শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:৪৯

কী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে

গণতন্ত্রে কলঙ্কিত অধ্যায়

------ ড. আলী রীয়াজ

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি

গণতন্ত্রে কলঙ্কিত অধ্যায়

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘বুধবার ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কলঙ্কিত দিন।’ ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন।

সাক্ষাৎকারকালে মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের ভোট সার্টিফাইড করার অনুষ্ঠানে নির্বাচনে পরাজিত  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আহ্বানে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো সে বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে।

ড. রীয়াজ বলেন, আজকের (বুধবার) দিনটি অত্যন্ত কলঙ্কজনক, সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে কলঙ্কজনক একটি দিন বলেই সর্বত্র চিহ্নিত হবে। অনভিপ্রেত এবং অকল্পনীয়ও বলা যেতে পারে। তবে এ ঘটনা যে একেবারেই বিস্ময়কর তা কিন্তু নয়। কয়েক বছর ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে এ দেশের উগ্রপন্থিদের উসকে দিয়েছেন, তাতে এ ধরনের একটি সন্ত্রাসী তৎপরতা ঘটা বিস্ময়কর নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যে কোনো ধরনের সহিংস আচরণে ক্ষমতা বদল করতে চায়, তাকে বলা যায় সন্ত্রাসী তৎপরতা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেপরোয়া হয়ে সেটা উসকে দিয়েছেন। প্রকাশ্যে সমাবেশ করে উসকে দিয়েছেন। আজকের সমাবেশটিও পরিকল্পিত। ট্রাম্প বেশ কদিন ধরেই তার সমর্থকদের আহ্বান জানাচ্ছিলেন ওয়াশিংটন ডিসিতে আসার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর আগে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়নি, এটাই আমরা প্রথম দেখতে পেলাম। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। গণতন্ত্রের জন্য যে বড় রকমের হুমকি তৈরি হলো, তা আমরা খুব স্পষ্টতই বুঝতে পারলাম। চার বছর ধরেই দেখতে পাচ্ছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মধ্যে যে এক ধরনের ভঙ্গুরতা রয়েছে, বিশেষ করে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব ট্রাম্পের মধ্য দিয়ে দেখতে পেলাম আমরা, উগ্রপন্থার যে বিকাশ দেখতে পেলাম, এটা সে সবেরই একটি পরিণতি। এবার তিনি একা নন, সিনেটে এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসেও তার সমর্থক রয়েছে। সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ তার পক্ষে রয়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্ব যে ধরনের আচরণ করেছেন গত চার বছর, বিশেষ করে নির্বাচনের পরে এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে যে তারা দাঁড়াননি তারই পরিণতি এটা। একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য যে তৎপরতা চালানো হয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াল।

প্রশ্ন : এমন আচরণ উসকে দেওয়ার জন্য কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সুযোগ আছে?

আলী রীয়াজ : প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এ মুহূর্তে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের ১৪ দিন আগে এমন অকল্পনীয়-অবিশ্বাস্য ঘটনার কারণে না কংগ্রেস অথবা অন্য কেউ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে সব কাজের একটি দায়মুক্তির বিধি রয়েছে। তবে অনুমান করছি, হয়তো হাউসে তাঁকে ইমপিচমেন্টের জন্য আরেক দফা প্রস্তাব উঠতে পারে। আমি আরও মনে করি, বাইডেন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিচার বিভাগের উচিত হবে এসবের তদন্ত করা এবং সাবেক এই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নিতে পারলেও তাঁর এ আচরণ যে বেআইনি অথবা আইনি সীমার বাইরে ছিল সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে আমেরিকানদের অবহিত করা। তাঁর অপকর্মে যারা সহযোগিতা করেছেন, যারা উসকে দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, সহায়তা করেছেন এ ধরনের সহিংসতা, সন্ত্রাসী তৎপরতায়, বিদ্রোহে মদদ দিয়েছেন তাদেরও চিহ্নিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রশ্ন : ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি ইত্যাদি যেসব উদ্ভট অভিযোগ করেছেন তা সত্ত্বেও জর্জিয়ার সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীরা বিপুল ভোট পেয়েছেন। তা কীভাবে সম্ভব?

আলী রীয়াজ : জর্জিয়াসহ স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক রকমের বিবেচ্য বিষয় থাকে। প্রার্থীদের নিজস্ব এলাকার বিবেচনা থাকে। রিপাবলিকান পার্টির যে সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে এ পার্টিতে আছেন তারা ভাবেন দলের লোকজনকে জেতানো দরকার। এ ধরনের অনেক কিছু বিবেচনায় থাকে। তবে অবশ্যই মি. ট্রাম্পের সমর্থক আছে। আজ ছিল বুধবার, দুপুরের মধ্যে যে সমাবেশ, যে আক্রমণ, যে সন্ত্রাসী তৎপরতা সেসবেও ট্রাম্পের সমর্থনের ব্যাপারটি দেখা গেছে। তারা উগ্রপন্থি এবং টাম্পেরই সমর্থক। তবে এটা খুবই দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক যে সেই লোকগুলো রাজনীতিকে বিবেচনায় রাখছেন না। ব্যক্তি ট্রাম্পের পূজারি হয়েছেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এত বছর পরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন না। জর্জিয়ার নির্বাচন প্রমাণ করল, এখন তারা মনে করেন যে সিনেটেও ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা দরকার, যাতে গত চার বছরের অ-আমেরিকান এবং গণবিরোধী পদক্ষেপগুলো পরিবর্তনে বাইডেন প্রশাসন সক্ষম হয়। জর্জিয়ার ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দীর্ঘদিন যাবৎ রিপাবলিকানদের দখলে ছিল। এই প্রথম সেখানে বাইডেন জিতেছেন এবং ইউএস সিনেটের দুটি আসনেই রিপাবলিকানদের পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। ফলে এর একটা ইতিবাচক দিকও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রশ্ন : ডেমোক্র্যাটদের এ বিজয়ের ক্রেডিট দিতে চাচ্ছে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমস। তারা পর্যালোচনা নিবন্ধে উল্লেখ করেছে, কমলা হ্যারিসের কারণে সাউথ এশিয়ান ও আফ্রিকান-আমেরিকানরা অনেক বেশি সোচ্চার হয়েছেন ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে। আপনার কী মনে হয়?

আলী রীয়াজ : আমার দৃষ্টিতে ক্রেডিট দেওয়া উচিত স্ট্র্যাসি এব্রামকে। তিনি তৃণমূলে জাগরণ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। জর্জিয়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য উইসকনসিন, ইলিনয়, অ্যারিজোনা এসব রাজ্যে ভোটারদের উজ্জীবিত করেছেন দারুণভাবে। ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ৫ জানুয়ারির জর্জিয়ার বিশেষ নির্বাচন প্রমাণ করেছে, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছানোর পর তাদের ভোটের পক্ষে উজ্জীবিত করার বিকল্প নেই। তার সঙ্গে অবশ্যই কমলা হ্যারিসকে রানিংমেট করার বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছে। দক্ষিণাঞ্চলের কোনো স্টেট থেকে এই প্রথম একজন কৃষ্ণাঙ্গ ইউএস সিনেটে জয়ী হলেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন : কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের দখলে আসায় বাইডেনের কাছে আমেরিকানদের পরিবর্তনের প্রত্যাশা বিশেষ করে ইমিগ্রেশন ইস্যু, মুসলিম নিষিদ্ধ, আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ পুনরুদ্ধার ইত্যাদি ব্যাপার কি দ্রুত সমাধান পাবে বলে মনে করেন?

আলী রীয়াজ : কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় অনেক এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। তবে মনে রাখতে হবে, যত বেশি জনসমর্থন তত বেশি চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বও বেড়ে গেছে মানুষের প্রত্যাশা বাড়ায়। রিপাবলিকানদের পরাজিত করেছে বাইডেনের দল- এটি বড় ঘটনা এবং ডেমোক্র্যাটদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের মধ্যে যে বিবাদ-বিভক্তি তৈরি হয়েছে তার শান্তিপূর্ণ সমাধান। যারা বিভক্তি আর উগ্রবাদ উসকে দিয়েছে তাদের মোকাবিলা করতে হবে আইনিভাবেই। পাশাপাশি বিভক্তি তৈরি সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমাধানের পথে এগোতে হবে। পররাষ্ট্র ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসন চাইলেই তো তৎক্ষণাৎ কিছু করতে পারবে না। কংগ্রেস চাইলেও করতে পারবে না। পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। চীনের উত্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি অনেক দিন ধরেই। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও পরিবর্তন ঘটেছে। এশিয়ায়ও অর্থনীতির একটা পরিবর্তন এসেছে। সব মিলিয়ে সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে যুক্তরাষ্ট্রের যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন পররাষ্ট্রনীতি, নতুন করে নিজকে নেতৃত্বে নিয়ে আসার যে চেষ্টা তা সহজ নয়। এগুলো চাইলেই এক দিনে হবে, ছয় মাসে হবে এমন আশা করাও ঠিক নয়।

প্রশ্ন : মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় সম্প্রতি ট্রাম্পের যেসব উদ্যোগ দেখা গেছে তার কোনো প্রভাব কি বাইডেন প্রশাসনে পড়বে অথবা বাইডেন কি সেগুলো অব্যাহত রাখবেন?

আলী রীয়াজ : ট্রাম্পের শেষ দিনগুলোয় যেসব শান্তিচুক্তি ও শান্তির উদ্যোগ দেখতে পেয়েছি সেগুলো বিবেচনাপ্রসূত হয়েছে অথবা সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক হয়েছে- এমনটি বলা যাবে না। তার কারণ হচ্ছে, এতে ইসরায়েলের যে বড় ধরনের শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ হলো তা শান্তি প্রক্রিয়ার অনুকূল কি না, খুবই বড় ধরনের প্রশ্ন। তাই বাইডেন প্রশাসনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে এসব বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে অনেক কিছু ঢেলে সাজাতে হবে। ইরানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যখন নতুন করে ভাবনাচিন্তা করবে তখন ইসরায়েল কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, ইসরায়েলের সঙ্গে তারা যে চুক্তি করেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে তারা কীভাবে দেখে- এসব বিবেচনায় রাখতে হবে।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশনব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে সোয়া কোটি কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়ার ব্যাপারে বাইডেনের অঙ্গীকার প্রসঙ্গে আপনি কতটা আশাবাদী?

আলী রীয়াজ : যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির একটি বড় রকমের সংস্কার দরকার। কমপ্রিহেনসিভ ইমিগ্রেশন রিফর্ম দরকার। এর চেষ্টা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা ২০১৩ সালে। কিন্তু সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা তা সমর্থন করেননি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি আশাবাদী বড় ধরনের একটি সংস্কারের ক্ষেত্রে ১০০ দিনের মধ্যে না হলেও বাইডেন প্রশাসন একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

প্রশ্ন : বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক গড়ার জন্য বাংলাদেশের এ মুহূর্তে কী কী করণীয়?

আলী রীয়াজ : প্রথম কথা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো কি না সে প্রশ্ন আসতে পারে। আশা করা হচ্ছে বাইডেন প্রশাসন গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের ওপর গুরুত্ব দেবে, তাই যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য হতে পারে। ক্ষমতাসীনদের উচিত সে জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সংশোধনের পদক্ষেপ নেওয়া।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর