শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:০৯

তিতাসের ২২ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক

বছরে লুটপাট কয়েকশ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

তিতাসের ২২ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের দুর্নীতির ২২টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর এসব উৎসের কারণে দুর্নীতির মাধ্যমে বছরে লুটপাট হয় কয়েকশ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় অবৈধ গ্যাস সংযোগে। গতকাল প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হাতে তুলে দেন দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোজাম্মেল হক খান। সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশ করেছে দুদক। প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দুদকের এ কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, দুদকের এ প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে শূন্যসহিষ্ণুতা নীতি ঘোষণা করেছেন, এ মন্ত্রণালয়ে তা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হবে।

দুর্নীতির উৎসগুলো হলো : অবৈধ সংযোগ, নতুন সংযোগে অনীহা এবং অবৈধ সংযোগ বৈধ না করা, অবৈধ লাইনে পুনঃসংযোগ, অবৈধ সংযোগ বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া, অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ, গ্যাস সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা, একই কর্মকর্তার একাধিক দায়িত্ব পালন, বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ প্রদান, মিটার টেম্পারিং, অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটরে গ্যাস সংযোগ, বৈধ সংযোগ দিতে হয়রানি, মিটার বাইপাস করে সংযোগ প্রদান সংক্রান্ত দুর্নীতি, ইচ্ছাকৃতভাবে গৃহস্থালিতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে ওই সময়ে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে বাইপাস করে গ্যাস সরবরাহ, অনুমোদনের কম/বেশি গ্যাস সরবরাহের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ইভিসি (ইলেকট্রনিক ভলিউম কারেক্টর) না বসানো, অর্থ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিল্প এলাকায় পোস্টিং বজায় রেখে সিন্ডিকেট গড়ে দুর্নীতি, এস্টিমেশন অপেক্ষা গ্যাস কম সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো এবং ওই গ্যাস অবৈধভাবে অন্যত্র দেওয়া, অবৈধ চুলাপ্রতি বৈধ চুলার সমান টাকা আদায় করে আত্মসাৎ, গ্যাস বিক্রি বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে বণ্টনের নামে আত্মসাৎ, ভুয়া গ্রাহক সংকেত দেখিয়ে অবৈধ গ্রাহক থেকে বিল আদায়, আঞ্চলিক ব্যাংক হিসাব থেকে কোম্পানির মাদার অ্যাকাউন্টে যথাসময়ে টাকা স্থানান্তর না করা, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বিল আদায় না করা, দরপত্রে অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, মালামাল ক্রয়ে দুর্নীতি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্তৃক সার্বক্ষণিক কোম্পানির গাড়ি ব্যবহার, জরিমানা, সংশোধিত বিল ও জামানত আদায়ে গ্যাস বিপণন নীতিমালা অনুসরণ না করা ইত্যাদি। প্রতিবেদনে তিতাসে কয়েকশ কোটি টাকার দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়, অবৈধ গ্যাস সংযোগে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়। বিশেষ করে শিল্প কারখানায় অবৈধ সংযোগ দিয়ে বেশ লাভবান কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে শত কোটি টাকা বকেয়া থাকার পরও দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের সংযোগ বহাল রাখা হয়েছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশ : চুরি ও গ্যাসের অপচয় রোধকল্পে বিতরণ এবং গ্রাহক উভয় ক্ষেত্রে প্রি-পেইড মিটার চালু করা, মোবাইল কোর্টের আদলে আকস্মিক পরিদর্শন ও অবৈধ গ্রাহকের কাছ থেকে উচ্চ হারে জরিমানা আদায় করা, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরে নিয়মিত ফলোআপের ব্যবস্থা করা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিন শিল্প এলাকায় এবং একই বিভাগে পোস্টিং না রাখা, জনবলের দক্ষতা বাড়ানো, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করা, অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িতদের পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন না করা, অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা, সিস্টেম লসের সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ, নিজস্ব সার্ভিলেন্স এবং মোবাইল কোর্টের ব্যবস্থা, অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শক্তিশালী প্রসিকিউশন ব্যবস্থা রাখা ও কোম্পানির ৪০০ কোটি টাকার ওপরে বকেয়া পাওনা আদায়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, দুদক ২৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অনিয়মের উৎস চিহ্নিত করতে ২০১৭ সাল থেকে ২৫টি টিম গঠন করে কাজ করছে। এসব টিম অনুসন্ধান চালিয়ে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে। তিতাস গ্যাস-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম তাদের অনুসন্ধানকালে তিতাস গ্যাস কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে যারা সম্যক ধারণা রাখেন তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করে। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক টিমের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে পাঠায় দুদক। ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য খাত, বাংলাদেশ বিমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং হিসাবরক্ষণ অফিসসমূহের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ তিতাসের প্রতিবেদন উপস্থাপন করে দুদক।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর