শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৯ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ জুন, ২০১৯ ২২:৫২

গতি নেই চলে না রেল

বুড়ো ইঞ্জিন, ভাঙাচোরা বগি-ওয়াগন, রেললাইনে জোড়াতালি, জরাজীর্ণ সেতু, সমস্যার শেষ নেই

সাইদুর রহমান রিমন ও সাইদুল ইসলাম

গতি নেই চলে না রেল

মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও বগি নিয়েই চলছে বিপজ্জনক ট্রেনযাত্রা। এ ছাড়া প্রায় অর্ধেক পণ্যবাহী ওয়াগন ও রিলিফ ট্রেনের মেয়াদও শেষ অনেক আগেই। রেলপথগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। লাইনে পর্যাপ্ত পাথর থাকার কথা থাকলেও তা নেই। পাথরের পরিবর্তে ফেলে রাখা হয়েছে নানারকম আবর্জনা। অনেক স্থানে খুলে নেওয়া হয়েছে রেল ক্লিপ। কোথাও কোথাও কাঠের স্লিপারগুলো উধাও হয়েছে। ভাঙাচোরা স্লিপারগুলোকে জোড়া দিয়ে রাখা আছে। দেশজুড়েই রেললাইনের অভিন্ন চিত্র বিরাজমান। এসব কারণেই রেল চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সেই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সম্প্রতি রেলওয়ের নিজস্ব এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও রেলওয়ের নানা অরাজকতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

যদিও বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের পরই রেলওয়ে খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে। তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসেও সরকার রেলে পর্যাপ্ত বরাদ্দ অব্যাহত রাখে। কিন্তু রেল প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের সমন্বয়হীনতা, প্রকৌশল বিভাগের অব্যবস্থাপনা, ১০০ থেকে ১৫০ বছরের পুরনো রেলসেতু, দীর্ঘ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, পাথরহীন রেলপথ, সংস্কারহীন পুরনো রেললাইনের কারণে রেলপথে ঝুঁকি ক্রমে চরম আকার ধারণ করেছে। তবে এসব জটিলতা নিরসনে নানামুখী প্রকল্প থাকলেও বাস্তবায়নে রেলওয়ে প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ আছে। সর্বশেষ ২৩ জুন ঢাকা-সিলেট রুটের উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন ৪৬ নম্বর নড়বড়ে রেলসেতু ভেঙে ছয়জন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনায় রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সংকট, ব্যর্থতা, প্রকৌশল বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে আসে। সংকট কাটাতে রেল প্রশাসন ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলেও এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে রেল খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও ইঞ্জিন কেনা হয়েছে মাত্র ৪৬টি। সিংহভাগ অর্থই ব্যয় করা হয়েছে ভবন ভেঙে নতুন স্টাইলের ভবন নির্মাণ ও স্টেশনগুলো রি-মডেলিং করার কাজে। অথচ এর বিপরীতে ইঞ্জিন-বগির সমস্যায় রেলই যে অচল হয়ে পড়ছে-  সেদিকে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) কাজী মো. রফিকুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রেলের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে ৩০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। এ মাস্টারপ্ল্যান নিয়েই রেলওয়ে কাজ করছে। আধুনিক ও উন্নতমানের রেল অবকাঠামো গড়তে ৫ লাখ কোটি টাকার ২৩০টি প্রকল্পও রয়েছে। ধারাবাহিকভাবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে রেলওয়ের দৃশ্যমান উন্নতির সুফল পাবে দেশের মানুষ। রেললাইন ও সেতুগুলো রেলওয়ের নিজস্ব রাজস্ব থেকে অর্থ ব্যয় করে দ্রুত মেরামত করা হবে।’

পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার (এডিজিএম) সরদার শাহাদাত আলী বলেন, ‘বর্তমান সরকার রেলওয়ের উন্নয়নে আন্তরিক। প্রয়োজনীয় প্রকল্পও দিচ্ছে। রেলমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রেলওয়ে দুর্ঘটনাসহ নানা কাজে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন।’

ইঞ্জিন সমস্যা : রেলের ৭০ শতাংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে সর্বমোট ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৫৪। এর মধ্যে নিয়মিত পাওয়া যায় ৯৮ থেকে ১০০টি। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলে ইঞ্জিন রয়েছে ১২৪টি। যদিও চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১০৫টি ইঞ্জিন। রেলের দুই অঞ্চলে সর্বমোট ২৭৮টি ইঞ্জিনের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের ৪০ ও পূর্বাঞ্চলে ৫০টি ইঞ্জিনের এখনো অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল রয়েছে। বাকি ইঞ্জিনগুলো প্রতিনিয়ত মেরামতের মাধ্যমে কোনোরকম খুঁড়িয়ে চলছে। প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ আমলে ট্রেন চলত বাষ্পীয় ইঞ্জিনে। ১৯৫৩ সালে রেলে প্রথম লোকোমোটিভ ইঞ্জিন যুক্ত হয়। এমইজি-১১ মডেলের আমেরিকান ইঞ্জিন রেলওয়ের লাইনে যুক্ত হয় ১৯৫৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর। ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও সেসব ইঞ্জিনের ৮টি এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে।

সেতু সমস্যা : রেলওয়ের মোট সেতু ৩ হাজার ৬২৯টি। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে সেতু রয়েছে ২ হাজার ৯৪ আর পশ্চিমাঞ্চলে ১ হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে ৩ হাজার ২০০ সেতুই মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব সেতুর ৭৪টি গুরুত্বপূর্ণ, ৪২৪টি মেজর ও ৩ হাজার ১৩১টি মাইনর। মূলত কালভার্টসহ সব শ্রেণির সেতুকে রেলওয়ে সেতু বলা হয়। রেলওয়ের অধিকাংশ সেতু ব্রিটিশ আমলে নির্মাণ করা হয়েছিল। নড়বড়ে, মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুর কারণে রেলওয়েতে নতুন লাইন নির্মাণ সত্ত্বেও ট্রেনের গতি কম থাকে। এতে বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলওয়ের গতিবেগ পাশের অনেক দেশের তুলনায় কম। অর্থাৎ এসব সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও নতুন সেতু নির্মিত হয়নি। এসব কারণে কয়েক বছর ধরে রেলের দুর্ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

কোচ সমস্যা : ২০১৭ সালের রেলওয়ে ইনফরমেশন বুকের তথ্যমতে, রেলওয়েতে কোচের সংখ্যা ১ হাজার ৪১০। এরই মধ্যে পুরনো শতাধিক কোচ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে দুই দফায় ১২০টি কোচ দেশে এসেছে। আরও ১৫০টি কোচের একটি প্রকল্প শেষ হবে আগামী বছরের মে মাসে। এসব কোচ দিয়ে রেলওয়ে বছরে প্রায় ৯ কোটির অধিক যাত্রী পরিবহন করে; যা সারা বিশে^ বিরল। তীব্র কোচ সংকট রয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির ট্রেনগুলোয়। দীর্ঘদিনের পুরনো কোচ দ্বারা জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন চলায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সময় রেললাইনে দুলতে থাকে ট্রেনগুলো; যা ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন রেল প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে রেল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে কোচ সংকটের কথা জানালেও সমস্যা সমাধানে মেরামতেই বেশি আগ্রহী।

পাথরহীন রেলপথ : নিরাপদ ট্রেন পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে পাথরের আধিক্য। পর্যাপ্ত পাথর থাকলে গতিবেগ বাড়লেও ট্রেনের ঝুঁকি কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রেলপথে পাথরের পরিমাণ কমে আসছে। যা ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রেল ট্র্যাকের আধুনিকায়নে নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো শর্তানুযায়ী পাথর ব্যবহার করে না।

নড়বড়ে ট্র্যাক : ১৯৭০ সালে রেলের ট্র্যাক বা সারা দেশে রেলপথের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার। পরে বিভিন্ন সরকারের সময় রেলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণে রেলপথের পরিমাণ কমে নেমে আসে ৩ হাজার ৯৭৩ কিলোমিটারে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে রেলপথ বেড়ে হয় ৩ হাজার ৯৭৭ কিলোমিটার। সর্বশেষ ২০১৭ সালে দেশের সর্বমোট রেলপথ হয়েছে ৪ হাজার ২৯২ কিলোমিটারে। বর্তমানে পূর্বাঞ্চলে সর্বমোট রেলপথ ২ হাজার ১৫২ কিলোমিটার ও পশ্চিমাঞ্চলে ২ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। তবে রেলপথ বাড়লেও দীর্ঘদিনের পুরনো লাইনগুলো ঠিকমতো সংস্কার না হওয়ায় রেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। পুরনো লাইনগুলো মেরামতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও স্লিপার, ফিশপ্লেটসহ বিভিন্ন উপকরণ নিম্নমানের ব্যবহার হওয়ায় দ্রুতগতির ট্রেন চলায় ব্যাঘাত ঘটছে প্রতিনিয়ত।

অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা : রেলওয়ে দুই অঞ্চলে ট্রেন পরিচালনায় একাধিক দফতর বা বিভাগ রয়েছে। কিন্তু বিভাগগুলোর মধ্যে নেই সমন্বয়। জটিলতা তৈরি হলে একটি বিভাগ অন্য বিভাগের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যা সমাধান করতে চায়। পরিবহন বিভাগ অধিকসংখ্যক ট্রেন ও কোচ সংযোজনে আগ্রহী হলেও যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ কোচ মেরামত ও ছাড়করণে অনীহা দেখায়। আবার বাণিজ্যিক বিভাগ আয় বৃদ্ধি ও নির্ধারিত সময়ে ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলে প্রকৌশল বিভাগ থেকে লাইনের সমস্যা দেখিয়ে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেয়। এসব সমস্যা সমাধানে অভ্যন্তরীণ মাসিক সমন্বয় সভা হলেও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। দীর্ঘদিন ধরে রেলের মাঠ পর্যায়ের কর্মী সংকট থাকলেও লোকবল নিয়োগে রেলের গাফিলতি এখন দৃশ্যমান।

গতি কমিয়ে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা : পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সেকশনে সর্বমোট ১৮টি গতি নিয়ন্ত্রণাদেশ রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সেতু বা কালভার্ট, নড়বড়ে রেললাইন ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে রেলের প্রকৌশল দফতর এসব সেকশনে সুনির্দিষ্ট গতি নিয়ন্ত্রণাদেশ দিয়েছে। সর্বশেষ ২৫ জুন পর্যন্ত রেলের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-আখাউড়া সেকশনে ৩টি, ঢাকা-আখাউড়া সেকশনে ২টি, আখাউড়া-সিলেট সেকশনে ৬টি, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে ২টি, ভৈরববাজার-ময়মনসিংহ সেকশনে ২টি, টঙ্গী-ময়মনসিংহ সেকশনে ৩টি, জামালপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব সেকশনে ২টি এবং জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ বাজার সেকশনে ১টি গতি নিয়ন্ত্রণাদেশ দেওয়া আছে। এসব নিয়ন্ত্রণাদেশের মধ্যে ৫টিতে ডেড স্পট (ট্রেন সম্পূর্ণ বন্ধ করে রেলের একটি বালাম খাতায় চালক স্বাক্ষর করে মাত্র ৫ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চালাতে হয়) দেওয়া আছে। সর্বশেষ দুর্ঘটনা হওয়া আখাউড়া-সিলেট সেকশনের ৪টি গতি নিয়ন্ত্রণাদেশের মধ্যে ২টিতেই রয়েছে ডেড স্পট। ভাটেরাবাজার-মাইজগাঁও ও কুলাউড়া-বরমচালে ডেড স্পট দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ হওয়ায় এই সেকশনের সেতু ও রেলপথ পার হতে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার গতি নিয়ন্ত্রাণদেশ দিয়েছে রেলের প্রকৌশল বিভাগ। পঞ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতেও একই পদ্ধতিতে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ দিয়ে ট্রেন চালানো হয় বলে স্বীকার করেছেন প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর