Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ জুলাই, ২০১৯ ২৩:৩২

ট্রাম্পের আলোচিত ১৫ মিনিট

বাংলাদেশ কোথায় জানেন না, প্রশ্ন নোবেল বিজয়ী ইরাকি নাদিয়া মুরাদকে নিয়েও, ব্যাপক বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

ট্রাম্পের আলোচিত ১৫ মিনিট
নোবেল বিজয়ী ইরাকি নারীকে ট্রাম্পের প্রশ্ন নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা -ভিডিও ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আলাপচারিতার সময় ছিল ১৫ মিনিট। ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া বিশ্বের ১৬টি দেশের ২৭ জন নাগরিক তুলে ধরেন বিভিন্ন অভিযোগ, নির্যাতিত হওয়ার বর্ণনা এবং সহযোগিতার প্রত্যাশা। ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশি নাগরিক প্রিয়া সাহার আজগুবি নালিশে এই ১৫ মিনিট নিয়ে দেশব্যাপী চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। গত বুধবার ওয়াশিংটন ডিসির ওভাল অফিসে এই ২৭ জনের সঙ্গে দেখা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনার শুরুতেই নিউজিল্যান্ডের এক নাগরিক বলেন, প্রেসিডেন্ট আপনাকে নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ। মানবতার এবং ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া মানুষের পাশে তাদের অধিকার আদায়ের জন্য দাঁড়িয়েছেন। ১৫ মার্চের ক্রাইস্টচার্চ ট্র্যাজেডিতে আপনার সহানুভূতি আমরা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করি। এ সময় ট্রাম্প বলেন, আমি জানি আপনারা ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন। আপনি ভাগ্যের জোরে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছেন। এখানে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ। এরপর পাকিস্তানি এক নাগরিক তার বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি পাকিস্তানে খ্রিস্টান সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করতে ট্রাম্পের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। তার প্রতিউত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আগামী সপ্তাহে আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।

ট্রাম্পের কথা শেষ হতেই বাংলাদেশি নাগরিক প্রিয়া সাহা বলেন, ‘স্যার, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এখানে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশেই থাকতে চাই।’ এ সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। ট্রাম্পের হাতে হাত রেখে তিনি বলেন, ‘এখনো সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশ ছাড়তে চাই না। সেখানে আমি আমার ঘরবাড়ি হারিয়েছি। তারা আমার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারা আমার জমিজমাও দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এর কোনো বিচার হয়নি।’ প্রিয়ার এ বক্তব্যের পর ট্রাম্প বলেন, ‘কারা জমি দখল করেছে, কারা ঘরবাড়ি দখল করেছে?’ তখন একটু ভেবে প্রিয়া বলেন, ‘মুসলিম মৌলবাদীরা। তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সবসময়।’ তবে তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প কোনো মন্তব্য করেননি। এরপর এক চীনা নাগরিক তার পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরেন। এ সময় ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেন চীনের কোন প্রদেশে। তখন ওই নারী বলেন, চীনের পশ্চিমাংশের প্রদেশ শিনজিয়াংয়ে তার বাবাকে যাবজ্জীবন কারাদ  দেওয়া হয়েছে। সে প্রায় পাঁচ বছর ধরে জেলে রয়েছে। ২০১৭ সালের পরে তার সঙ্গে আর দেখা হয়নি বলে জানান তিনি। কথা শেষ হতেই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একজন রোহিঙ্গা প্রতিনিধি বলেন, শুভ অপরাহ্ন প্রেসিডেন্ট। আমি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে এসেছি। আমরা যত দ্রুত সম্ভব আমাদের নিজ দেশে নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে চাই। আমাদেরকে সহযোগিতা করার বিষয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা? তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানতে চান, আপনাদের এই আশ্রয়কেন্দ্রটি কোন দেশে? তখন মার্কিন এক কর্মকর্তা জানান, এই আশ্রয়কেন্দ্র বাংলাদেশে। বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) পাশের দেশ। তখন ট্রাম্প বলেন, ও আচ্ছা। এরপর কিউবার এক নাগরিক সেখানকার সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তখন ট্রাম্প তাকে জিজ্ঞেস করেন, কাস্ত্রো সরকারের অবস্থান এবং নতুন রাষ্ট্রপ্রধান সম্পর্কে। তখন ওই নাগরিক বলেন, রাহুল কাস্ত্রোর হাতেই মূল ক্ষমতা। কারণ তিনি কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্বে রয়েছেন। এরপর নাইজেরিয়ার নাগরিক তাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন এবং নির্যাতনের হাত থেকে কোনোমতে পালিয়ে এসেছেন বলে জানান। তার কথা শেষ হতেই উত্তর কোরিয়ার এক নাগরিক তার পূর্বপুরুষরা খ্রিস্টান হওয়ার কারণে তার পুরো পরিবারের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে বলে জানান। এরপর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নাদিয়া মুরাদ ইয়াজিদি গোষ্ঠীর ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচারের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, আমাদের ওপর আইএস আক্রমণ করলে কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। ২০১৪ সালে তারা আমার ছয় ভাই এবং মাকে হত্যা করে। এরপর আমাকে এবং আমার ১১ বোন ও ভাগ্নিকে বন্দী করে। ৩ হাজার ইয়াজিদি নারী-শিশু তাদের হাতে বন্দী। সবার ওপর অত্যাচার চলে। আমাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়, আইএসের আক্রমণের আশঙ্কা এখন নেই। তাদের পরাজিত করা হয়েছে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তিন হাজার বন্দী নারীরা কোথায়? আমরা যে অঞ্চলে থাকি তার কর্তৃত্ব নিয়ে সবসময় কুর্দি আর ইরাক সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। ফলশ্রুতিতে আমরা এখনো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দেশ-দেশান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। ৯৫ হাজার ইয়াজিদি নাগরিক ভয়াবহ পথে জার্মানিতে পৌঁছেছে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানতে চান, শুনলাম আপনি নোবেল পেয়েছেন। আপনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কারণ কী? উত্তরে তিনি বলেন, আমার সঙ্গে এসব ঘটে যাওয়ার পর আমি কৌশলে আইএসের হাত থেকে পালাই। পরবর্তীতে বন্দী ইয়াজিদি নারীদের মুক্তির জন্য কাজ করি। তাদের নিরাপদ জীবনের জন্য লড়াই করে চলছি। এ জন্য প্রথম ইরাকি হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাই। তার কথা শেষে ইরান, পাকিস্তানসহ বেশ কিছু দেশের নাগরিকরা তাদের পরিবার এবং সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের বর্ণনা দেন। পাকিস্তানের আহমদিয়া সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বলেন, এখানে আমি নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিতে পারলেও পাকিস্তানে পারব না। আমাদের ১৯৭৪ সালে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। আমি বই বিক্রি করে রুটি-রুজির জোগাড় করতাম। আমাকে পাঁচ বছরের জন্য কারাবন্দী করা হয়। তিন বছর জেল খাটার পর মুক্তি মিলেছে। দয়া করে আমাদের পাশে দাঁড়ান। এরপর ভিয়েতনামের এক নাগরিক তাদের সম্প্রদায়ের সমস্যা তুলে ধরেন। কথা শেষ হতেই সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার সমাপনী টানেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ১৫ মিনিটে প্রিয়া সাহার বাংলাদেশ নিয়ে আজগুবি নালিশের কারণে দেশব্যাপী চলছে তীব্র সমালোচনা। বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় এই নেত্রীর এমন আচরণে বিব্রত তার সংগঠনও। তার এ বক্তব্যকে মিথ্যাচার আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রী। তবে শুধু প্রিয়া সাহা নয়, আলোচনায় রয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুও। বাংলাদেশ কোথায়? ট্রাম্পের এই জিজ্ঞাসা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ। এর পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নাদিয়া মুরাদ কোন কারণে নোবেল পেয়েছেন তা জানতে চাওয়া। আলোচনার ১৫ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিউজফিডে ঘুরেছে এই তিন ইস্যু। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে প্রিয়া সাহার বিভ্রান্তকর তথ্য রয়েছে সর্বাধিক আলোচনায়।


আপনার মন্তব্য