অভিজ্ঞতা যেভাবে আমাকে তাড়িত করবে সেভাবেই সরকার চালাব ইনশাল্লাহ।’
তিনি আরও বললেন, ‘তোমাদের মুরোদ কতটুকু তা এক-এগারোর সময় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। সবাই কাঁটা খাওয়া বিলাই। চকির নিচে পালিয়ে থাকে কাঁটা দেখলে লোভের তাড়নায় বের হয়ে ফুচকি দেয় এবং লাঠি উঠালে দৌড়ে আবার চৌকির নিচে পালায়।’ শেখ হাসিনা যে কাউকে পাত্তা দেবেন না কিংবা করও সঙ্গে পরামর্শ করবেন না সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যেদিন মন্ত্রিপরিষদ গঠন হলো। বঙ্গভবনে সেদিন কী যে ঘটেছিল তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। পটুয়াখালী সদর আসনের এমপি অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া আমাদের জেলার সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ মানুষ। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা করে সবাই চাচা বলি। তিনি গুলিস্তানের একটি হোটেলে ছিলেন। আমি ফোন করলাম, চাচা বঙ্গভবনে কখন যাবেন। তিনি বললেন, ‘আমার তো গাড়ি নেই। তোমার সঙ্গে যাওয়া যাবে কি না।’ আমি বললাম, অবশ্যই। আমি আরও বললাম, আপনার মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা আছে জেলা কোটা অথবা বিভাগীয় কোটায় আপনি মন্ত্রী হবেন। খুশিতে আটখানা হয়ে চাচা বললেন, ‘কও কী ব্যাডা! আমি এখনই তোমার অফিসে আসছি।’
বঙ্গভবনের অনুষ্ঠান ছিল সন্ধ্যা ৭টায় আর চাচা আমার অফিসে এলেন বেলা ৩টার সময়। আমি বললাম, যাক ভালোই হলো। আমার গাড়িতে করে বঙ্গভবনে যাবেন আর ফিরবেন মন্ত্রীর পতাকাওয়ালা গাড়িতে। চাচা বললেন, ‘ব্যাডা! একটা ঘরের কথা কই। তোমার চাচিও মনে করে আমি মন্ত্রী হব, তাই আমার সঙ্গে ঢাকা এসেছে।’ যা হোক, আমরা বিকাল ৫টার মধ্যে বঙ্গভবনে পৌঁছলাম। তখন আমি লেক্সাস ভি৮ মডেলের যে গাড়িটি চালাতাম তা ঢাকা শহরে সেই জমানায় বেশ প্রাইড অ্যান্ড প্রেস্টিজের সিম্বল ছিল। বঙ্গভবনের মূল হলরুমের সামনে আমরা যখন গাড়ি থেকে নামলাম তখন অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা প্রথমে গাড়ির দিকে তাকালেন তারপর আমাদের লক্ষ্য করে স্যালুট দিলেন। আমি এই প্রথম কোনো কর্মকর্তার স্যালুট পেলাম এবং অবাক হলেও তা আমার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করলাম না। কিন্তু চাচার ক্ষেত্রে ঘটল ভিন্ন ঘটনা। তিনি বললেন, ‘ব্যাডা! আমি তো আগেও কয়েকবার এমপি হইছি, জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র কিন্তু ওসি ছাড়া তো কেউ স্যালুট দ্যায় নাই। তা আজ ব্রিগেডিয়ার সাব স্যালুট দিল ক্যা! সে কি জেনে গেছে যে আমি মন্ত্রী হচ্ছি।’ আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, হয়তো তাই। এরপর চাচা-ভাতিজা হাত ধরাধরি করে বঙ্গভবনের হলরুমে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, আমরা ছাড়া সেখানে কেউ নেই। সুতরাং সময় পেয়ে আমরা সুখদুঃখের গল্পে মেতে উঠলাম। চাচা বললেন, ‘ব্যাডা! তোমার তো অনেক বুদ্ধি! আমারে একটা পরামর্শ দ্যাও তো।’ আমি বললাম, কী পরামর্শ! তিনি বললেন, ‘সংসদে যেদিন শপথ নিলাম সেদিন অনেককে টেলিভিশনে দেখা গেছে কিন্তু আমারে দেখা যায় নাই। এই কারণে পৌট্টাখালীর শয়তানরা বলাবলি করতাছে যে শাহজাহান উকিলরে শপথ পড়ায় নাই। পাবলিকের কথায় তোমার চাচি রেগেমেগে আগুন। আজ আসার সময় বলে দিয়েছে, আজ যদি টেলিভিশনে তোমার ছবি না দেখা যায় তাইলে কিন্তু খবর আছে। এখন বল, কীভাবে টেলিভিশনে ছবি দেখানো যাবে।’
আমি বললাম, যথাসম্ভব আমাদের সামনে বসতে হবে। কথামতো আমরা একেবারে সম্মুখসারিতে গিয়ে বসলাম, যা বিচারপতি, সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং রাষ্ট্রদূতদের জন্য বরাদ্দ ছিল, যা উত্তেজনাবশত আমরা প্রথমে লক্ষ করিনি। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম তখন চাচা ভয়ে আঁতকে উঠলেন। বললেন, ‘ব্যাডা কাম সারছে- আইজ তো আমও গ্যালো-ছালাও গ্যালো।’ আমি বললাম, ক্যানো। তিনি বললেন, ‘এখান থেকে তো আমাদের উঠিয়ে দেবে। তখন কই বসব, চাইয়্যা দ্যাহো। পেছনের সব সিট ভইরা গেছে।’ আমি শান্তভাবে জবাব দিলাম, চিন্তার কোনো কারণ নেই- কেউ জোর করে আমাদের এখান থেকে উঠে যেতে বলবে না। এমন সময় হঠাৎ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এসে আমাদের পাশে বসলেন, একটু পরে শেখ সেলিমও এলেন এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পাশে বসলেন। চাচা বললেন, ‘ব্যাডা খাইছে অ্যাহন যদি তোফায়েল ভাই, আমু ভাই আসেন তবে তো সিট ছেড়ে দিয়ে আমাদের আবারও পেছনে চলে যেতে হবে।’
চাচাকে আশ্বস্ত করে বললাম, তোফায়েল ভাই, আমু ভাই আমাকে চেনেন না। তাঁদের দেখে আমি না চেনার ভান করব, তখন তাঁরা মনে করবেন আমি হয়তো কোনো রাষ্ট্রদূত। কিন্তু সমস্যা তো আপনাকে নিয়ে। আপনি তো আর না চেনার ভান করতে পারবেন না। সিট ছেড়ে দিয়ে পেছনে যেতে হবে। চাচা প্রথমে আঁতকে উঠলেন তারপর আমাকে দায়ী করে বললেন, ‘পোলার বুদ্ধি গলায়। তোমার কথায় আজ আমি সামনে বসতে গিয়ে কী যে বিপদে পড়লাম।’ আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে বললাম, চিন্তার কারণ নেই। আপনি চোখ বুজে ঘুমের ভান করুন। ১০-১৫ মিনিটে সব আসন পূর্ণ হয়ে যাবে। সিনিয়র কেউ এলে আপনাকে ঘুমন্ত মনে করে ডিস্টার্ব করবে না। চাচা আনন্দে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ব্যাডা! এত বুদ্ধি নিয়ে ঘুমাও কীভাবে’- তারপর চোখ বুজে ঘুমের ভান করলেন।
সব আসন পূর্ণ হয়ে গেলে আমি চাচাকে চোখ খুলতে বললাম। তিনি চোখ খুলে প্রথমেই বললেন, ‘সর্বনাশ! আজও তো আমাকে টেলিভিশনে দেখা যাবে না।’ তারপর তাঁর সামনের চেয়ারে বসা বিশালদেহী একজনকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওই দ্যাহো। ম্যান মাউনট্যান! আমার চেয়ে তিন ফুট উঁচা। ওনারে ভেদ করে ক্যামেরার আলো আমার দিকে আসবে না।’ চাচাকে আশ্বস্ত করে বললাম, আমাদের তিন-চারবার দাঁড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে সবার আগে দাঁড়াব এবং সবার পরে বসব- তখন হয়তো খানিকটা দেখা যেতে পারে। চাচা এটাকে মন্দের ভালোরূপে মনে করে খানিকটা আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মধ্যে একটি ঘটনা পুরো হলরুমে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিল। এ দফায় কারা মন্ত্রী হবেন সেই তথ্য আগে জানানো হয়নি। ফলে সবার মধ্যে ছিল আবেগ, উৎকণ্ঠা এবং টানটান উত্তেজনা, এই অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্তারা অনেকগুলো চেয়ার আনলেন এবং সেসব চেয়ারে মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের নামসংবলিত ছোট প্ল্যাকার্ড টাঙিয়ে দিলেন, যা কাছাকাছি না গিয়ে দেখা সম্ভব নয়।
যাঁরা মন্ত্রী হওয়ার প্রত্যাশায় ছিলেন তাঁরা দৌড়ে চেয়ারগুলোর সামনে গেলেন। যাঁরা নিজেদের নাম দেখতে পেলেন তাঁদের চেহারায় পূর্ণিমার চাঁদ ভেসে উঠল- আর যাঁরা নিজেদের নাম দেখতে পেলেন না, তাঁরা হতাশা-ক্ষোভ-ক্রোধে বিমর্ষ হয়ে এমনভাবে নিজ নিজ আসনের দিকে ফিরে এলেন, যা দেখে মনে হলো তাদের মতো হতভাগ্য-অসহায় এতিম বোধ হয় দুনিয়াতে দ্বিতীয়টি নেই। আগেই বলেছি আমাদের পাশে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং শেখ সেলিম ছিলেন। তাঁরা মন্ত্রী তালিকায় নিজেদের নাম দেখতে না পেয়ে যায়পরনাই হতাশ-ক্ষুব্ধ এবং রাগান্বিত। এমন সময় বঙ্গভবনে কর্মরত একজন মহিলা কর্তা, যিনি হয়তো শেখ সেলিমকে চিনতেন না, তিনি তাঁর কাছে এসে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘স্যার! দয়া করে আপনাকে একটু পেছনে যেতে হবে- একজন সম্মানিত বিচারপতি এসেছেন।’ শেখ সেলিম মেজাজ হারালেন, চিৎকার করে বললেন, ‘অ্যাই যা ভাগ।’ ভদ্রমহিলা আতঙ্কে তাড়াতাড়ি পেছনে চলে গেলেন।
উল্লিখিত ঘটনার পর চাচা বললেন, ‘ব্যাডা! দেখে আস তো! আমার নাম আছে কিনা।’ আমি বললাম, আপনি গেলেই তো ভালো হয়। আমি আপনার সিট পাহারা দিতে পারব। কিন্তু আমি গেলে যদি অন্য কেউ আমার সিটে বসে যায় তখন আমার কী হবে। চাচা বললেন, ‘ব্যাডা, তুমি আমারে কী মনে কর, তুমি যাও। কিয়ামত হয়ে গেলেও তোমার সিট কেউ দখল করতে পারবে না।’ উত্তরে বললাম, আপনার এত সাহস তাহলে নিজে কেন নিজের নামটি নিজ চোখে দেখে আসছেন না। চাচা বললেন, ‘যদি দেখি আমার নাম নেই তবে ওখান থেকে ফিরে সিট পর্যন্ত আসতে আমার যে কী দশা হয়, তার ভরসা নেই। আমার বয়স ৭৩ বছর, হার্টের অবস্থা ভালো না। তা ছাড়া আমার আব্বা এবং দাদি ৭৩ বছর বয়সে মারা গেছেন।’ আমি আর কথা বাড়ালাম না। দৌড়ে গিয়ে তালিকা দেখে এসে জানালাম যে তালিকায় চাচার নাম নেই।
আমার কথা শুনে চাচা বললেন, ‘আমু ভাই, তোফায়েল ভাইয়ের নাম আছে!’ আমি বললাম, নেই। তখন তিনি স্বস্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘যেখানে আমু ভাই, তোফায়েল ভাই নেই সেখানে শাহজাহান উকিলের নাম কেন থাকবে। আমার তো বাবা মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা বা খায়েশ নেই। তবে কর্মীদের কথায় তোমার চাচি যে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে সে কারণে আমার আগ্রহ ছিল যা হোক মন্ত্রী ফন্ত্রী লাগবে না, এখন টেলিভিশনে চেহারা দেখালেই হলো।’
অনুষ্ঠান যথারীতি শুরু হলো। টেলিভিশন ক্যামেরায় নিজের ছবি দেখানোর জন্য চাচা প্রতিবারই আগে দাঁড়ালেন এবং বসার সময় ২০-৩০ সেকেন্ড পরে বসলেন এবং প্রতিবারই পেছন থেকে শব্দ হলো, ‘এই মিয়া বসেন।’ অনুষ্ঠান শেষে আমরা চাচার হোটেলে ফিরলাম। বিষণ্ন চাচি বললেন, ‘আজও তোমারে দেখা যায় নাই।’ চাচা বললেন, ‘আমি কী করব। রনির কথামতো সবার আগে দাঁড়াইলাম আবার সবার পরে বসলাম। পেছন থেকে লোকজনের গালিগালাজ শুনলাম তারপরও যদি টেলিভিশনে না দেখা যায় তবে কিছু করার নেই...।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : শিরোনামের নয়টি কাহিনির মধ্যে মাত্র দুইটি বলা হলো। পাঠকদের আগ্রহ এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকলে ভবিষ্যতে একই শিরোনামে বাকি কাহিনিগুলো প্রকাশ করা হবে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক