শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:১৯

ভ্যাকসিন যুগে বাংলাদেশ

আজ ঐতিহাসিক দিন : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভ্যাকসিন যুগে বাংলাদেশ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নির্মূলে ভ্যাকসিন যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। রাজধানীতে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বহু প্রতীক্ষিত টিকাদান শুরু হয়েছে। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আজ ঐতিহাসিক দিন। কেননা, অনেক দেশ এখনো ভ্যাকসিন পায়নি। সেখানে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ভ্যাকসিন আমদানি করেছে সরকার। রুনু টিকা নিতে এলে প্রধানমন্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ভয় পাচ্ছ না তো?’ রুনু মাথা নেড়ে  বললেন, ‘না’। এরপর তিনি টিকা নেন। টিকা নেওয়ার পর রুনুর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুস্থ থাকো, ভালো থাকো’। প্রধানমন্ত্রীর কথা শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে টিকা নেওয়ার নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করেন রুনু। এরপর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে টিকা গ্রহণকারী অন্য চারজনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর এমন কথোপকথন হয়েছে। পাঁচজনকে হাসিমুখে ভ্যাকসিন নিতে দেখে প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখান। তবে তার মন্তব্য ‘আগে নিলে বলবে, আগে নিল, কাউকে দিল না; সবাইকে দিয়ে নিই, তারপর নেব।’ গতকাল  রুনুসহ ২৬ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে।  উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের সুরক্ষা বিবেচনায় সরকার আগে থেকেই দেশে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে আসার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। আমরা সময়মতো ভ্যাকসিন আনতে পেরেছি, এখন তা মানুষের মধ্যে সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারব। এ ভ্যাকসিনের মাধ্যমে দেশবাসী করোনামুক্ত হবে। সারা দেশেই পর্যায়ক্রমে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সব কিছু স্থবির হয়েছিল। আমাদের অর্থনীতিও স্থবির হয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে আমরা এগিয়ে গেছি। এক সময় করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের কাজ চলছিল। আমরা তখন খোঁজ নিচ্ছিলাম কোথা থেকে দ্রুত করোনার টিকা সংগ্রহ করা যায়। তখন আমরা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার সন্ধান পাই। আমরা বেক্সিমকোকে দ্রুত চুক্তি করতে বলি। টিকার জন্য আমরা ১ হাজার কোটি টাকা আলাদা বরাদ্দ রেখেছিলাম। বলেছিলাম, যত টাকা লাগবে দেব। দেশের মানুষের সুরক্ষাটাই আমাদের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন করোনা দেখা দিল, এমন আতঙ্ক দেখা দিল, মায়ের লাশ পর্যন্ত ধরল না সন্তান, বাবার লাশ ফেলে দিল। তখন স্বাস্থ্যকর্মীসহ কিছু মানুষ এগিয়ে এসেছিল। আজকের দিনে তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, মানুষের জন্য মানুষ, এই ভেবে তারা কাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য, কিছু লোক থাকে, সব কিছুতে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। তারা মানুষের জন্য কোনো কাজ করে না। শুধু নেতিবাচক কাজ করে। ‘কিছু ভালো লাগে না’, এ ধরনের রোগ তাদের মধ্যে আছে। তাদের সমালোচনা যত হয়েছে, তত দ্রুত কাজ করার প্রেরণা পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, একটা শ্রেণি ভ্যাকসিন নিয়ে সমালোচনা করেছে, সমালোচনা যত হয়েছে, কাজের ততো প্রেরণা পেয়েছি। যারা সমালোচনা করে তাদেরও টিকা দেওয়া হবে, যাতে তারা সুস্থ থাকে। কারা আগে টিকা পাবেন সংসদে জানালেন প্রধানমন্ত্রী : সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাদের করোনার টিকা দিতে চায় তার তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১ কোটি ৬৯ লাখ ৩৭ হাজার ৯৭৩ জনকে করোনার টিকা দেওয়া হবে। গতকাল জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি আহসানুল ইসলাম (টিটু)-এর এ সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা এ তথ্য জানান। ভারত থেকে ইতিমধ্যে উপহারের ২০ লাখ ও সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা ৫০ লাখ টিকা দেশে পৌঁছানোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেরামের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যে সব টিকা পাওয়া যাবে। এর বাইরে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও টিকা কেনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। জাতীয় পার্টির মসিউর রহমান রাঙ্গার প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান জানান, বিভিন্ন দেশ, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এমডিবি) ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে কভিড-১৯ মোকাবিলায় ১ হাজার ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঋণ সুবিধা ১ হাজার ৬৪০ মিলিয়ন ডলার এবং অনুদান ১৭৭ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে ১ হাজার ৫২০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড় হয়েছে। কভিড-১৯ মোকাবিলায় আগামীতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও ফ্রান্সের কাছ থেকে ১ হাজার ৯১৮ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক : ‘তাদের আগে ভ্যাকসিন দিয়ে তারপর আমরা নেব।’ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেনের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেকে ভ্যাকসিন নিয়ে অনেক সন্দেহ করেছেন, অনেক কথা বলেছেন। বিরূপ প্রচারও অনেকে করেছেন। তাদের আগে ভ্যাকসিন দিয়ে তারপর আমরা নেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি যখন দেশব্যাপী ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু হবে তখন আশা করছি অনেকেই ভ্যাকসিন নেবেন। আমাদের কাছে অনেক মন্ত্রী, এমপি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইচ্ছা পোষণ করেছেন। আশা করছি তারা সে সময় ভ্যাকসিন নেবেন। দেশে এখন ৭০ লাখ ভ্যাকসিন আছে। এ মুহূর্তে ভারত ছাড়া অনেক দেশের কাছেই ভ্যাকসিন নেই। মে-জুনের মধ্যে কোভ্যাক্সের ভ্যাকসিন চলে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। টিকা গ্রহণ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘টিকা নিয়ে অনেকে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাদের ভুল প্রমাণ করতেই আমি টিকা নিয়েছি। টিকা নেওয়ার ১৫ মিনিট পরেই আমি এসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি। টিকা নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে মানসিকভাবে উজ্জীবীত থাকতে হবে।’ টিকা গ্রহণ করেছেন মানসের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা ডা. অরূপ রতন চৌধুরী। তিনি বলেন, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অযথা চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমি টিকা নিয়েছি আপনারাও নিন।’ টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যাচাইয়ে আজ পাঁচটি হাসপাতালের ৪০০ থেকে ৫০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে টিকা দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তাদের টিকা দেওয়ার পর এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে শুরু হবে টিকাদান কমর্সূচি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর