শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ জানুয়ারি, ২০২১ ২২:২৩

দেশাত্মবোধের দুর্জয় নাবিক এবারের ইত্যাদি

শোবিজ প্রতিবেদক

দেশাত্মবোধের দুর্জয় নাবিক এবারের ইত্যাদি

গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টেলিভিশন রাজ্যে গুণে-মানে, দর্শক পছন্দের শীর্ষে থেকে এখনো যে অনুষ্ঠানটি দেশের ঐতিহ্যের স্বাক্ষর হয়ে রয়েছে তার নাম ‘ইত্যাদি’। আর এই অনুষ্ঠানটির জন্য দর্শকরা এখনো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। অনুষ্ঠানের নির্মাতা, পরিচালক, উপস্থাপক বরেণ্য নির্মাতা হানিফ সংকেত আসলেই একজন মিডিয়া ম্যাজিশিয়ান। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন কোনটা ভুল, কোনটা নির্ভুল। কোনটা উচিত, কোনটা অনুচিত। যে কারণে ইত্যাদি শুধু আনন্দই দেয় না, মানুষকে ভাবায়। এই করোনা দুর্যোগের মধ্যেও হানিফ সংকেত স্বাস্থ্যবিধি মেনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এবারের ইত্যাদি ধারণ করেছেন পতেঙ্গায় বাংলাদেশ নেভাল একাডেমিতে। আর অনুষ্ঠান নির্মাণে এই শৃঙ্খলাবোধও অনেকের জন্য শিক্ষণীয়। দেখতে বসে ৭০ মিনিটের অনুষ্ঠানটি কীভাবে যে শেষ হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। প্রতিবারের মতো এবারও ইত্যাদিতে ছিল নানান বিষয়ের সমাহার। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে যেন নতুন রূপে দেখল এবং চিনল দর্শক। ইত্যাদিতে প্রচারের আগে নৌবাহিনীর কর্মকান্ড সম্পর্কে মানুষের এত বিস্তৃত ধারণা ছিল না। নৌবাহিনীকে নিয়ে করা প্রতিটি প্রতিবেদন এবং আইটেমই ছিল অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ, রোমাঞ্চকর, আধুনিক এবং চৌকস। আমাদের সমুদ্রসীমা রক্ষায় নৌবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে দেশের সাধারণ মানুষ ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তারিত জানতে পেরেছে। প্রশিক্ষিত নৌবাহিনীর অপরাজেয় কর্মকান্ডের জন্য সবাই গর্বিত। কণ্ঠশিল্পী রবি চৌধুরীর সঙ্গে নৌ-সদস্য লেফটেন্যান্ট সাদিয়ার গানটি ছিল উপভোগ্য। সাদিয়াকে মনেই হয়নি তিনি পেশাদার শিল্পী নন। হানিফ সংকেত যে ভালো সুরও করতে পারেন, এবারের গান দুটির সুর আবারও তা প্রমাণ করল। নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নৃত্যটিও ছিল বর্ণাঢ্য। সাগরকে ঘিরে এর শৈল্পিক চিত্রায়ণ ছিল মনোমুগ্ধকর। ইত্যাদির রাজশাহীর পুলিশ একাডেমি পর্বে ইত্যাদিতে স্মৃতিচারণ করা হয় কণ্ঠরাজ এন্ড্রু কিশোরকে নিয়ে আর এবার প্রয়াত শিল্পী আবদুল কাদেরকে নিয়ে। ইত্যাদির মামা চরিত্রের মাধ্যমে তিনি মানুষকে সৎ এবং ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার দীক্ষা দিয়েছেন নিয়মিত। আবদুল কাদেরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবারের পর্বে। এই পর্ব দেখে অনেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। এবারের ইত্যাদিতে ছিল দুর্দান্ত সব প্রতিবেদন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অজানা ও অদেখা, নিত্যনতুন সমাজবান্ধব বিভিন্ন বিষয় এবং জনকল্যাণকামী প্রচারবিমুখ মানুষদের নিয়ে হৃদয়ছোঁয়া সব প্রতিবেদন প্রচার করেছে ইত্যাদি। এবারও প্রতিটি প্রতিবেদন ছিল হৃদয়স্পর্শী, তথ্যসমৃদ্ধ ও মানবিক। সুবিধাবঞ্চিত অসহায় দরিদ্র শিশু-কিশোরদের লেখাপড়ার পাশাপাশি নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার এক অভিনব স্কুল অনৈতিকতার বিরুদ্ধে অবৈতনিক নৈতিক স্কুল ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী পর্ব। যার প্রতিষ্ঠাতা চট্টগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক গাজী সালেহউদ্দিন। খেজুরের গুড় নিয়ে সমসাময়িক প্রতিবেদনটি গুড় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করবে। ঝিনাইদহের বৃদ্ধ কৃষক হেলালউদ্দিনের কাছে এই সমাজের অনেকেরই অনেক কিছু শেখার আছে। ২৫ বছর আগে মেম্বার নির্বাচনের সময় তাঁর প্রতিশ্রুতি ছিল, ‘আমাদের কাজ আমরাই করব’, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’-আর সেই প্রুতিশ্রুতির জন্যই তিনি নিজ হাতে প্রতিদিন একটি বাজার, বাজারের আশপাশের রাস্তা, মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ সবই একা পরিষ্কার করেন। আর তাই বাজারটি সবসময় থাকে পরিষ্কার। তিনি মাটিকে ভালোবাসেন, আর তাই কেঁচো দিয়ে জৈব সার উৎপাদন করেন। জৈব সার উৎপাদনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা জেলার ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট পাখির প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস যেমন পাখিকে ভালোবাসেন, পাখিরাও তেমনি তাঁর কাছে আসে খাবারের আবদার নিয়ে। শুধু পাখিদের খাবার দেওয়াই নয়, তাদের জন্য বাসস্থানও তৈরি করে দিচ্ছেন মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস। হানিফ সংকেত যথার্থই বলেছেন মৃত্যুঞ্জয় একজন ব্যতিক্রমী পুলিশ কর্মকর্তা। সভ্যতার জন্মভূমি গ্রিসের আগোরার ওপর প্রতিবেদনটি ছিল তথ্যসমৃদ্ধ। এই পর্বের মাধ্যমে দর্শকদের গণতন্ত্রচর্চার স্থান দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। এবারের ইত্যাদির প্রতিটি নাট্যাংশই ছিল উপভোগ্য। আর এ কারণেই ইত্যাদি প্রচারের দিন বাংলাদেশ টেলিভিশন ফিরে পায় তার হারানো গৌরব, হয়ে ওঠে দেশের প্রধান চ্যানেল।


আপনার মন্তব্য