শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৫২

পিছনে ফেলে আসি

শওকত আলী স্যার

ইমদাদুল হক মিলন

শওকত আলী স্যার

আমাদের শওকত আলী স্যারই যে লেখক শওকত আলী আমি তা জানতামই না। জগন্নাথে ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। কালোমতন অতি সাধারণ একজন শিক্ষক আমাদের বাংলা পড়ান। পড়ান খুব ভালো। আমি তাঁর ক্লাস মিস করতাম না। মজিবুল হক কবীর, হেলাল ওরা বাংলা অনার্সে ভর্তি হলো। আমার সিনিয়র ছিল কিন্তু গভীর বন্ধুত্ব। স্যার আর একসময় ইন্টারমিডিয়েটের ক্লাস নিচ্ছিলেন না। শুধু অনার্সে পড়াতেন। ততদিনে আমি জেনে গেছি বাংলার যে শিক্ষকটিকে আমি অতি সাধারণ মনে করেছিলাম তিনি আসলে একজন অসাধারণ। চেহারা পোশাক-আশাক দেখে তাঁকে বিচার করা যাবে না। তিনি কী, কবীর এবং হেলাল একদিন আমাকে তা বুঝিয়ে দিল। বিচিত্রায় ঈদসংখ্যায় এ সময় প্রকাশিত হলো স্যারের ‘যাত্রা’ নামের একটি উপন্যাস। ২৫ মার্চের পর ঢাকা থেকে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সবাই ছুটছে প্রাণ বাঁচানোর আশায়। তাদের এই যাত্রা নিয়ে লেখা উপন্যাস। পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। হেলাল আর কবীর বুঝিয়ে দিল এই হচ্ছেন শওকত আলী স্যার। তারপর যেখানে স্যারের যে লেখা পাই গোগ্রাসে পড়ি। ‘উন্মুল বাসনা’ বইটা পড়লাম। স্যারের একেবারে প্রথমদিকবার লেখা গল্পের বই। গল্পগুলো খুব ভালো লাগল। তারপর খুঁজে বের করলাম তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পিঙ্গল আকাশ’। পড়ি আর শওকত আলীকে আবিষ্কার করি। দিনাজপুরের লোক। ওই অঞ্চলের চাষিদের কথা লেখেন তিনি। জোতদারদের কথা লেখেন। প্রান্তিক মানুষ তাঁর লেখার বিষয়, একেবারেই অন্য জাতের লেখক। আমি একটু একটু লিখতে শুরু করেছি। হেলাল কবীররা স্যারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। খুবই স্নেহশীল মানুষ। সুন্দর করে কথা বলেন। পড়াশোনা বিস্তর। ধীরে ধীরে এমন একটা অবস্থা হলো, হেলাল কবীররা মাঝে মাঝে আমাকে স্যারের বাসায় নিয়ে যায়। সাহিত্যের নানারকম বিষয় নিয়ে স্যার আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। বিচিত্রার প্রত্যেক ঈদসংখ্যায় তাঁর বড় বড় উপন্যাস ছাপা হচ্ছে। ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’, ‘কুলায় কালস্রোত’- এই তিনটি উপন্যাস আসলে একসূত্রে গাঁথা। ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতি এবং সেই সময়কার মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন উপন্যাস তিনটির বিষয়। কী যে আগ্রহ নিয়ে লেখাগুলো পড়লাম! ততদিনে লেখালেখির জগতে তরুণ লেখক হিসেবে আমার একটা পরিচিতি হয়েছে। বিচিত্রা হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা। মাঝে মাঝে যাই সেখানে। দৈনিক বাংলার তিন তলায় বিচিত্রা অফিস। সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী। মুক্তিযোদ্ধা এবং শিল্পী। তার একটা বিচিত্র অভ্যাস ছিল। গল্প করতেন আর কাগজ ছিঁড়তেন। শওকত আলী স্যারের লেখার খুবই ভক্ত। দুয়েকদিন স্যারকে তার টেবিলেও পেয়েছি। সেই সময় বিচিত্রার ঈদসংখ্যার প্রধান আকর্ষণই ছিল শওকত আলী স্যারের উপন্যাস।

আমার প্রথম গল্পের বইয়ের নাম ‘ভালোবাসার গল্প’। খুবই সরল আঙ্গিকে লেখা সেই সময়কার তরুণ-তরুণীর প্রেম-ভালোবাসার গল্প। এই বই স্যারকে দেওয়ার সাহসই পেলাম না। দ্বিতীয় বই ‘নিরন্নের কাল’। জার্মানি থেকে ফিরে এসে বিরাশি সালের শুরুর দিকে ‘নিরন্নের কাল’ বইটা নিয়ে গেলাম স্যারের কাছে। স্যার তেমন কিছু বললেন না। কয়েকদিন পর কবীরকে দিয়ে খবর পাঠালেন, আমি যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। গেলাম। বুকটা কাঁপ ছিল। লেখালেখি নিয়ে স্যার কী ধমক-টমকই দেন কিনা। ঘটল ঠিক তার উল্টো ঘটনা। ‘নিরন্নের কাল’ গল্পটি নিয়ে তিনি যে প্রশংসা করলেন সেটা লিখলে অনেক পাঠক বিশ্বাসই করবেন না। শেষ পর্যন্ত বললেন, মন দিয়ে লেখালেখিটা করো। শওকত আলী স্যার তখন একের পর এক লিখছেন। ‘ওয়ারিস’, ‘দলিল’, ‘উত্তরের ক্ষেপ’ একের পর এক অসামান্য সব উপন্যাস। দু-দুবার ফিলিপ্স সাহিত্য পুরস্কার পেলেন। বিচিত্রার এক ঈদসংখ্যায় স্যারের পাশাপাশি ছাপা হলো আমার উপন্যাস ‘বাঁকাজল’। পড়ে সেই নিরন্নের কালের মতোই প্রশংসা করলেন স্যার। ‘বাঁকাজল’ বইটি আমি স্যারকে উৎসর্গ করেছিলাম। বিচিত্রা শওকত আলী স্যারকে নিয়ে কভার স্টোরি করল। প্রচ্ছদে স্যারের ছবি, ভিতরে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের অনেক তরুণ প্রবীণ লেখকের নাম করলেন তিনি। যাদের লেখা তিনি পছন্দ করেন বা যাদেরকে তিনি সম্ভাবনাময় লেখক মনে করেন। ছিয়াশি-সাতাশি সালের কথা। শুধু দুজন লেখকের নাম তিনি সেই সাক্ষাৎকারে নিলেন না। একজন হুমায়ূন আহমেদ আরেকজন ইমদাদুল হক মিলন। আমরা দুজনেই একটু মন খারাপ করলাম। ফেব্রুয়ারি বইমেলায় হুমায়ূন ভাই আর আমি হাঁটছি, স্যারের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। আমাদের দেখে স্যার একটু বিব্রত হলেন। আমাদের নাম না নেওয়ার ব্যাপারটি তাঁর নিশ্চয়ই মনে আছে। ব্যাপারটা কাটানোর জন্য আমাদের দিকে তাকিয়ে অন্য কোনো কথা না বলে সরাসরি বললেন, বিচিত্রায় তোমাদের কথা বলিনি কেন জানো, তোমরা তো লেখক হয়েই গেছ। তোমাদের আর নাম বলার কী আছে? আমি মাথা নিচু করে রইলাম। কিন্তু হুমায়ূন ভাই ঠোঁটকাটা লোক আর তাঁর বিনয়মিশ্রিত কঠিন কথা বলার স্বভাব আছে। হাসিমুখে স্যারকে বললেন, না না স্যার, আমি আর মিলন ওটা ভাবিইনি। আপনিও যে লেখক হয়েছেন তাতেই আমরা খুশি। স্যার খুব মন খারাপ করেছিলেন।

এই ঘটনার বহু বছর পর, ২০১৫ সালে অন্যদিন এক্সিম ব্যাংক হুমায়ূন আহমেদ পুরস্কার পেলেন শওকত আলী স্যার। তাঁর তখন শরীরটা খারাপ। তবু কষ্ট করে এসেছেন বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে। সামনের সারিতে বসে আছেন। আমি গিয়ে হাঁটু ভেঙে তাঁর সামনে বসলাম। স্যার, কেমন আছেন? খুবই অভিমানী গলায় বললেন, আমার খবর তোমার আর নেওয়ার দরকার কী? বেঁচে আছি না মরে গেছি খবরটাই তো নাও না। এত অসুস্থ থাকলাম, একদিন দেখতেও এলে না। খুবই অপরাধ বোধ করলাম। স্যারকে দেখতে যাব যাব করে আর যাওয়াই হলো না। একদিন তিনি চলেই গেলেন।

স্যারের ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসটি বেরোবার পরপরই পড়েছিলাম। পড়ে শুধু মুগ্ধ না, বিস্মিত হয়ে ছিলাম। ইতিহাসের যে সময়কালকে তিনি এই উপন্যাসে ধারণ করেছেন, উপন্যাসের ভাষাটিও সেই সময়কার উপযোগী হিসেবে তৈরি করে নিয়েছেন। স্যারের মৃত্যুর পর উপন্যাসটি দ্বিতীয়বার পড়ে মনে হলো এই উপন্যাসটির কোনো তুলনা বাংলা সাহিত্যে নেই। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ এর মতো উপন্যাস শুধু আমার স্যার শওকত আলীর পক্ষেই লেখা সম্ভব।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর