শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ আগস্ট, ২০২০ ২৩:৫৫

হাসপাতালভীতি কাটেনি করোনা রোগীদের

শনাক্ত অধিকাংশ চিকিৎসা নিচ্ছেন বাড়িতে

জয়শ্রী ভাদুড়ী

হাসপাতালভীতি কাটেনি করোনা রোগীদের

করোনাভাইরাস মহামারীতে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, প্রতারণা, ভোগান্তির কারণে হাসপাতালভীতি কাটছে না রোগীদের। করোনা আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশ বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সব হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করায় হাসপাতালে যাচ্ছেন না সাধারণ রোগীরা। আউটডোর, প্যাথলজি রোগীশূন্য হয়ে পড়েছে। চিকিৎসাসেবায় আস্থা পাচ্ছেন না রোগীরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি এখন সব হাসপাতালই করোনা রোগী নিয়ে ব্যস্ত। অন্য রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। অনেক জটিল রোগীও নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন। করোনা টেস্ট না করে আসলে কেউ ভর্তিও করাতে চায় না। সারাদিন রাত বাবাকে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে তার সন্তান ভর্তি করাতে পারল না। এসব জানাজানি হওয়ার কারণে হাসপাতালের প্রতি মানুষের এক ধরনের অনাস্থাও তৈরি হয়। চলমান পরিস্থিতির শেষ কোথায় জানি না। করোনা কবে শেষ হবে, তাও জানি না।’

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যার সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৮টি। গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত শয্যা খালি ছিল ১১ হাজার ২৮৯টি। রাজধানীতে নির্ধারিত হাসপাতালে শয্যা ৭ হাজার ৩২টি, এর মধ্যে খালি আছে ৪ হাজার ৯৪৯টি। চট্টগ্রামে করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ শয্যা ৭৮২টি, খালি আছে ৫৬১টি। করোনা আক্রান্ত অর্ধেক রোগীও হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৮৫১ জনের। আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আড়াই হাজার। হাসপাতালের সেবা ভোগান্তি, অব্যবস্থাপনায় হাসপাতালবিমুখ হয়ে উঠেছেন রোগীরা। প্রথম দিকে রোগীর চাপ সামাল দিতে দ্রুত হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটকে কভিড হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়। ১ হাজার ৫০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করা হয় করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। কিন্তু এখন সেখানে রোগী ভর্তি না করে সেটাকে বিদেশগামী যাত্রীদের নমুনা সংরক্ষণের বুথ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। হাসপাতালে যাচ্ছেন না সাধারণ রোগীরাও। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরকারিভাবে। সব হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করায় সাধারণ রোগীরা ঝুঁকিতে পড়েছেন। জরুরি পরিস্থিতি তৈরি না হলে কেউ হাসপাতালে যাচ্ছেন না। সবচেয়ে অসুবিধায় পড়েছেন কিডনি রোগী ও ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমার স্ত্রী তিন বছর ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছে। প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস করতে হয়। কোন হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাব সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছি। অধিকাংশ হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি। কোনোভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির ডায়ালাইসিস করা মেশিনে যদি আমার স্ত্রীর ডায়ালাইসিস করা হয়, তাহলে তাকে আর বাঁচানো যাবে না। প্রতি সপ্তাহে এই ভয় নিয়ে হাসপাতালে যাই। এমনিতেই ডায়ালাইসিসে অনেক বেশি ঝুঁকি থাকে তার পরে করোনায় বিপদ আরও বেড়েছে।’ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপপরিচালক ডা. মুখলেসুজ্জামান হিরো বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সারা বিশ্বের মতো করোনাভাইরাস বাংলাদেশে অনেক দিন থেকেই চলছে। প্রথম দিকে মানুষ এ চিকিৎসা বুঝে উঠতে পারেনি। কোনো দিকনির্দেশনাও পায়নি। তারা সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে যে যেখানে পেরেছে সেখানেই দৌড়াদৌড়ি করেছে। এ কারণে যথাযথ চিকিৎসা তারা পায়নি। ঘুরতে ঘুরতে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এরপর সরকারি হাসপাতালগুলো চেষ্টা করছে, কীভাবে ভালো চিকিৎসা করা যায়। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে সেবার চেয়ে ব্যবসার মনোভাবই বেশি। তারা হাসপাতালে চিকিৎসার নামে ব্যবসা করে। কিন্তু হাসপাতালগুলোর ব্যবসা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা ও সেবা না পাওয়ার কারণেই মূলত মানুষের মনে অনাস্থার মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রামক রোগ। এ জন্য মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে তাতে ঘরে চিকিৎসা নেওয়াই ভালো। তবে কোনো রোগীর অবস্থা জটিল হলে সে ক্ষেত্রে হাসপাতালে যেতে পারে।’ বিপদে পড়েছেন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। প্রতিটা থেরাপির আগে রোগীদের করোনা পরীক্ষা করাতে হয়। নেগেটিভ সনদ মিললে তবেই দেওয়া হবে থেরাপি। প্রতি থেরাপির আগে নমুনা দিতে ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগী ও তার স্বজনদের। বারবার হাসপাতালে নমুনার লাইনে দাঁড়ানোর কারণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। তিন মাস আগে বাসাবো এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপর শুরু হয় থেরাপি। তার ছেলে রইসুল ইসলাম বলেন, ‘এ পর্যন্ত একটি থেরাপি দেওয়া হয়েছে। থেরাপি দেওয়ার আগে করোনামুক্ত সনদ নিয়ে যেতে হয়। বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে নমুনা দেওয়া খুব মুশকিল হয়ে যায়। এর মধ্যে কোনোভাবে করোনা আক্রান্ত হলে কী হবে সেটা নিয়ে আমরা খুব দুশ্চিন্তায় আছি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর