শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪০

বুলবুল কেড়ে নিল ২৩ প্রাণ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ১৩ জেলায়

বিদ্যুৎবিহীন ৪ লাখ মানুষ, ক্ষতি কমিয়েছে সুন্দরবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুলবুল কেড়ে নিল ২৩ প্রাণ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ১৩ জেলায়
বাগেরহাটে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর -বাংলাদেশ প্রতিদিন

উপকূলে আঘাত করা ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে প্রাণ গেল ২৩ জনের। দমকা হাওয়ায় গাছ ও ঘরচাপা পড়ে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে ১০ জেলায় তাদের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ভোলায় ১০ জন। এছাড়া খুলনা, বরগুনা ও গোপালগঞ্জে দুজন করে এবং পটুয়াখালী, শরীয়তপুর, পিরোজপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে একজন করে মারা যান। এ ছাড়া অর্ধলক্ষাধিক ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ জেলায় এখনো ৪ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিহীন রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের কারণে ভয়াল এ ঝড়ের ক্ষয়-ক্ষতি অনেক কম হয়েছে।

খুলনার দীঘলিয়া এবং দাকোপ উপজেলায় গাছচাপা পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- দীঘলিয়া উপজেলায় সেনহাটির আলমগীর হোসেন (৩২) এবং দাকোপের প্রমীলা ম-ল (৫২)। প্রমীলা শনিবার রাতে দক্ষিণ দাকোপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাইক্লোন শেল্টারে ছিলেন। ঝড় দুর্বল হওয়ার পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি নিজের বাড়ি ফিরে যান। সেখানে একটি গাছ ভেঙে পড়লে তাতে চাপা পড়ে প্রমীলার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে সকাল ৯টার দিকে সেনহাটি গ্রামে নিজের বাসার কাছে ঝড়ে ভাঙা শজনে গাছের নিচে চাপা পড়ে আহত হন আলমগীর হোসেন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। শনিবার রাতে বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের এক আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে মারা যান বানাই গ্রামের মোজাফ্ফর আলীর স্ত্রী হালিমা খাতুন (৭০)। বিকালে ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের ডাল কাটতে গিয়ে প্রাণ গেছে সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ছোট লবণগোলা গ্রামের বাসিন্দা মহিবুল্লাহর। ভাঙা ডাল কাটতে গাছে উঠে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হলে তাকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়। গোপালগঞ্জে দুপুরে কোটালীপাড়া উপজেলার বান্ধাবাড়ি ইউনিয়নের বান্ধাবাড়ি গ্রামের হাসান উদ্দিন হাওলাদারের ছেলে সেকেল হাওলাদার (৭০) ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে একটি গাছ ভেঙে পড়লে চাপা পড়ে মারা যান। সদর উপজেলার খাটিয়াগড় গ্রামের মৃত বাবন কাজীর স্ত্রী মাঝু বিবি (৬৭) গাছচাপা পড়েন। শনিবার রাত ৩টার দিকে দমকা হওয়ায় গাছ উপড়ে বসতঘরের ওপর পড়ে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় হামেদ ফকির (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হন। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় ঘূর্ণিঝড়ে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়লে ঘটনাস্থলেই মারা যান আলী বক্স ছৈয়াল (৭০)। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নের লড়া গ্রামে শনিবার সকালে বুলবুলের তা-ব শুরু হলে গাছ উপড়ে ঘরের ওপর পড়লে মারা যান ননী শিকারী (৪২)। মাদারীপুর সদর উপজেলায় ঝড়ো হাওয়ায় ঘরচাপা পড়ে সালেহা বেগম (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বরিশালে উজিরপুর পৌর শহরের এক নম্বর ওয়ার্ডে  আশালতা মজুমদার (৬০) মারা যান গাছের নিচে চাপা পড়ে। বাগেরহাটের রামপালে ঘরের ওপর গাছচাপা পড়ে সামিয়া খাতুন (১৫) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার বড় সিধলকুড়া গ্রামে দমকা হাওয়ায় ভেঙে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আলেয়া বেগম (৩৮) এর মৃত্যু হয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামে আবুল কালাম নামে ৪০ বছর বয়সী এক মাছচাষি শনিবার রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

৯ জেলের লাশ উদ্ধার : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে ভোলায় ট্রলার ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ১৩ জেলের মধ্যে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মাছকাটা নদী থেকে ৯ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল রাতে উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকা থেকে নদীতে ভাসমান অবস্থায় লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া লাশগুলো হচ্ছে- ভোলার দুলারহাটের মৃত নুরুল হকের ছেলে কামাল দালাল (৩৫), একই এলাকার কাদের মোল্লার ছেলে হাসান মোল্লা (৩৮), কাদের বেপারীর ছেলে নূরনবী বেপারী (৩০), ছলিমন মাতব্বরের ছেলে মফিজ মাতব্বর (৩৫), এছিন পাটোয়ারীর ছেলে নজরুল ইসলাম (৩৫), মোসলেউদ্দিন মাঝির ছেলে কবির হোসেন (৪০), ইসমাইল খানের ছেলে বিল্লাল (৩২), চরফ্যাশনের মৃত মুজিবল হক মুন্সীর ছেলে আব্বাস মুন্সী (৪৪) ও একই এলাকার মৃত জামাল বিশ্বাসের ছেলে রফিক বিশ্বাস (৪৪)। এর আগে রবিবার রাতে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির নাম খোরশেদ মিয়া। মেহেন্দিগঞ্জ থানার ওসি আবিদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে খুলনা বিভাগের পাঁচ জেলায় ৪ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিক উদ্দিন গতকাল বলেন, খুলনা বিভাগের পাঁচ জেলায় ৩২টি ফিডারের আওতায় ৪ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। ৩২টি ফিডারের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ১৫টি চালুর উপযোগী হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো আরও খবর- খুলনা : খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে প্রায় ৪৭ হাজার ২৭৫টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। মাটির সঙ্গে মিশে গেছে কয়েক হাজার কাঁচা বসতঘর। রাস্তাঘাটে গাছপালা উপড়ে পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, ঘূর্ণিঝড়ে শুধু খুলনা জেলায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯২ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি ও ভেসে গেছে কয়েক হাজার মাছের ঘের। এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬ জেলার রোপা আমনের ফসল বিনষ্ট হয়েছে দুই লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমির। বরগুনা : বুলবুলের প্রভাবে বরগুনার ৬টি উপজেলায় ৫ সহস্রাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ২৫০টি কাঁচা ও আধাপাকা ঘর। আশ্রয়কেন্দ্রে বার্ধক্যজনিত কারণে ১ জন ও গাছ থেকে পড়ে ১ জন মারা গেছেন। এ ছাড়াও ৬টি উপজেলায় কমপক্ষে ১৭ জন আহত হয়েছেন। বঙ্গোপসাগরে একটি মাছ ধরা ট্রলারসহ ১৫ জেলে নিখোঁজ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা ভা ারিয়া সঞ্চালন লাইনের ৩৬ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়েছে। উপড়ে গেছে অসংখ্য পোল। এ ছাড়াও শহরের অভ্যন্তরীণ বিতরণ লাইন ছিঁড়ে গেছে। পটুয়াখালী : বুলবুলের প্রভাবে দমকা হওয়ায় গাছ উপড়ে বসতঘরে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ শক্তিশালী হয়ে প্রবল বেগে যখন বাংলাদেশের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল তখনই জন্ম নিয়েছে এক কন্যাশিশু। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে মিল রেখে তার নাম রাখা হয়েছে বুলবুলি আক্তার বন্যা। শনিবার দুপুরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের একটি আবাসনে গর্ভবতী মা হুমায়রা বেগম এই কন্যাসন্তান প্রসব করেন। সাতক্ষীরা : বুলবুলের আঘাতে সাতক্ষীরার সুনদন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনি ও শ্যামনগরে ১৩ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও ৩৩ হাজার ৪৬০টি কাঁচা ঘরবাড়ি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল এবং জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার। এ ছাড়া উপকূলীয় উপজেলায় শত শত বিঘা মৎস্য ঘের ও ফসলি জমি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের নরম (সফট) কাঁকড়া প্রজেক্টের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া সাতক্ষীরার দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের চুনা, খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের ১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে ব্যাপক ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে।

লক্ষ্মীপুর : রামগতিতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বাগেরহাট : বাগেরহাটে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিধ্বস্ত হয়েছে ৪৪ হাজার ৫৬৩টি ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও ৩৫ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমির ফসল। পানিতে ভেসে গেছে চিংড়সহ ৭ হাজার ২৩৪টি মৎস্য খামার। মাছচাষিদের ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভেঙে পড়েছে ৭০টি বিদ্যুতের খুঁটি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ লাইন। শুক্রবার রাত থেকে শরণখোলা উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল যখন ধেয়ে আসছিল তখন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার মিঠাখালী এটিসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে সন্তান প্রসব করেছেন মিঠাকালী গ্রামের হনুফা বেগম। শুক্রবার দিনগত রাত ১টা ১৫ মিনিটে জন্ম নেয় এই কন্যাশিশু। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সঙ্গে মিলিয়ে তখনই শিশুটির নাম রাখা হয় ‘বুলবুলি’। বর্তমানে মা-মেয়ে দুজনেই সুস্থ আছেন। বরিশাল : বরিশাল জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৩ হাজার ৫০টি কঁাঁচা ঘরবাড়ি, ১ লাখ হেক্টর জমির আমন ধান, ৬ হাজার হেক্টর জমির রবিশস্য, ১ লাখ গাছপালা এবং ১২০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা, ২২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর