শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ জুলাই, ২০২০ ২২:০৪

গানের সাম্রাজে আব্বাসউদ্দীন পরিবার

গানের সাম্রাজে আব্বাসউদ্দীন পরিবার
Google News

ভাওয়াইয়া গানের অমর শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ভারতবর্ষজুড়ে। পল্লীগীতি, আধুনিক, স্বদেশি, ইসলামী ও উর্দুগানে তিনি বিশেষ সাফল্য লাভ করেছিলেন। তাঁর দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লীগানের সুর আজও অদ্বিতীয়। তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে মুস্তাফা জামান আব্বাসী এবং ফেরদৌসী রহমান সংগীত জগতে অনন্য নাম। এই সংগীত পরিবারকে নিয়ে লিখেছেন- পান্থ আফজাল

 

মরমি শিল্পীর বংশ পরিচয় বৃত্তান্ত

কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

 

আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষাজীবন

আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বলরামপুর গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। খুব ভালো ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯১৯ সালে তুফানগঞ্জ হাইস্কুল থেকে আব্বাসউদ্দীন ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। কিন্তু এখানে বেশি দিন থাকা হয়নি। সে সময় তাঁর মন এবং স্বাস্থ্য কোনোটাই ভালো যাচ্ছিল না। তাই রাজশাহী কলেজ ছেড়ে ভর্তি হন কাছের শহর কুচবিহার কলেজে। ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। তবে বিএ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে কলকাতায় চলে যান।

 

আন্দোলনের রসদ যখন তাঁর গান

১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন তিনি। চল্লিশের দশকে আব্বাসউদ্দীনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দফতরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে আব্বাসউদ্দীন ১৯৫৫ সালে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংগীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেন।

 

সংগীত জগতে প্রবেশ

ছোটবেলা থেকেই যেমনই ছিল তার গানের গলা, তেমনি পড়াশোনায়ও গভীর মনোযোগ। গানের জগতে তাঁর ছিল না কোনো ওস্তাদের তালিম। আপন প্রতিভাবলে নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি প্রথমে ছিলেন পল্লীগাঁয়ের একজন গায়ক। যাত্রা, থিয়েটার ও স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর কাছে উচ্চাঙ্গসংগীত শিখেছিলেন। কলকাতায় আসার পর সংগীত জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।

 

সব্যসাচী গায়ক

গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন সুরকার ও সংগীত পরিচালক। শিল্পী শাকিল রাসেলের রেফারেন্স অনুযায়ী, রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া ভাভাগো ভাভা, ক্ষীরোল চটকা গেয়ে আব্বাসউদ্দীন প্রথমে সুনাম অর্জন করেন। তারপর জারি-সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, বিচ্ছেদি, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া, পালাগান ইত্যাদি গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। আধুনিক গান, স্বদেশী গান, ইসলামী সংগীত, পল্লীগীতি ও উর্দুগান গেয়েছেন তিনি।

 

নবজাগরণের শিল্পী

বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তিনি আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি যে সময় গান শুরু করেন সময়টা ছিল বাংলার মুসলমান সমাজের নবজাগরণের কাল। আব্বাসউদ্দীন নবজাগরণের শিল্পী। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য মুসলমান কবি-সাহিত্যিক তাদের রচনা দিয়ে মুসলিম চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। কুচবিহারে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আব্বাসউদ্দীনের প্রথম পরিচয় হয়। নজরুলও খুব স্নেহ করতেন তাকে। কবি সবার কাছে আব্বাসউদ্দীনকে পরিচয় দিতেন ‘আমার ছোটভাই’ বলে। প্রায় ২০ বছর তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহচর্যে ছিলেন। আব্বাসউদ্দীন নজরুলের অনেক গান এরই মধ্যে রেকর্ড করে ফেলেন। তাই তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।

ও মন রমজানেরই

যে কোনো গান শোনা মাত্র তিনি সুমধুর কণ্ঠে আয়ত্তে নিতে পারতেন। জাতীয় কবির বিখ্যাত গান ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে...’ গানটি প্রথম গেয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। যে গানটি না শুনলে রোজার ঈদকে ঈদই মনে হয় না। গজলেও তিনি অতুলনীয়। ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের...’ ইত্যাদি গেয়েছেন।

 

প্রথম মুসলিম গায়ক

তাঁর ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল মরে গো’ ও অপর পিঠে ‘স্মরণ পায়ের ওগো প্রিয়’ বাজারে বের হওয়ার পর পরই সাড়া পড়ে যায়। আব্বাসউদ্দীন ছিলেন প্রথম মুসলিম গায়ক, যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচএমভি থেকে গানের রেকর্ড বের করতেন। রেকর্ডগুলো ছিল বাণিজ্যিকভাবে ভীষণ সফল। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের ইসলামী ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন।

 

ভাওয়াইয়া গায়ক যখন অভিনেতা

আব্বাসউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন অভিনেতাও। তিনি মোট চারটি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এগুলো হলো-‘বিষ্ণুমায়া’ (১৯৩২), ‘মহানিশা’ (১৯৩৬), ‘একটি কথা’ এবং ‘ঠিকাদার’ (১৯৪০)। ঠিকাদার ছবিতে আব্বাসউদ্দীন একজন কুলির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এসব সিনেমায় তিনি গানও করেছিলেন। তখনকার দিনে মুসলমান ব্যক্তির সিনেমা করা ছিল এক ব্যতিক্রম ঘটনা।

 

পল্লীসম্রাটের প্রিয় কিছু গান

আব্বাসউদ্দীনের রেকর্ড করা গানের সংখ্যা প্রায় ৭০০। ‘ও কী গাড়িয়াল ভাই’, ‘তোরষা নদী উথাল পাতাল, কারবা চলে নাও’, ‘প্রেম জানে না রসিক কালাচান’, মাঝি বাইয়া যাও, নাও ছাড়িয়া দে, ওই শোন কদম্বতলে, ও ঢেউ খেলেরে, নদীর কূল নাই, একবার আসিয়া সোনার, আল্লাহ মেঘ দে, আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি, ও কী ও বন্ধু কাজল ভোমরা রেসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কণ্ঠশিল্পী এই মরমিশিল্পী। এই শিল্পীর লেখা ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ (১৯৬০) একটি মূল্যবান তথ্যসমৃদ্ধ আত্মচরিত গ্রন্থ। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত হন।

 

মাত্র ৫৮ বছর বয়সে বিদায়

পল্লীগানের সম্রাট ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর অগণিত সংগীতপ্রেমীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে চিরবিদায় নেন। মাত্র ৫৮ বছরের সংগীত ক্যারিয়ারে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন যে অবদান রেখে গেছেন, তা যুগ যুগ ধরে বাঙালি স্মরণে রাখবে।

 

একজন সফল পিতা

শিল্পী আব্বাসউদ্দীন পিতা হিসেবেও ছিলেন সফল। তাঁর বড় ছেলে (প্রয়াত) ড. মোস্তফা কামাল বারএট’ল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি ছিলেন। মেঝো ছেলে মুস্তাফা জামান আব্বাসী একজন প্রথিতযথা কণ্ঠশিল্পী ও লেখক। একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী রহমানের নাম কারও অচেনা নয়- আধুনিক, খেয়াল, গজল, ভাওয়াইয়া, ঠুংরী প্রভৃতি গানে স্বনামখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের সমান দখল রয়েছে।

 

বড় ছেলে ছিলেন প্রধান বিচারপতি

আব্বাসউদ্দীনের বড় ছেলে বিচারপতি মোস্তফা কামাল ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ এবং নবম প্রধান বিচারপতি। সংগীতশিল্পী নাশিদ কামাল তাঁর মেয়ে। 

 

মেয়ে সংগীতসম্রাজ্ঞী ফেরদৌসী রহমান

আব্বাসউদ্দীনের সুযোগ্য কন্যা চিরসবুজ গানের পাখি ফেরদৌসী রহমান। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই সংগীতশিল্পী প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংগীত শিক্ষক হিসেবে সবার কাছে এক মুগ্ধতার নাম। কণ্ঠে কিংবা চেহারায় আগে যেমনটি ছিলেন এখনো ঠিক তেমনই রয়েছেন। বাংলা গানে অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম বলা হয় তাঁকে। বাংলা গানের বিভিন্ন ধারার অনেক কিছুর শুরু তাঁর হাতে। পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল সংগীত, আধুনিক এবং প্লে-ব্যাক সব ধরনের গানই তিনি করেছেন। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী চিরসবুজ এই কণ্ঠশিল্পীকে সবাই ভালোবেসে খালামণি বলে ডাকে। বিটিভিতে বাচ্চাদের হাতে-কলমে গান শেখার আসর ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠান শুরু তার হাত দিয়েই। ঊনআশি বছর বয়সে এসেও এতটুকু থামেননি তিনি। বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত সংগীত একাডেমিতে সময় দিচ্ছেন।

 

সুযোগ্য সন্তান মুস্তাফা জামান আব্বাসী

আব্বাসউদ্দীন আহমদের কনিষ্ঠপুত্র মুস্তাফা জামান আব্বাসী। যিনি অসাধারণ একজন সংগীতজ্ঞ, লেখক ও সংগীত গবেষক। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ‘কাজী নজরুল ইসলাম এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদ গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্র’ এর গবেষক। নজরুল ইসলামকে নিয়ে তার কাজের জন্য তিনি ২০১৩ সালে নজরুল মেলায় আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। আব্বাসী মোট ৫০টি বই প্রকাশ করেছেন। তিনি ভাওয়াইয়া গানের ওপর দুটি বই প্রকাশ করেন। যার মধ্যে ১২০০ গানের উল্লেখ রয়েছে। তাঁর দুই কন্যা সামিরা আব্বাসী এবং শারমিনী আব্বাসীও সংগীতের অন্তঃপ্রাণ।