Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২২:৪৪

সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যা করা দরকার করেছি : প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচন নিয়ে কারও মান ভাঙানোর ইচ্ছা নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যা করা দরকার করেছি : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কথা বলার স্বাধীনতা সবারই আছে। কাউকে বাধা দিইনি। কেউ বলতে পারবে না কারও  গলা চিপে ধরেছি। সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করার দরকার সবই করছি। গতকাল সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অসুস্থ ও অসচ্ছল সাংবাদিকদের মধ্যে অনুদান বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে ১১৩ জন অসুস্থ ও অসচ্ছল সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হাতে অনুদানের চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু এটাকে বালখিল্যভাবে ব্যবহার করা উচিত নয় এবং সবারই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। দেশের জন্য কল্যাণজনক হবে, এমন ভূমিকাই গণমাধ্যমের পালন করা উচিত। তিনি বলেন, আমার পক্ষে-বিপক্ষে মিডিয়ায় কে কী লিখল, না লিখল তা নিয়ে আমি চিন্তা করি না। আমি চিন্তা করি, আমি যে কাজটা করছি, সেখানে নিজের আত্মবিশ্বাসটা আছে কিনা, সঠিক করছি কিনা। নিজের আত্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেই আমি চলি।

জাতির পিতা সাংবাদিকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতা ভালো। তবে, এখানে একটা কথা আছে স্বাধীনতা ভালো তবে তা বালকের জন্য নয়। কাজেই এ ধরনের বালখিল্য ব্যবহার যেন কেউ না করে সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, অন্তত গঠনমূলক দায়িত্বশীল ভূমিকাটা পালন করা যেটা দেশের কল্যাণের কাজে লাগবে। তিনি বলেন, ২০০৮-এর নির্বাচনে দিন বদলের যে অঙ্গীকার করেছিলাম, আমি মনে করি, নিশ্চয়ই আপনারা এটা স্বীকার করবেন আজকে মানুষের দিন বদল হয়েছে। বাংলাদেশকে দেখার, জানার জন্য জীবনে যতরকম ঝুঁকি নেওয়ার নিয়েছি এবং সুযোগ পেলে কীভাবে করব, সেই পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছি বলেই আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, আজকে আমরা মহাকাশও জয় করেছি, সমুদ্র সীমানা ঠিক করেছি আবার স্থল সীমানা চুক্তির বাস্তবায়ন করেছি। যা-ই করেছি তার শুরুটা করে দিয়ে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, তথ্য প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ, তথ্য সচিব মো. আবদুল মালেক, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মহাপরিচালক শাহ আলমগীর, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মোল্লা জালাল, মহাসচিব শাবান মাহমুদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি (ডিইউজে) আবু জাফর সূর্য এবং সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী বক্তব্য দেন।

অন্য পেশাজীবীদের মতো সাংবাদিক কল্যাণকে তাঁর সরকার অগ্রাধিকার দেয় উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, সাংবাদিকদের কল্যাণে তাঁর সরকার ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ স্থাপন করে এর আওতায় অসুস্থ, অসচ্ছল, আহত এবং নিহত সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অনুদান দিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে আরও ২০ কোটি টাকা অনুদান প্রদানের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আমরা এত দিচ্ছি, মিডিয়ার মালিকরা কেন দেবে না? আমাদের বলার পর মাত্র দুজন দিয়েছেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু (ইত্তেফাক) ও অঞ্জন চৌধুরী। সবার আগে টাকা নিয়ে আসেন মাছরাঙার অঞ্জন চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সরকার সম্প্রচার নীতিমালা করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে অনলাইন সংবাদপত্রেরও বিকাশ ঘটছে। তবে ভয়ঙ্কর অপপ্রচার ও গুজবও অনলাইনে প্রচারিত হয়। এ জন্য একটি অনলাইন নীতিমালা করছে তাঁর সরকার।

‘বঙ্গবন্ধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছিলেন’ এমন অপপ্রচারের জবাব দেন শেখ হাসিনা। বলেন, পত্রিকা চালানোর মতো অনেকের ক্ষমতাই ছিল না। তাছাড়া স্বাধীনতা বিরোধীরা তখন সক্রিয় ছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে তখন যে ভয়াবহ অবস্থা ছিল সেটা তুলে ধরত না। নিজেকে সাংবাদিক পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আপনাদের বাইরের কেউ নই। আমাকেও আপনাদের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গণ্য করবেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে সবসময় সম্পর্ক ছিল। এটা হয়েছে জাতির পিতার কারণে। তিনি ইত্তেহাদ, মিল্লাত, ইত্তেফাক এসব পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ইত্তেফাক নিজে বিক্রি করেছেন। সাংবাদিকতায় তিনি কাজ করেছেন। তাঁর আত্মজীবনীতে লেখা আছে, তিনি সংবাদপত্রের লোক ছিলেন। এ হিসেবে আপনারা আমাকেও আপনাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করবেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সংবাদপত্রকে অনেকে বলেন সমাজের দর্পণ। এখন যোগ হয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। আমরা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে টেলিভিশন উন্মুক্ত করে দিই। এর উদ্দেশ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা। আমরা সংবাদপত্র খাতও উন্মুক্ত করে দিয়েছি। সাংবাদিকদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে নিয়মিত প্রেস ক্লাবে যেতাম। আড্ডা দিতাম, চা-পুরি, শিঙ্গাড়া খেতাম।

প্রতিদিন পত্রিকা পাঠে নিজের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সকালে এক কাপ চা ও একটি পত্রিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ! টেলিভিশন বন্ধ রেখে সকালে পত্রিকা নিয়ে বসি। সব পত্রিকা যে পক্ষে লেখে তা নয়। প্রয়োজনীয় সংবাদগুলো মার্ক করি। সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নিতে বলি। সংবাদপত্র থেকে অনেক তথ্য পাই। দুর্গম জায়গার অনেক তথ্যও সংবাদপত্রে আসে। তাতে আমরা সহযোগিতা পাই। এ জন্য সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী একটু মজা করে বলেন, অনুদান যারা পাচ্ছেন গোপালগঞ্জের তো কেউ নেই, সব দেখি কুষ্টিয়ার (তথ্যমন্ত্রীর এলাকা)। তবে আমি একদিক দিয়ে খুশি, কারণ গোপালগঞ্জে কোনো অসচ্ছল নেই। আমি চাই সবাই সচ্ছল হয়ে যাক।

সাংবাদিকদের আবাসন সমস্যা সমাধানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যাম ফ্ল্যাট যখন করা হয় তখন বলেছিলাম সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের জন্যও বরাদ্দ থাকবে। কিন্তু আমরা আর আসতে পারিনি। এখন কিছু ফ্ল্যাট হচ্ছে, যা ভাড়া দিয়েই মূল্য পরিশোধ করা যাবে। এ ছাড়া প্লট যখন দেওয়া হয় তখন অনেকেই পেয়েছেন। তবে এখন মনে হচ্ছে প্লট না দিয়ে ফ্ল্যাট করে দিলে অনেককে দিতে পারতাম।

কারও মান-অভিমান ভাঙানোর ইচ্ছা আর নেই

এদিকে গতকাল জাতীয় সংসদে বক্তব্যে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিদ্যমান রাজনৈতিক দূরত্ব কমাতে বা ‘রাজনৈতিক মান-অভিমান’ ভাঙাতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এটা হচ্ছে নীতির প্রশ্ন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আইনের প্রশ্ন। এখানে কে মান-অভিমান করল, কার মান ভাঙাতে হবে তা জানা নেই। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাম উল্লেখ না করে তিনি আরও বলেন, সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে যদি অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয়, সেখানে যাওয়ার আর কোনো ইচ্ছা আমার নেই।

গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির এমপি ফখরুল ইমামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ফখরুল ইমাম প্রশ্ন করতে দাঁড়িয়ে বলেন, যে পলিটিক্যাল অভিমান চলছে, তা কোনোক্রমে রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে কম নয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা কোনো মান-অভিমানের প্রশ্ন নয়, এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন ও আইনের প্রশ্ন। কেউ যদি অন্যায় করে কেউ যদি অর্থ আত্মসাৎ করে, কেউ যদি খুন করে, কেউ যদি খুনের প্রচেষ্টা করে, গ্রেনেড মারে, বোমা মারে, তবে তার বিচার হবে, এটাই হবে স্বাভাবিক। রাজনীতি সবাই করেন যার যার নিজের আদর্শ নিয়ে। আর দেশটা সবার, এমন নয় যে দেশটা কেবল আমাদের। দেশের প্রতি, দেশের জনগণের প্রতি যারা রাজনীতি করেন, তাদের একটা দায়িত্ব থাকতে হবে এবং সেই দায়িত্ববোধ থেকে সবাই স্ব স্ব কর্মপন্থা ঠিক করবেন এটাই হলো বাস্তব। আমরা রাজনীতি করি আমাদের নিজেদের স্বার্থে নয়, নিজেদের লাভ-লোকসান দেখে নয়। সে বিচার ও হিসাবও করি না। হিসাব করি জনগণের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কতটুকু দিতে পারলাম। জীবনমান কতটুকু উন্নত হলো, এটাই আমরা দেখি, আর সেভাবেই আমরা পরিকল্পনা করি এবং তা বাস্তবায়ন করি। দেশের মানুষকে ভালোবেসে, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করি বলেই কিন্তু আজকে এত অল্প সময়ে এত উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। তা ছাড়া তো করা সম্ভব নয়। অতীতে তো অনেক সরকার ছিল, এত অল্প সময়ে এতটা উন্নয়ন কোনো সরকার করতে পেরেছে? কেন পারেনি? কেননা, সেখানে ব্যক্তিস্বার্থটাই দেশের ও জনগণের স্বার্থ থেকে বেশি বড় ছিল। আমার ক্ষেত্রে হচ্ছে দেশের স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ, গোষ্ঠীর স্বার্থ সবচেয়ে বড়, ব্যক্তিস্বার্থ নয়। ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ করি না। আর সে কারণেই দেশটাকে উন্নত করতে পারছি, গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত উন্নয়ন করতে পেরেছি সেটাই বড়। তাই কারও মান-অভিমান ভাঙাতে যাব সেটা আমি চাই না। সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে যদি অপমানিত হতে হয়, সেখানে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আর আমার নেই।

উসকানিমূলক পোস্ট শনাক্তে সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল : মো. মামুনুর রশীদ কিরণের (নোয়াখালী-৩) প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিমূলক বা উসকানিমূলক পোস্ট, ভিডিও প্রচারকারীকে শনাক্ত করার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার জন্য সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল গঠনসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।

জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে : বজলুল হক হারুনের (ঝালকাঠি-১) প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে ও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।


আপনার মন্তব্য