শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৫২

ভাষার মর্যাদা দিলেই শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে

রফিকুল ইসলাম

ভাষার মর্যাদা দিলেই শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে

আমি ১৯৪৪ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা। আমার আব্বা রেলওয়ে হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন। আমরা ফজলুল হক হলের গেটের উল্টো দিকে রেল কোয়ার্টারে ১৯৪৪ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ছিলাম। ১৯৪৮ সালে যখন বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু হয়, তখন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদর দফতর ছিল ফজলুল হক হল মিলনায়তনে। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। ফজলুল হক হল, ঢাকা হল, কার্জন হল, বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন, খেলার মাঠ-এসব এলাকা আমাদের খেলার বা বেড়ানোর জায়গা ছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয় এত বড় ছিল না এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও ছিল কম। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আমাদের অবাধ গতিবিধি ছিল, ফলে ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই অর্থাৎ ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলন প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হলে বিভিন্ন সংগঠনের যেসব কর্মী এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা বিশ্বাস করতেন পাকিস্তানকে যদি প্রগতিশীল, আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয় তাহলে পাকিস্তানের স্বার্থেই (পূর্ব বাংলার স্বার্থে তো বটেই) দুটি রাষ্ট্রভাষা চাই। সে জন্য ১৯৪৮ সালে যখন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয়, তখন শুরুতে তাদের দাবি ছিল-পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক ভাষা বাংলা চাই। পরে ধীরে ধীরে তা রূপান্তরিত হয় পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে। ১৯৫২ সালে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা দুটি হতেই হবে-একটি উর্দু, অপরটি বাংলা; কেবল উর্দু নয়। ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের শুরু থেকেই সংগ্রামী রূপ নেয়। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একদল ছাত্রের সমাবেশ ঘটেছিল। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনও দানা বেঁধে উঠেছিল, যে কোনো সরকারের পক্ষে ১৯৫২ সালের এ নতুন জোয়ার দাবানো কঠিন ছিল। আন্দোলন চলাকালে পুলিশের লাঠিচার্জ, ছাত্রদের পিকেটিং, জনসভা, কালো পতাকা উত্তোলন, শহীদ মিনার তৈরি, উদ্বোধন, গোরস্তানে শহীদদের মাতা-পিতার সমাবেশ-এসব ছবি আমি তুলেছিলাম। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি যখন গুলি চলে, তখন আমি শহীদ মিনারের কাছাকাছি জায়গায় ছিলাম। গুলির শব্দ শুনে আশ্রয় নিয়েছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাঝের গাড়ি-বারান্দায়। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব, ইনি একসময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন, আর ছিলেন কমরুদ্দিন আহমদ-ইনি বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি যে সভা হয়, তার ছবিও তুলেছিলাম, ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য ১০ জন মিছিল করে সারিবদ্ধভাবে তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন-সে ছবিও আমার তোলা আছে। ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা কলাভবনের ওপরে কালো পতাকা তোলা হয়, তার ছবিও আমি তুলেছি। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যখন প্রথম শহীদ বরকতের মা গেলেন গোরস্তানে, তাঁরও ছবি আমার তোলা। আরও অনেক ছবি তুলেছি। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলি চলার পর পরই হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানুদ্দীন খান জাহাঙ্গীর এবং আমি-তিনজনে বেগমবাজারের এক প্রেসে গিয়ে একটি লিফলেট ছাপানোর ব্যবস্থা করি, সে লিফলেট আমরা প্রচার করেছিলাম। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষার সর্বত্র ব্যবহার আমরা চেয়েছিলাম। সে আশা পূরণ হয়নি। আমরা অনেকেই ভাষার মর্যাদা অনুভব করি না। ভাষার মর্যাদা দিলেই শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর