শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ এপ্রিল, ২০২০ ০১:৩৭

বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে

নিজস্ব ও আদালত প্রতিবেদক

বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে
বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদকে গতকাল কারাগারে নেওয়া হয় -বাংলাদেশ প্রতিদিন

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে সোমবার দিবাগত গভীর রাতে রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গতকাল পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে। পরে আসামিকে কারাগারে পাঠায় আদালত। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম এ এম জুলফিকার হায়াত কারাগারে পাঠানোর এ আদেশ দেন। আসামি মাজেদকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে বেলা ১২টার দিকে আদালতে হাজির করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এদিকে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকরের প্রত্যাশা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আমরা দ-প্রাপ্ত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ-াদেশ কার্যকরের অপেক্ষায় ছিলাম। তাদেরই একজন ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত থেকে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আশা করি আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তার দ-াদেশ কার্যকর করতে পারব। যারা এ কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমি মনে করি, মুজিববর্ষের একটি শ্রেষ্ঠ উপহার আমরা দেশবাসীকে দিতে পেরেছি। তার স্ত্রী সানা বেগম, বাড়ি নম্বর ১০/এ, রোড নম্বর-১, ক্যান্টনমেন্ট আবাসিক এলাকা। তিনি সেখানেই বসবাস করতেন। আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে তার সব তথ্য ছিল। আসামি মাজেদকে গ্রেফতারের বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক জহুরুল হকের আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের সামনে থেকে রাত ৩টা ৪৫ মিনিটে রিকশায় করে সন্দেহজনকভাবে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি (মাজেদ)। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার কথাবার্তা অসংলগ্ন মনে হয়। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি স্বীকার করেন, তার নাম মাজেদ। তিনি বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত খুনি।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার এবং আদালত পুলিশপ্রধান মো. জাফর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আদালতে হাজির করার সময় আসামি মাজেদের পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি ও পায়জামা এবং মুখে মাস্ক। শুনানির সময় আদালতে কোনো আইনজীবী মাজেদের পক্ষে দাঁড়াননি। শুনানি শেষে আদালতের আদেশের পরপরই মাজেদকে প্রিজনভ্যানে করে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান কেবল বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। পরে এ হত্যাকা-ের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। নিম্ন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করলে ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাই কোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেয়। এরপর ১২ আসামির মধ্যে পাঁচজন আপিল বিভাগে আপিল করেন। কিন্তু এরপর ছয় বছর আপিল শুনানি না হওয়ায় আটকে যায় বিচার প্রক্রিয়া। দীর্ঘ ছয় বছর পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি আবার গতি পায়। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করে। ফলে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাই কোর্টের দেওয়া ১২ খুনির মৃত্যুদ-াদেশ বহাল থাকে। পরে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-াদেশ কার্যকর করা হয় সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), এ কে বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনের (আর্টিলারি)। ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যায় আসামি আজিজ পাশা। কিন্তু ফাঁসির দ-াদেশ পাওয়া বাকি ছয় আসামি বিদেশে পলাতক থাকে। তাদের বিষয়ে ইন্টারপোল থেকে রেড নোটিস জারি করে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নবায়ন করা হচ্ছিল। এরা হলো- খন্দকার আবদুর রশীদ, এ এম রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মুসলেহউদ্দিন ওরফে মোসলেম উদ্দিন খান।

গতকালের ভিডিওবার্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের সময় আসামি ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ এবং নূর ও রিসালদার মুসলেহউদ্দিন- এ তিনজন সেখানে ছিল। আরও কয়েকজন ছিল। এই খুনি শুধু বঙ্গবন্ধুর খুনে অংশগ্রহণ করেনি, সে জেলহত্যায়ও অংশগ্রহণ করেছিল বলে আমাদের জানা রয়েছে। খুনের পর এই খুনি জিয়াউর রহমানের নির্দেশ মোতাবেক বঙ্গভবনে এবং অন্যান্য জায়গায় কাজ করেছে।

তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের বদলে তাদের নানাভাবে পুরস্কৃত করেছে এবং ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে তাদের যাতে বিচার না হয়, সেই ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত করেছে। এই খুনিকে আমরা দেখেছি সেই সরকারের আশীর্বাদে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরিরত অবস্থায় ছিল। এরপর যখন ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে তখন সে আত্মগোপন করে। তিনি বলেন, আমাদের কমিটমেন্ট যত খুনি যেখানেই আছে আমরা সবাইকে ফিরিয়ে আনব। যেখানেই থাকুক তাদের আনার জন্য সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর