Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ অক্টোবর, ২০১৭ ২৩:৫৭

অপেক্ষায় আরও আড়াই লাখ

মংডু, বুসিদং ও রাসিদং রোহিঙ্গাশূন্য করা হচ্ছে, নৌকা না পেয়ে সাঁতরে আসছেন অনেকে

মাহমুদ আজহার ও ফারুক তাহের, কুতুপালং (কক্সবাজার) থেকে

অপেক্ষায় আরও আড়াই লাখ
উখিয়ায় গতকাল ত্রাণের জন্য অপেক্ষা —এএফপি

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় অন্তত আড়াই লাখ রোহিঙ্গা। আরাকান রাজ্যের মংডু, বুসিদং ও রাসিদংয়ের বিভিন্ন স্থানে এখনো তারা

পালিয়ে অবস্থান করছে। প্রাণনাশের হুমকি, খাদ্য সংকটসহ নানা কারণে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পথ ধরেছে। অনেকেই মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাগুলোয় পৌঁছেছে। আজকালের মধ্যেই শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ দক্ষিণপাড়া, উংচিপ্রাং, উলুবুনিয়া, লম্বাবিল, আঞ্জুমানপাড়া, জলপাইতলী ও তুমব্রু সীমান্তে রোহিঙ্গা স্রোতের ঢল নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসা বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, মংডু, বুসিদং ও রাসিদংকে রোহিঙ্গামুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেজন্য নতুন করে এই অভিযান। এ নিয়ে জাতিসংঘও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গতকাল নাফ নদে নৌকা না পেয়ে কয়েকজন রোহিঙ্গা পুরুষ সাঁতরিয়ে এপাড়ে আসার চেষ্টা করে। পরে অবশ্য কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে তুলে দেয়। শাহপরীর দ্বীপের বিপরীতে মিয়ানমারের নাইক্কন দীপেও অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। নৌকা সংকটের কারণে কয়েক দিন ধরেই তারা সেখানে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। সরেজমিনে দুই দিন ধরে বান্দরবানের তুমব্রু, জলপাইতলী, উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া, হ্নীলার লম্বাবিল সীমান্ত ঘুরে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা পল্লীতে আগুন জ্বলছে। পাড়াগুলোয় আগুনের কুণ্ডলীতে ওই এলাকায় আকাশের কালো রূপ দেখা যায়। ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে আশপাশ এলাকা। বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গাছপালা ও গুল্মগুলো লালচে আকার ধারণ করেছে। সকালে কোনো কোনো এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে দাহ্য পদার্থ ফেলতে দেখা যায়। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় নিয়মিতই বিজিপির পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে টহল দিতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও সেনাবাহিনীকে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দিতে দেখা গেছে। আবার একাধিক স্থানে নতুন করে মাইন পুঁতে রাখতেও দায়িত্বরত সেনাবাহিনীকে দেখা যায়। সম্প্রতি জেনেভায় ইউএনএইচসিআর বলেছে, আগামী কয়েক দিনে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত দেশত্যাগী রোহিঙ্গার ঢল নামতে পারে বাংলাদেশে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রানজিট সেন্টার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউএনএইচসিআর। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে উদ্ধৃত করে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বেশ কতগুলো স্থলপয়েন্ট দিয়ে কমপক্ষে ১১ হাজার রোহিঙ্গা হঠাৎ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নতুন এসব রোহিঙ্গার বেশির ভাগই রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে বুথিদং এলাকার। মংডু থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পূর্বে বুথিদং। এবার সেসব রোহিঙ্গা এসেছেন তারা বলছেন, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হত্যা করা হচ্ছে মানুষদের। একটি বালকের গলায় এ সময় দেখা গেছে বড় এক ক্ষত। বাংলাদেশে পৌঁছানোর জন্য তাদের টানা ১৪ দিন হাঁটতে হয়েছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তারা যে যা পেরেছেন তা-ই সঙ্গে করে এনেছেন। নাফ নদ পার হওয়ার আগে তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে বিস্তৃত জলাভূমি। রাসিদং থেকে সোমবার আসা ফাতেমা খাতুন নামে এক নারী জানান, বুসিদং, রাসিদং ও মংডুতে এখনো অন্তত আড়াই লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান অবস্থান করছেন। তাদের ধারণা ছিল, ‘বিশ্বের চাপে হয়তো রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন কমে আসবে। তাই এত দিন তারা আসেননি। কিন্তু এখন জীবননাশের হুমকির পাশাপাশি খাদ্য সংকটও চরমে। কেউ পালিয়ে থাকলেও লোকালয়ে আসতে পারছেন না। অভিশপ্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে তারা বাংলাদেশের উদ্দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা স্রোত নামতে পারে। বুসিদংয়ের চৌপ্রাং থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা মো. সিদ্দিক কলেন, ‘রাসিদংয়ের নদীবেষ্টিত একটি ছোট পাহাড়ি গ্রামে তিনটি মুসলিমপাড়া আছে। সেখানে ৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা আটকে রয়েছে। ঘটনার পর থেকে তারা কোথাও বেরোতে পারেনি। বেঁচে আছে কি মরে আছে, তাও জানি না। কারণ সেখানে নৌকা দিয়ে যাতায়াতও বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সেখানে মিলিটারি কিংবা মগেরা না গেলেও কোনো নৌকা সেখানে যেতে দিচ্ছে না। তারা এখন বেঁচে আছে না মরে গেছে, কেউ বলতে পারছে না।’ শাহপরীর দ্বীপ হয়ে আসা সুলাইমান নামে এক রোহিঙ্গা জানান, মংডুর শেষ প্রান্ত নাইক্কনদিয়ায় অন্তত আরও ২০ হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু অবস্থান নিয়েছে। নৌকা সংকট থাকায় তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশও করতে পারছে না। অনেকেই অনাহারে-অর্ধাহারে সেখানে রাত-দিন কাটাচ্ছে।

১০ হাজার টয়লেট বানাবে ইউনিসেফ : মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের অস্থায়ী ক্যাম্পে ১০ হাজার টয়লেট নির্মাণ করে দেবে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (রোহিঙ্গা সেল) হাবিবুল কবির এবং বাংলাদেশে ইউনিসেফের কান্ট্রি ডিরেক্টর এডওয়ার্ড বিগবেডার গতকাল সচিবালয়ে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং সচিব মো. শাহ কামাল এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ইউনিসেফের সহায়তায় ওই ১০ হাজার টয়লেট নির্মাণে ব্যয় হবে ১১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে।

বনের ক্ষতি ১৫০ কোটি ছাড়িয়েছে : রোহিঙ্গাদের জন্য এরই মধ্যে ১৫০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বনজ সম্পদ ধ্বংস হয়েছে বলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। শরণার্থীদের কারণে কক্সবাজারের পাহাড়, জলাশয়, সমুদ্রসৈকতসহ পরিবেশের অন্যান্য খাতেরও ক্ষতি হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। মঙ্গলবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাব দেওয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে সংসদীয় কমিটি। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে তারা। বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানবিক কারণে সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণও যাচ্ছে। কিন্তু তাদের জ্বালানির কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রাকৃতিক বন থেকে তারা জ্বালানি সংগ্রহ করছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।’

প্লাস্টিকের জার ধরে সাঁতরে বাংলাদেশে ১১ রোহিঙ্গা : প্লাস্টিকের জার ধরে মিয়ানমার থেকে নাফ নদ সাঁতরে বাংলাদেশে পৌঁছেছেন ১১ রোহিঙ্গা। তারা বলেছেন, রাখাইনে সেনাবাহিনীর নির্মম দমন-পীড়ন এখনো চলছে। খবর বিডিনিউজ। কোস্টগার্ডের শাহপরীর দ্বীপ স্টেশনের ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জাফর ইমাম সজীব জানান, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় শাহপরীর দ্বীপ থেকে ১১ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেন। উদ্ধার রোহিঙ্গাদের বরাতে তিনি বলেন, ‘এরা জারে ভর দিয়ে নাফ নদ সাঁতরে এসেছেন। তারা মিয়ানমার থেকে এসে শূন্যরেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে পড়েন। কোস্টগার্ড সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে কূলে নিয়ে আসেন।’ এই রোহিঙ্গাদের সবাই মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার মংডু শহরের আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। সাঁতরে শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটের যে অংশে তারা উঠেছেন, সেখানে নাফ নদ প্রায় ৩ কিলোমিটার চওড়া। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জাফর বলেন, ‘মিয়ানমারে এখনো রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, দমন-নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সকালেও সে দেশের সেনাবাহিনী ও তাদের মদদপুষ্ট লোকজন মংডু শহরের আশপাশের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় সহিংসতা চালিয়েছে বলে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।’ তাদের বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা বেশির ভাগই তরুণ, দু-তিন জন কিশোরও তাদের মধ্যে রয়েছে। বিজিবি এসব রোহিঙ্গাকে বালুখালী ক্যাম্পে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে বলে তিনি জানান।


আপনার মন্তব্য