শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ জুলাই, ২০১৯ ২৩:৫৪

স্থানীয়রা মাদকের সংশ্লিষ্টতা দেখলেও এসপির না

মিন্নির দুই আবেদন বাতিল

আরাফাত মুন্না ও মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু, বরগুনা থেকে

স্থানীয়রা মাদকের সংশ্লিষ্টতা দেখলেও এসপির না

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার নেপথ্যে মাদকের বিষয়টি উঠে আসে ঘটনার পর পরই। নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির এক মানববন্ধনেও এমনটাই দাবি করা হয়েছিল। স্থানীয় সাধারণ মানুষও বলছে, মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরেই রিফাত শরীফকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের তদন্তে মাদক ইস্যুটি গুরুত্ব পাচ্ছে না। আসামিদের অনেকেই মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও এ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মারুফ হোসেন হত্যার পেছনে মাদকের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করতে চান না। এখনো পর্যন্ত তদন্তে মাদকের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলেই গতকাল নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান এসপি। এদিকে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির দুটি আবেদন নামঞ্জুর করেছে আদালত। এ ছাড়া বিকালে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রিশান ফরাজী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ীয় সূত্র বলছে, হত্যার ঘটনার আগেও রিফাত শরীফের সঙ্গে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীদের মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একবার রিফাত শরীফ রিফাত ফরাজীকে হাতুরিপেটা পর্যন্ত করেছিল। নয়ন বন্ড ১০০ জনের বেশি সদস্য নিয়ে মেসেঞ্জার গ্রুপ ‘০০৭’ চালাত। এ গ্রুপের বেশিরভাগ সদস্যই মাদকের সঙ্গে জড়িত। এমনকি হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া রিফাত শরীফও এক সময় নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। বরগুনা সদর থানায় দায়ের হওয়া মাদকের একটি মামলায় রিফাত ফরাজী ও রিফাত শরীফ দুজনেই আসামি হিসেবে রয়েছে। পরে মাদক ব্যবসার লেনদেনকে কেন্দ্র করেই তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর বিরুদ্ধে বরগুনা সদর থানায় বেশ কয়েকটি মামলাও রয়েছে। এর মধ্যে নয়ন বন্ডের নামে ৮টি ও রিফাত ফরাজীর নামে ৪টি মামলা রয়েছে। যার অধিকাংশই মাদকের মামলা।

রিফাত শরীফ হত্যার সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে বরগুনা জেলা পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের কেউ কেউ মাদক সেবন বা বিক্রির দায়ে দু-একবার আটক হলেও হত্যার পেছনে আমরা এখনো পর্যন্ত মাদক সংশ্লিষ্টতা পাইনি। তাহলে এ হত্যার মূলে কী কারণ থাকতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত শেষ হলেই বিস্তারিত জানতে পারবেন। নিহত রিফাত শরীফের মাদক সংশ্লিষ্টা বিষয়ে প্রশ্নে এসপি বলেন, সে তো ভিকটিম। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। মাদকের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে পুলিশ কাউকে বাঁচাতে চাইছে কি-না- এমন প্রশ্নে এসপি মারুফ বলেন, আমরা কাকে বাঁচাতে চাইব। এ ঘটনার অন্যতম দুই আসামি রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। তাদের জন্যও তো কোনো প্রকার কোনো সুপারিশ আমাদের কাছে কেউ করেনি। এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামিকেই আমরা গ্রেফতার করেছি। এক আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তদন্তও শেষ পর্যায়ে আছে বলে জানান পুলিশ সুপার।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১১ মে রাত পৌনে ২টার দিকে রিফাত শরীফ ১০০ পিস ইয়াবাসহ গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল। এ সময় রিফাত শরীফকে আটকের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও করে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও তার সহযোগীরা। তারা ওইদিনই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়। ওই মামলায় আটকের পরে রিফাত শরীফ ১৯ দিন কারাগারে ছিল। কারাগার থেকে বের হয়ে রিফাত শরীফ তার প্রতিপক্ষ রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের কাছে জানতে চায়, কেন তারা ইয়াবা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে। কেন তারা তাকে আটকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়েছে। এ নিয়ে দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে রিফাত ফরাজীকে হাতুড়িপেটা করে রিফাত শরীফের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, নয়ন বন্ড বড় ধরনের মাদক কারবারি ছিল। ২০১৭ সালের ৫ মার্চ নয়ন ও তার দুই সহযোগীকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। এ সময় তার কাছ থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা, ১২ বোতল ফেনসিডিল ও ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে পুলিশ।

নয়ন জেলে যাওয়ার পর রিফাত ফরাজীসহ নয়নের সহযোগীরা মাদক ব্যবসা চালিয়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রিফাত ফরাজীর এক স্কুল শিক্ষক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রিফাত ফরাজী স্কুল লাইফ থেকেই উগ্র প্রকৃতির ছিল। বরগুনা জেলা স্কুলে সহপাঠীদের মারধরের ঘটনায় বেশ কয়েকবার রিফাত ফরাজীর অভিভাবকদের স্কুলে ডেকে সতর্ক করা হয়েছিল। তাতেও থামেনি রিফাত ফরাজীর কুকর্ম। দিনে দিনে মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে জরিয়ে পড়ে রিফাত ফারাজী।

জানা গেছে, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন ভায়রার ছেলে রিফাত ফরাজীর কাছে প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব কারণে কয়েকবার গ্রেফতার হলেও রহস্যজনক কারণে খুব স্বল্প সময়েই মুক্তি পায় সে। ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করে রিফাত ফারাজী। এ ঘটনায় তারিকুলের বাবা থানায় মামলা দায়ের করলেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

পুলিশ মাদক ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছে : রিফাত শরীফ হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশ মাদক ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ মামলায় যারা আসামি ও যে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে, তারা সবাই মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত। এ কারণে হত্যাকান্ডের পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে মাদক। এছাড়া অন্য কারণও থাকতে পারে। তবে আমরা দেখছি পুলিশ মাদক ইস্যুকে বাদ দিয়ে তদন্ত করছে। যেটা মোটেও ঠিক নয়। পুলিশের এমন আচরণের পেছনে কী কারণ, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার সদরঘাটে বরগুনা থেকে ঢাকাগামী একটি লঞ্চ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ইয়াবা উদ্ধার করেছে ঢাকার পুলিশ। এ চালান কিন্তু বরগুনা থেকেই গে ছে। অথচ বরগুনা পুলিশ কিন্তু এখনো পর্যন্ত মাদকের বড় চালান আটক করতে পারেনি। তারা হয়তো এ জেলাকে মাদকমুক্ত দেখানোর জন্যই এমন কাজ করছে।

জানতে চাইলে বরগুনা প্রেস ক্লাব সভাপতি ও খেলাঘর জাতীয় কমিটির সহ-সভাপতি চিত্তরঞ্জন শীল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যে ছেলেটা মারা গেছে এবং যারা আসামি তারা সব একই গ্রুপের সদস্য ছিল। মাদক, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে এদের বিরুদ্ধে। তবে পুলিশ কেন জানি মাদকের বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি না। হয়তো তাদের কোনো কৌশল থাকতে পারে। তবে আমি মনে করি হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের সব বিষয়ই আমলে নিতে হবে।

মিন্নির দুই আবেদন নামঞ্জুর : বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির দুটি আবেদন নামঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল সকালে মিন্নির চিকিৎসা ও তাকে আদালতে উপস্থিত করার জন্য তার আইনজীবী আদালতে দুটি আবেদন করেন। দুপুর ১২টায় বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী আবেদন দুটি নামঞ্জুর করেন। আদালত বলেছে, জেল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এ বিষয়ে মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম জানান, মিন্নির চিকিৎসা এবং আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাখ্যানের আবেদনে তার স্বাক্ষরের দরকার। তাই তাকে আদালতে হাজির করতে আদালতের অনুমতির জন্য দুটি আবেদন করা হয়। বিচারক দুটি আবেদনই খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এ আবেদনের বিষয় কারা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া মিন্নির জামিনের জন্য আমরা আদেশের সইমোহর তোলার জন্য আবেদন করেছি। যখনই পাব, তখনই আমরা জজ কোর্টে জামিনের আবেদন করব।

রিশান ফরাজীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ : রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. রাশিদুল হাসান ওরফে রিশান ফরাজী ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল বিকালে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর কাছে রিশান ফরাজী এ জবানবন্দি দেয়। এর আগে গত ১৯ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আসামি রিশান ফরাজীকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চায়। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। রিশান বরগুনা পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি রোডের দুলাল ফরাজীর ছেলে ও মামলার দ্বিতীয় আসামি রিফাত ফরাজীর ছোটভাই।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি হামলাকারীদের সঙ্গে লড়াই করেও তাদের দমাতে পারেননি। গুরুতর আহত রিফাতকে ওইদিন বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও পাঁচ-ছয়জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ এ পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। গত ২ জুলাই ভোরে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। পরে মিন্নিকেও রিফাত হত্যা মামলার আসামি করে গ্রেফতার দেখানো হয়।

গত ১৬ জুলাই সকাল পৌনে ১০টার দিকে রিফাত হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শী মিন্নিকে জবানবন্দি গ্রহণের কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে পুলিশ। সোয়া একঘণ্টা পর রাত ৯টার দিকে রিফাত হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখায়। এরপর ১৭ জুলাই তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষ না হতেই ১৯ জুলাই তাকে আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। মিন্নিকে গ্রেফতারের পর থেকেই তার পরিবার দাবি করে আসছে পুলিশ প্রভাবশালীদের ইশারায় তার মেয়েকে গ্রেফতার করেছে। মূল অপরাধীদের বাঁচাতেই মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ মিন্নির বাবার।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর