শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ আগস্ট, ২০২০ ২৩:৫৩

শোক ঢেকে যায় আত্মপ্রচারে

রফিকুল ইসলাম রনি

শোক ঢেকে যায় আত্মপ্রচারে

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে করোনাকালেও থেমে নেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের আত্মপ্রচার। কারও কারও ছবির বিশালত্বে হারিয়ে গেছেন জাতির পিতা ও ১৫ আগস্টের শহীদরা। শহীদদের প্রতি ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’র ছবির চেয়ে বড় বড় ছবির পোস্টার, বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন রাজধানীর প্রায় সব জায়গায়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমন্ডি ৩/এ দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয়ের সামনেসহ নগরীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, পাড়া-মহল্লার দেয়াল ও পিলারে জাতির পিতাকে নিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধাসংবলিত পোস্টার-ব্যানার আর লেখনী শোভা পাচ্ছে। উঠতি, পাতি, মহানগরী, থানা এবং ওয়ার্ড নেতাদের এ আত্মপ্রচার দেখে মনে হয় ‘শোক ঢাকা পড়েছে পোস্টারে’। বিশেষ করে ঢাকা-৫ ও ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচন উপলক্ষে শোকের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আস্থাভাজন হতে গিয়ে কেউ কেউ জাতির পিতার ছবির চেয়ে নিজের ছবি বড় করে ছাপিয়েছেন। অনেকেই বিষয়টিকে দৃষ্টিকটু বলে মন্তব্য করেছেন।

এ প্রসঙ্গে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যারা শোকের আত্মপ্রচারের নামে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননা করছেন এটা খুবই ঘৃণিত কাজ। এটা আওয়ামী লীগকেই বন্ধ করতে হবে। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকায় অনেক কাউয়া এখন আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়েছে। এ ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।’

রাজনৈতিক গবেষক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যারা নানা অনুষ্ঠান কিংবা শোক দিবসের নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছোট করে নিজেদের ছবি বড় করেন তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শচ্যুত। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। শুধু মুজিবকোট পরলেই জাতির পিতার আদর্শের হওয়া যায় না। জাতির পিতা যে ত্যাগ-সাধনা ও আদর্শ রেখে গেছেন তা অন্তরে ধারণ করতে হবে। আত্মপ্রচারের নামে তারা কোনো সুবিধা আদায়কারী কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ব্যবহারে একটা নীতিমালা থাকা উচিত। জাতির পিতা কিংবা পরিবারের কারও নামে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কোনো স্থাপনা করতে গেলে যেমন বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট থেকে অনুমোদন নিতে হয়, তেমনি তাঁর ছবির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এমন নীতিমালা করা উচিত। তা না হলে রিজেন্টের সাহেদের মতো ব্যক্তিরা নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করার জন্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কিংবা স্থানীয় প্রশাসনকে চাপে রাখতে অথবা অনৈতিক সুবিধা আদায়ে এসব করবে। তাদের উদ্দেশ্য শোকের শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, আত্মপ্রচার ও অপকর্ম করা। এটা বন্ধ করা উচিত।’

গতকাল সরেজমিন ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে, ধানমন্ডি ৩/এ দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয়, পল্টন, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলানগর, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের এ আত্মপ্রচারের ছবি, বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার ফেস্টুন ও তোরণ চোখে পড়ে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শতাধিক পোস্টার রয়েছে। এর মধ্যে নিজের ছবি সবচেয়ে বড় করে সাঁটিয়েছেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ মৎস্যজীবী লীগের সাবেক সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার। সেখানে জাতির পিতা ও বঙ্গমাতা কিংবা ১৫ আগস্টের শহীদদের ছবি আকারে অনেক ছোট।

ঢাকা-৫ আসনের যাত্রাবাড়ী-ডেমরা রোডের ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে কিছু দূর যেতেই ডান পাশে চোখে পড়ে একটি বিশাল ব্যানার। বাঁশের সঙ্গে টানানো এ ব্যানারে লেখা আছে- ‘১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস-জাতির পিতাসহ সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি’। ব্যানারের বাঁ পাশে মাঝারি আকারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ছবি। ক্ষুদ্র আকারে দেওয়া হয়েছে ১৫ আগস্ট নিহত সব শহীদের ছবি। আর ডান পাশে সবচেয়ে বড় আকারে দেওয়া হয়েছে মেহেরিন মোস্তফা দিশির ছবি। ছবির সৌজন্য : আহমেদ আহসান, ৬৩ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ। ঢাকা-৫ এলাকায় এমন অনেকের ছবিই এখন শোকের শ্রদ্ধাঞ্জলির নামে আত্মপ্রচার। ডেমরা-স্টাফকোয়ার্টারের রাস্তায় বেশ কয়েকটি তোরণ স্থাপন করা হয়েছে, যা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। এ তোরণের ওপর লেখা আছে- ‘জাতীয় শোক দিবসে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। আসন্ন ঢাকা-৫ উপনির্বাচনে কাজী মনিরুল ইসলাম মনু (বিএ) ভাইকে এমপি হিসেবে দেখতে চাই।’ বাঁ পাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। ডান পাশে মনিরুল ইসলাম মনুর বড় ছবি। মনুর ছবির ওপরে খুব ছোট আকারে দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের ছবি। তোরণের নিচে কমপক্ষে ১০ ফুট আকারে মনুর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছবিতে শোকের আবহ চোখে পড়েনি। ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় এমন বিলবোর্ড ও পোস্টার চোখে পড়ে যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না, মেহেরিন মোস্তফা দিশি, ৭০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আতিকুল ইসলাম আতিক, রিপনসহ ডজনখানেক মনোনয়নপ্রত্যাশীর। কারও ছবি কর্মী-সমর্থকরা সাঁটিয়েছেন।

ধানমন্ডিতে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে অনেক শ্রদ্ধাঞ্জলির পোস্টার ও ফেস্টুন চোখে পড়ে। এর মধ্যে একটা ফেস্টুনে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও কেসি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আলহাজ মো. খসরু চৌধুরীর ছবিটি শোভা পাচ্ছে। ফেস্টুনের প্রায় অর্ধেকজুড়েই তার ছবি। খসরুর এ ছবি খিলক্ষেত, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখানসহ রাজধানীজুড়েই শোভা পাচ্ছে।

একইভাবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বড় বিলবোর্ড সাঁটানো হয়েছে। এখানেও জাতির পিতার চেয়ে সংগঠনের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাবুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামাল এবং বন ও পরিবেশ সম্পাদক রায়হান আহম্মেদের ছবি বড় করে দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সেখানে কিছুটা দেখা গেলেও ১৫ আগস্ট নিহত অন্য শহীদদের ছবি খুবই ছোট। ১৫ আগস্টের শহীদ ছাড়া আরও তিনজনের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে এ বিলবোর্ডে। তাদের কোনো পরিচয় লেখা হয়নি। একইভাবে পল্টন থানা মৎস্যজীবী লীগ নেতা শামীম হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক এস এম মোহনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতার আত্মপ্রচার চোখে পড়ে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে ‘নাইন স্টার যুব সংঘ, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ব্যানারের লেখা একটি ‘প্যানা পোস্টার’। সেখানেও শহীদদের চেয়ে নেতাদের আত্মপ্রচারই বেশি। শুধু দলীয় অফিসই নয়, সরকারি বিভিন্ন অফিসেও এমন আত্মপ্রচার চোখে পড়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ভবনে একটা ব্যানার সাঁটিয়েছেন সিপিই সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম ভুইয়া ও সাধারণ সম্পাদক এ কে এম নজরুল ইসলাম। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যারা শোকের মাসে শ্রদ্ধাঞ্জলির নামে নিজেদের আত্মপ্রচার করেন, জাতির পিতা ও শহীদদের ছবি ছোট করে নিজেদের ছবি বড় করেন তারা বিকৃত মানসিকতার মানুষ। আসলে তারা অন্তরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করেন না। নামেই তারা আওয়ামী লীগ। দলের পক্ষ থেকে বারবার এমন আত্মপ্রচার বন্ধ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু যারা এখনো শোনেননি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর