শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:৩৮

সংসদে প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

করোনায় মন্দা এড়াতে পেরেছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনায় মন্দা এড়াতে পেরেছে বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনা পরিস্থিতিতে অন্য অনেক দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও বাংলাদেশ তা অনেকটাই এড়াতে পেরেছে।

গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনের তৃতীয় দিনে টেবিলে উত্থাপিত প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, কভিড-১৯ মহামারীর উদ্ভূত সংকট থেকে জনগণকে রক্ষা করতে ৩ কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিগগিরই করোনার ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম শুরু হবে।

বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ : জাতীয় পার্টির এমপি রওশন আরা মান্নানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ ট্যাবল ২০২১’ অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। এ রিপোর্টে মূলত সামনের বছর ও আগামী ১৫ বছরে বিশ্বের কোন দেশের অর্থনীতি কী হারে বাড়বে তারই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। তিনি বলেন, ২০২০ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। শেখ হাসিনা বলেন, খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ দশম। বাংলাদেশ আজ চালে উদ্বৃত্ত দেশ। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে সপ্তম, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ।

দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠনে সামগ্রিক কর্মপন্থা নির্ধারণ : সরকারি দলের আহসানুল ইসলাম টিটুর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কভিড-১৯ মহামারীর উদ্ভূত সংকট মোকাবিলা, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরুজ্জীবিত করে অর্থনীতি দ্রুত পুনর্গঠন এবং অর্থনীতির গতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি একটি সামগ্রিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছে। এর চারটি প্রধান কৌশলগত দিক হলো : ১. সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা। এ ক্ষেত্রে কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং বৈদেশিক সফর ও বিলাসবহুল ব্যয় নিরুৎসাহিত করা। ২. ব্যাংকব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্পসুদে কতিপয় ঋণ সুবিধা প্রবর্তন করা, যাতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরুজ্জীবিত হয় এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণœ থাকে। ৩. হতদরিদ্র সাময়িক কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ডে নিযুক্ত জনগণকে সুরক্ষা দিতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি করা। ৪. বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড দ্রুত পুনর্জীবিত করার লক্ষ্যে এ কৌশলটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে মুদ্রাস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তিনি আরও বলেন, কভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নজিরবিহীন বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, যা থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। তবে শুরু থেকেই আমাদের সরকার সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।

জীবন ও জীবিকা রক্ষায় ২১ প্রণোদনা প্যাকেজ : একই প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতি ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব বিবেচনায় রেখে ইতিমধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে, যেখানে যথাযথ কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন মেয়াদকাল হবে জুলাই, ২০২০ থেকে জুন, ২০২৫। তিনি বলেন, সরকার করোনাভাইরাসের সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন সেক্টরের, শ্রেণির ও পেশার মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যা দেশের মোট জিডিপির ৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। এ প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর মধ্যে রয়েছে- রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য বিশেষ তহবিল হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকা, ক্ষতিগ্রস্তু শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা হিসেবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র (কুটিরশিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত ইডিএফের সুবিধা বাড়ানো বাবদ ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ সম্মানী হিসেবে ১০০ কোটি টাকা, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অথবা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৭৫০ কোটি টাকা, বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ বাবদ ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি বাবদ ২৫১ কোটি টাকা, লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ বাবদ ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বৃদ্ধি বাবদ ৮১৫ কোটি টাকা; ঘরহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ বাবদ ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, বোরো ধান ও চাল কেনা কার্যক্রম বাবদ ৮৬০ কোটি টাকা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম বাবদ ৩২ হাজার ২২০ কোটি টাকা, কৃষি ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কৃষি পুনরর্থায়ন স্কিম বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা, নিম্ন আয়ের পেশাজীবী কৃষক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পুনরর্থায়ন স্কিম বাবদ ৩ হাজার কোটি টাকা, কর্মসৃজন কার্যক্রম হিসেবে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক ও পিকেএসএফের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি টাকা, বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের এপ্রিল-মে ২০২০ মাসে স্থগিতকৃত ঋণের আংশিক সুদ মওকুফ বাবদ সরকারের ভর্তুকি হিসেবে ২ হাজার কোটি টাকা প্রভৃতি।

সরকারি দলের আহসানুল হকের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা আরও বলেন, কভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নজিরবিহীন বিরূপ প্রভাব ফেলেছে যা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। তবে শুরু থেকেই আমাদের সরকার সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, যার ফলে এ পর্যন্ত কভিড আক্রান্তের সংখ্যা, মৃতের হার ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অধিকতর সাফল্য দেখাতে পেরেছে।

জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনাকালে দেশে এসে আটকে পড়া ও চাকরিচ্যুত প্রবাসীদের নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

ডেল্টা প্ল্যানে খরচ হবে ২ হাজার ৯৭৮ বিলিয়ন টাকা : জাতীয় পার্টির মসিউর রহমান রাঙ্গার প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর জন্য মোট খরচ হবে ২ হাজার ৯৭৮ বিলিয়ন টাকা। ডেল্টা ফান্ডের কাঠামো ও ফান্ড পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।


আপনার মন্তব্য