শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:২৯

এমপির মানব পাচার নিয়ে তোলপাড়

কুয়েত মিডিয়ার সংবাদ নিয়ে সরকারের ভিতরেও আলোচনা, হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

এমপির মানব পাচার নিয়ে তোলপাড়
কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল

সংসদ সদস্য কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল (লক্ষ্মীপুর-২) মানব পাচারে জড়িত- এই সংবাদ দেশে এবং কুয়েতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কুয়েতের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী পাপুল কুয়েতে মানব পাচার করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কুয়েতের মিডিয়ার এই খবর নিয়ে সরকারের ভিতরেও আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে এই নিয়ে আলোচনা-গুঞ্জন চলছেই, কুয়েতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও তুমুল আলোচনা চলছে। কুয়েত থেকে পরিচালিত কুয়েত ফর বাংলাদেশি নামে একটি ফেসবুক পেজেও বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে।

অবৈধ পথে কুয়েতে লোক নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এমপি পাপুলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য চেয়ে কুয়েত দূতাবাসকে গতকাল চিঠি দিয়েছে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো। দ্রুততম সময়ে একটি প্রতিবেদন পাঠাতে দূতাবাসকে অনুরোধ করা হয়েছে।

কুয়েতের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এমপি শহিদুল নিজের নামে কিছুই করেন না। তিনি বিভিন্ন সাব-এজেন্টের মাধ্যমে মানব পাচার করিয়ে থাকেন। বিশেষ করে ক্লিনিং এবং সিকিউরিটির কাজের নামে তিনি এই মানব পাচার করে থাকেন। পাপুল যে শুধু অবৈধ পথে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত তা নয়, তিনি যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন সব জায়গাতেই নিজের তথ্য গোপন রেখে ব্যবসা করেন। দেশেই জামায়াত ইসলামী নিয়ন্ত্রিত দিগন্ত টিভি, নয়া দিগন্ত এবং দিগন্ত মিডিয়ায় তিনি পরিচালকের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন তিন কোটি টাকার বিনিময়ে। অবশ্য এই টাকা তিনি তার ব্যাংক হিসাব থেকে দেননি। তথ্য প্রমাণ না রাখতে নিজের শ্যালিকার হিসাব মাধ্যমে লেনদেন করেছেন।

তিনি এমপি হওয়ার পর স্ত্রী সেলিনা ইসলামকে স্বতন্ত্র কোটায় মহিলা সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেন। তার বিরুদ্ধে কুয়েতে মানব পাচার করে হাজার কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেনি। সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রবিবার বলেছেন, বিষয়টি দুদক তদন্ত করে দেখবে। সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, পাপুল রবিবার রাতেই কুয়েতের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়ে যান। অপরদিকে বিএমইটি’র মহাপরিচালক মো. শামছুল আলম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, সাধারণত কেউ নিজের নামে ট্রাভেল এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠানের নাম করে না। শহিদুলের নামে বা তার পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠান আমার জ্ঞাতসারে নেই। তবে ভিন্ন নামে থাকলেও থাকতে পারে। সেটা চেক করে দেখতে হবে।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলকে নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কুয়েতে মানব পাচারে যুক্ত আছেন- এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এলাকায় বিভিন্ন চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় তাকে নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। পক্ষে-বিপক্ষে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন অনেকে।

জানা যায়, কুয়েতের আল কাবাস ও কুয়েত টাইমস পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের একটি চক্রের বাংলাদেশি সংসদ সদস্য কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের জড়িত থাকার কথা বলা হয়। গত দুই দেশের একাধিক দৈনিক পত্রিকায় কুয়েতি পত্রিকার বরাত দিয়ে পাপুলের কুয়েতের মানব পাচারের খবরটি প্রচারিত হয়। এসব খবরে বলা হয়, মানব পাচারের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এই এমপি।

লক্ষ্মীপুরের স্থানীরা মনে করছেন, মানব পাচার করে কুয়েতের শ্রম বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন এই এমপি। জানা গেছে, পাপুলের কোম্পানির মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা করে নিয়ে তাদের কুয়েতে পাঠানো হয়েছে। অনেক শ্রমিক তাদের শ্রমের টাকা পাচ্ছেন না এমন অভিযোগের ভিডিও ছাড়েন কেউ কেউ। এলাকায় দানবীর হিসেবে পরিচিত পাপুলের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের শেষ নেই। অভিযোগ উঠেছে, তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নগদ টাকা অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার বেশির ভাগই ভঙ্গ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালের শেষের দিকে কুয়েত প্রবাসী কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে আসেন। ওই সময়ে তিনি রায়পুর পৌর শহরের আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক জামশেদ কবির বাকি বিল্লাহের হাত ধরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সভায় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করাসহ মানব সেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার ঘোষণা দেন তিনি। পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক অনুদান দেওয়া শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে সর্বমহলে দানবীর ও ধনকুবের হিসেবে পরিচিতি করাতে সক্ষম হন। তিনি বিভিন্ন সভায় নিজেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মালিক দাবি করে বলেন, নিতে আসিনি মানব কল্যাণে দিতে এসেছি। তার সহধর্মিণীও নিজের স্বামীর গুণের কথা তুলে ধরেন। এক সভায় তিনি বলেন সাগরের পানি শুকিয়ে গেলেও পাপুলের টাকা শেষ হবে না। এরপর একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চান পাপুল। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। এ আসনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পাওয়া জাতীয় পার্টির তৎকালীন এমপি হঠাৎ আত্মগোপনে চলে যান। তখন অভিযোগ ওঠে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান নোমান। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থনপুষ্ট হয়ে নির্বাচনে জয় লাভ করেন পাপুল। এর কিছুদিন পর তার সহধর্মিণী সেলিনা ইসলাম স্বতন্ত্র কোটায় মহিলা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র আবু তাহের মুঠোফোনে বলেন, পাপুল সাহেব তো অনেক টাকার মালিক। সমুদ্রের পানি শুকিয়ে গেলেও তার টাকা তো শেষ হওয়ার নয়, এখন তার এত টাকা গেল কই, তিনি প্রায় হেলিকপ্টারে আসেন লক্ষ্মীপুরে। কতিপয় নেতা তাকে নিয়ে কোথায় যান, বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে ওই নেতারা টাকা নেন। সে টাকা কী করেন সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। দুদকের তদন্ত হওয়া দরকার।

অবশ্য শহিদুল ইসলাম পাপুল তার জাতীয় সংসদের প্যাডে দেওয়া প্রতিবাদপত্রে দাবি করেছেন, ৩০ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে কুয়েতে ব্যবসা করছি। আমি এনআরবি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদের সদস্য। এসব কারণে ঈর্ষান্বিত হয়ে অনেকে পত্র-পত্রিকায় মিথ্যা, বানোয়াট তথ্য প্রচার করছে। সংসদ অধিবেশন চলমান থাকায় আমি দেশে এসেছি। আমি যেহেতু কুয়েতে ব্যবসা করি, তাই সংসদ সচিবালয় থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে কুয়েতে যাই। তিনি দাবি করেন, ছুটির মেয়াদ অনুযায়ী আমি দেশে এসেছি। অন্য কোনো কারণ বা হঠাৎ দেশে আসার বিষয়টি সত্য নয়। তিনি আরও দাবি করেন, তিনি মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত নন। এমনকি জনশক্তির ব্যবসাও করেন না। জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্সও নেই। এদিকে পাপুল সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে দেখা যায়। এসব মন্তব্যে তাকে দানবীর হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

প্রকাশিত সংবাদে পাপুল সম্পর্কে যা উঠে এসেছে

কুয়েতে মানব পাচার করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংসদ সদস্য কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে। কুয়েতের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট সিআইডির মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করলে অভিযানের মুখে বাংলাদেশের এই এমপি সম্প্রতি কুয়েত ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। অভিযান নিয়ে কুয়েতের সংবাদ মাধ্যমগুলো সিরিজ রিপোর্ট করছে। সেখানে বাংলাদেশি এই এমপি ছাড়াও আরও দুজনের নাম এসেছে। বাংলাদেশ মিশন বলছে, এমপিকে নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশের পর কুয়েত সিআইডিতে তারা তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করেছেন। সিআইডি থেকে মারাতিয়া কুয়েতি গ্রুপ অব কোম্পানিজ-এর স্বত্বাধিকারী কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি। এমপি শহিদের প্রোফাইল এবং নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা থেকে জানা যায়, নির্বাচনী হলফনামায় তিনি পেশা ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বা আন্তর্জাতিক ব্যবসা’ দেখিয়েছেন। তার প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী তিনি কুয়েত ছাড়াও জর্ডান এবং ওমানে লোক পাঠান। প্রসঙ্গত, কুয়েতের স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম আল-কাবাস-এ গত বৃহস্পতিবার মানব পাচার নিয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে-বাংলাদেশি ওই এমপি সাম্প্র্রতিক সময়ে কুয়েতে একজন মার্কিন বাসিন্দার সঙ্গে আর্থিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন। কুয়েতে আয় করা বেশিরভাগ অর্থই তিনি আমেরিকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। আল কাবাসের খবরে জানানো হয়- প্রাথমিক পর্যায়ে কুয়েতের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুপারভাইজার পদে কাজ শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে নিজেই প্রতিষ্ঠানটির একজন অংশীদার হয়ে ওঠেন। এরপর আর তার পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।


আপনার মন্তব্য