শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৩

হত্যা নির্যাতন বন্ধের নির্দেশ

চারটি অন্তর্বর্তী আদেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের, মিয়ানমারের আপিল খারিজ, বাস্তুচ্যুতি বন্ধ করে রাখাইন রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিতে হবে, গণহত্যার আলামত নষ্ট করা যাবে না

প্রতিদিন ডেস্ক

হত্যা নির্যাতন বন্ধের নির্দেশ
নেদারল্যান্ডসে গতকাল রায় ঘোষণা করেন আইসিজের বিচারকরা। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প (ডানে) -এএফপি

নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস-আইসিজে) বিচারকরা গতকাল সর্বসম্মত রায়ে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে হত্যা, নির্যাতন বন্ধ করাসহ জরুরি ভিত্তিতে চার দফা              অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বা কোনো পক্ষ এমন কিছু করতে পারবে না, যা গণহত্যা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। আদালত মনে করে, মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গারা জেনোসাইড কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী একটি ‘প্রটেকটেড গ্রুপ’। ২০১৭ সালে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অভিযানের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী তারা আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি ও বেসামরিকদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনি। তাই অনেক বেসামরিক প্রাণ হারিয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে গাম্বিয়ার করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইসিজের ১৭ সদস্যের বিচারক প্যানেল এ আদেশ দেয়। আইসিজে প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমদ ইউসুফ নেদারল্যান্ডস সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টায়) আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতের আদেশ ঘোষণা শুরু করেন। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার অভিযোগ ছিল, দুই বছর আগে রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে সেনাবাহিনীর অভিযানে যে বর্বরতা চালানো হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে ১৯৮৪ সালের আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশন ভঙ্গ করেছে মিয়ানমার। দ্য হেগের পিস প্যালেসে গত ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর এ মামলার ওপর প্রাথমিক শুনানি হয়। তাতে গাম্বিয়ার পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। অন্য পক্ষে ছিলেন মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি। গতকাল আদেশদানের শুরুতে মিয়ানমারের যুক্তি নাকচ করে দিয়ে আইসিজে প্রেসিডেন্ট বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা, সে বিচারের এখতিয়ার আইসিজের রয়েছে। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশনের ভিত্তিতে এ মামলা করার মতো প্রাথমিক অধিকারও গাম্বিয়ার আছে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার যেসব আবেদন গাম্বিয়া করেছে, তার মধ্যে তিনটি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস। পাশাপাশি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আরেকটি আদেশ দিয়েছে। আইসিজে মিয়ানমারকে তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে অন্তবর্তী চার পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমদ ইউসুফ আদেশ পড়ে শোনানোর সময় অন্য ১৪ জন স্থায়ী ও দুজন অ্যাডহক বিচারপতি আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। আদালতের চারটি আদেশ হলো : জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে। গণহত্যার প্রমাণ ধ্বংস করা যাবে না। সশস্ত্র বাহিনী ফের কোনো গণহত্যা ঘটাতে পারবে না। চার মাস পরপর মিয়ানমারকে আদালতে রিপোর্ট দিতে হবে যত দিন না পর্যন্ত বিচারের চূড়ান্ত রায় প্রকাশ হয়। আদালত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীকে সব ধরনের গণহত্যার অপরাধ ও গণহত্যার ষড়যন্ত্র থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে এবং গণহত্যা সনদের ধারা-২-এর আওতায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা মিয়ানমারকে পূরণ করতে বলেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, নিপীড়ন বন্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে মিয়ানমারের বিরত থাকারও নির্দেশ দিয়েছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গাম্বিয়া যেসব ব্যবস্থার আবেদন করেছে, সেগুলো হুবহু অনুসরণ না করে আদালত কিছু পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বলে, আদালতের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। গণহত্যা সনদের ধারা ৪১-এর আওতায় তিনটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশের শর্তসমূহ বিরাজ করছে বলে আদালত উল্লেখ করেছে। আদালত বলে, গাম্বিয়া যেসব অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার আদেশ চেয়েছে, তার প্রথম তিনটির লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেওয়া। জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধান দলের উপসংহার, যা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত হয়েছে, তাতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে যে উল্লেখ রয়েছে, তা আদালতের নজরে এসেছে।

আদালত মনে করে, গণহত্যা সনদের ধারা ২-এর আলোকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একটি বিশেষ সুরক্ষার অধিকারী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচ্য। সনদের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর আওতায় (ধারা ৮ ও ৯) এ মামলা দায়েরের গাম্বিয়ার প্রাইমা ফেসি অধিকার আছে বলে জানিয়েছে আদালত। এ বিষয়ে আদালতের এখতিয়ার নেই বলে মিয়ানমার যে দাবি করেছে, আদালত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে যেসব বিবরণ উঠে এসেছে তার আলোকে গাম্বিয়া মিয়ানমারকে যে নোট ভারবাল দিয়েছিল, তা বিরোধের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছে আদালত। আদালত বলেছে, গাম্বিয়া স্বনামে এ আবেদন করেছে। এরপর তারা ওআইসিসহ যে কোনো সংস্থা ও দেশের সহযোগিতা চাইতে পারে। তাতে মামলা করার অধিকার ক্ষুণœ হয় না। আদালতের প্রাথমিকভাবে এখতিয়ার আছে কিনা, তা গণহত্যা সনদের ৯ ধারার আওতায় বিবেচ্য জানিয়ে আদালত তার যুক্তি তুলে ধরছে। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনে হত্যাকান্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে জীবন বাঁচাতে নতুন করে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। রায়ে খুশি রোহিঙ্গারা : কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, নেদারল্যান্ডসের হেগে আইসিজের মামলার অন্তর্বর্তীকালীন রায়ে খুশি হয়েছেন রোহিঙ্গারা। দাবিকৃত ছয়টির মধ্যে চারটি তাদের পক্ষে আসায় প্রথম জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তারা। টেকনাফের জাদীমোড়া রোহিঙ্গা ক্যা¤ন্ডেপর মো. ইসমাইল বলেন, আইসিজে দেওয়া রায়ে আমরা অনেক খুশি, এটি মাত্র শুরু। মনে হচ্ছে এটি বিচারের প্রথম স্বাদ। তাছাড়া এই রায় দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই। কিন্তু প্রত্যাবাসনের বিষয়টি যদি সামনে আনা যেত তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করা যেত।  রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সাধারণ স¤পাদক মাস্টার সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ছয়টি দাবির মধ্যে চারটি আমাদের পক্ষে এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে অং সান সুচির যুক্তি খারিজ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে সেখানে গণহত্যা হয়েছে। এ জন্য রায়ের দিন সুচি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এ থেকে সুচির লজ্জা পাওয়া উচিত। তবে প্রত্যাবাসনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে আরও ভালো হতো।

অন্তর্বর্তী  ট্রাইব্যুনাল দরকার : এদিকে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে একটি অ্যাডহক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা উচিত বলে মনে করেন মিয়ানমারের মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ের ইয়াং হি লি। ওই ট্রাইব্যুনাল কেমন হবে, সে বিষয় মার্চে অনুষ্ঠেয় মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশনে এ প্রস্তাব তিনি তুলে ধরবেন।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ইয়াং হি লি এ কথা বলেন। তিনি ১৭ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন। এরপর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে যান।

ঢাকায় একাধিক বৈঠক করেন। গতকাল বাংলাদেশ ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলন করেন।


আপনার মন্তব্য