শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:১৯

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে অভিযোগের পাহাড়

অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে, জনপ্রিয়দের প্রার্থী করা হবে : কাদের

রফিকুল ইসলাম রনি

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে অভিযোগের পাহাড়

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের পাঠানো প্রার্থী তালিকা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ পড়েছে কেন্দ্রে। গত দুই দিনে দুই শতাধিক অভিযোগ দলীয় সভানেত্রীর ধানমন্ডি কার্যালয়ে জমা পড়েছে। তৃণমূল নেতাদের লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে প্রার্থী তালিকায় এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনপ্রীতি, জেলা নেতাদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং খামখেয়ালিপনার সিদ্ধান্ত। এতে বাদ পড়েছেন মাঠের জনপ্রিয়, সৎ ও দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ প্রার্থীরা। এমপি-মন্ত্রী ও জেলা নেতাদের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়েছেন বর্তমানে দায়িত্বরত প্রায় অর্ধশত উপজেলা চেয়ারম্যান। তালিকায় স্থান পেয়েছেন এমপি-মন্ত্রীদের স্বজন, ফ্রিডম পার্টি ও হাইব্রিড নেতারা।

তৃণমূল থেকে আসা এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সকালে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘যে-কেউ অভিযোগ করতেই পারে। অভিযোগের সত্যতা খুঁজে দেখা হবে। আমরা যাচাই-বাছাই করেই দলীয় মনোনয়ন দেব। শুধু তৃণমূলের নাম থাকলেই চলবে না, দলীয় ও বিভিন্ন সংস্থার জরিপ প্রতিবেদনে জনপ্রিয় হলেই তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। এখানে যোগ্যরাই মূল্যায়িত হবেন। জনপ্রিয়দের প্রার্থী করা হবে।’

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রাসেল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি গাজীপুর-১ আসনে এমপি পদে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। এমপি পদে প্রার্থী হওয়ার আক্রোশে মাঠের জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির ভাতিজার নাম একক প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। জেলা সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক বর্তমান এ আসনের এমপি। এ প্রসঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রাসেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নিয়ম নীতি না থাকলেও জেলা সভাপতি নিজের বাসায় বৈঠক করে তার ভাতিজা মুরাদ কবিরকে দলীয় প্রার্থী করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। এতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির কোনো মতামত তিনি গ্রহণ করেননি। আমার দোষ আমি একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘নেত্রীর নিজস্ব জরিপ, বিভিন্ন সংস্থার জরিপ দেখে মনোনয়ন দিলে আমিই দলীয় প্রতীক পাব ইনশা আল্লাহ।’ এ প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় জেলা সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। রাজবাড়ী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রার্থী তালিকায় এক নম্বরে নাম দেওয়া হয়েছে সদর আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী কেরামত আলীর ভাইয়ের ‘কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত’ শফিকুল ইসলামকে। শফিকুল ইসলাম বর্তমানে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও একসময় ফ্রিডম পার্টি করতেন বলে অভিযোগ আছে। দ্বিতীয় স্থানে রাখা হয়েছে জেলার সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রীর পছন্দের লোক নওয়াব আলীকে। যদিও নওয়াব আলী দীর্ঘদিন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তৃতীয় নম্বরে রাখা হয়েছে তিনবারের উপজেলা চেয়ারম্যান এমদাদুল হক বিশ্বাসকে। আর একক ভাইস চেয়ারম্যান পদে নাম পাঠানো হয়েছে একসময় শিবিরের দাপুটে নেতা জহুরুল হককে, যিনি এক থেকে দেড় বছর আগেও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় কোনো ধরনের বর্ধিত সভা বা ভোটের ব্যবস্থা না করেই প্রার্থী তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে বলে ১৮৭ জনের স্বাক্ষরিত দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন দলের যোগ্য প্রার্থীরা। বাদ পড়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমান। এ প্রসঙ্গে আশরাফুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘উপজেলা আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের বর্ধিত সভা না ডেকেই খামখেয়ালিপনার মাধ্যমে প্রার্থী তালিকা করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।’ একইভাবে পিরোজপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান খালেকের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়নি। জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যৌথভাবে কেন্দ্রে নাম পাঠানোর নিয়ম থাকলেও সাধারণ সম্পাদক এককভাবে কেন্দ্রে নাম পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে জেলা সভাপতি পৃথকভাবে ওই চেয়ারম্যানের নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মজিবুর রহমান খালেকের স্ত্রী সালমা রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার স্বামী বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান। তৃণমূলে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও জেলার সভাপতিকে পাশ কাটিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাধারণ সম্পাদক এককভাবে কেন্দ্রে নাম পাঠিয়েছেন। আমরা দলীয় সভানেত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দিন কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগে বলেছেন, ‘তৃণমূলে ভোট গ্রহণের নিয়ম থাকলেও কোনো ধরনের ভোট ছাড়াই প্রার্থীর নাম পাঠানো হয়েছে। তৃণমূলে আমার জনপ্রিয়তা থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রোশে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি এরশাদের আমলে দুবার, এক-এগারোর সময় একবার জেল হাজতে ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলায় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তানভীর ইসলাম। ছাত্রলীগের টানা দুই কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক এই নেতা কয়েক বছর ধরেই উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অথচ তৃণমূল থেকে নাম পাঠানোর সময় তানভীরের নামই কেন্দ্রে পাঠানো চাননি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। শেষে জেলা আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের চাপে মোট তিনজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠান তিনি। এ তালিকায় এক নম্বরে রাখা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর প্রার্থী হিসেবে পরিচিত ইশারত আলীকে। তিনি এর আগে ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। এক-এগারো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলের বিরুদ্ধে কাজ করায় তাকে বহিষ্কার করা হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইশারত আলীর আপন ছোট ভাই আবু হানিফ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে তার ভাইয়ের পক্ষে ধানের শীষে ভোট চান ইশারত আলী। এখন তাকেই উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নৌকা মার্কা দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন স্থানীয় এমপি। এমপি নাখোশ হবেন বলে তালিকায় নাম থাকা অন্য দুজন চেয়ারম্যান প্রার্থী এ বিষয়ে কেন্দ্রে অভিযোগও করেননি। তারা এখন কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় চেয়ে আছেন। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন চান সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম। উপজেলা থেকে একক নাম পাঠানো হয়েছে। তিনি মনোনয়নপত্র উত্তোলনের জন্য দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপের কাছে আবেদন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘তৃণমূলে ভোটে আমি দ্বিতীয় হয়েছি। এক রাজনৈতিক নেতার হস্তক্ষেপের কারণেই এটা হয়েছে। অন্যথায় আমিই প্রথম হতাম। এর পরও তিনজনের নাম পাঠানো হয়নি। শুধু এককভাবে নাম পাঠানো হয়েছে।’ নীলফামারী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিটলার চৌধুরী ভুলু লিখিত অভিযোগে বলেছেন, বর্ধিত সভা ডেকে তিনজনের নাম পাঠানোর কথা থাকলেও তা না করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ভুয়া রেজুলেশন দেখিয়ে কেন্দ্রে তিনজনের নাম প্রস্তাব করেছেন। পরে সৈয়দপুর আওয়ামী লীগ উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাকে দলীয় মনোনয়ন দিতে কেন্দ্রে প্রত্যয়নপত্র পাঠিয়েছেন। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় প্রার্থী বাছাইয়ে অনিয়মের অভিযোগ জানিয়েছেন শাহ মাহাবুব মোকশেদ কাঞ্চন ও খায়রুল কবির খোকন নামে দুই আওয়ামী লীগ নেতা। তারা লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, সবার মতামত উপেক্ষা করে একজন ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একজন দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত ব্যক্তির নাম এককভাবে জেলায় পাঠানো হয়েছে।


আপনার মন্তব্য