শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মার্চ, ২০১৯ ২৩:০২

ফের আন্দোলনে অচল ঢাকা

সড়কে সড়কে অবস্থান, সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি স্থগিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফের আন্দোলনে অচল ঢাকা
শিক্ষার্থীরা গতকালও রাজপথে নামে। দাবি জানায় বিচারের। রাজধানীর প্রগতি সরণি থেকে তোলা ছবি -রোহেত রাজীব

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গতকাল দিনভর প্রায় অচল ছিল রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সকাল ৯টা থেকে বেলা ৪টা পর্যন্ত শাহবাগ, ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার, ভাটারাসহ অন্তত ১২টি স্পট শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-অবরোধে উত্তাল ছিল। পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম আট দফা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।

জানা গেছে, বেলা ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত নগরভবনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, মেজর জেনারেল ইমদাদ উল বারীর উপস্থিতিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবি এক সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের একপক্ষ ঘরে ফিরতে সম্মত হয়। তবে অন্য পক্ষ আজও সড়কে অবস্থান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বসুন্ধরায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে নর্দা এলাকায় সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন বিইউপির ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। এ ঘটনার পর রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। তারা সেখানে সড়ক অবরোধ করে রাখেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিচার দাবি করে তারা গতকাল সকাল থেকে ঘটনাস্থলে ফের অবস্থান নেন।

এদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ১০টা থেকে প্রগতি সরণির নর্দা এলাকায় অবস্থান নেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউবিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকশ শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে অবস্থান করেন। তারা বলছিলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত দাবিগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না।

বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ও বিইউপির উপাচার্য  মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী। এ সময় তারা দুর্ঘটনাস্থলে আবরারের নামে একটি পদচারী সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। তারা প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। যেভাবেই  হোক সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানান। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, আশ্বাসে আস্থা নেই তাদের।

মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা যে আট দফা দাবি দিয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক। এসব দাবির সঙ্গে আমরাও একমত। তারা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব দাবি বাস্তবায়নের শর্তে আন্দোলন স্থগিত করতে রাজি হয়েছে। আমরা এই সময়ের মধ্যে তাদের সব দাবি বাস্তবায়নের যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

এ সময় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, সুপ্রভাত বাসের রেজিস্ট্র্রেশন তাৎক্ষণিক বাতিল করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা রুজু করা হয়েছে, ড্রাইভারকে আটক করা হয়েছে। এই ড্রাইভারের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর সম্পন্ন করার জন্য সব ব্যবস্থা আমরা নেব। এই অপরাধে উপযুক্ত শাস্তি বিধান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী গতকাল আমাকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন যে কোনো মূল্যে রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে এবং রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি থাকলে তা স্ক্রাব করে দিতে। দু-একদিনের মধ্যে আপনারা এটি দৃশ্যমান দেখতে পাবেন।

এদিকে মেয়রের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলে থাকা বিইউপি শিক্ষার্থী ফয়সাল এনায়েত সাংবাদিকদের বলেন, আমরা শিক্ষার্থী, উপাচার্যসহ ডিএমপি কমিশনার ও মেয়রের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছি। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আটটি দাবির মধ্যে তিনটি দাবির কথা পুনরায় তুলে ধরছি। ফয়সাল বলেন, এর মধ্যে যে মামলা হয়েছে, সেই মামলার চার্জশিট যত দ্রুত সম্ভব দিতে হবে, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে এ চার্জশিট দিতে হবে। জবাবে কমিশনার বলেছেন, তার আগে যদি সম্ভব হয়, তাহলে আগেই দেওয়া হবে। চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিইউপির এই শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনের সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টরা কী পরিকল্পনা নিলেন, তা আগামী সাত দিনের মধ্যে ঠিক করতে হবে। সুপ্রভাত পরিবহনের যে বাসটির রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে, তা স্থায়ী কার্যকর করতে হবে।

সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করা অবস্থায় কিছু শিক্ষার্থীকে বাংলামোটর এলাকায় গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও চালকের কাগজপত্র চেক করতেও দেখা গেছে। শাহবাগ-ফার্মগেট এলাকায়ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তেজগাঁওয়ে আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সকাল সাড়ে ১০টায় বিক্ষোভ করেন ছাত্রছাত্রীরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ও ঘাতক বাস ড্রাইভারের শাস্তির দাবিতে তাদের এ আন্দোলন কর্মসূচি চলে দুপুর পর্যন্ত। এ ছাড়া শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১ এবং ২ নম্বরের বিভিন্ন পয়েন্টে রাস্তা অবরোধ করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ করেন  ছাত্রছাত্রীরা। রোকেয়া সরণিতে গ্রিন ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা রাস্তা অবরোধ করে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দেন। ধানমন্ডির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে সকাল থেকেই সোচ্চার ছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা। ধানমন্ডি ২৭ এর সামনে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। সহস্রাধিক শিক্ষার্থী রাস্তায় নামলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে বাসচালকের শাস্তি, নতুন বাসচালকরা যেন যথাযথ নিয়মে ড্রাইভিং লাইসেন্স পান, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবহার, জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন, প্রগতি সরণির সামনে পদচারী-সেতু স্থাপন।

শিক্ষার্থীদের পাশে ডাকসু ভিপি এজিএস :  নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর এবং  এজিএস ও ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। গতকাল বেলা ১২টার দিকে ভিপি নুর এবং এজিএস সাদ্দাম বিকাল ৪টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে কথা বলেন।


আপনার মন্তব্য