শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৩৭

মাতৃভাষা শেখাও শ্রমসাধ্য কাজ

শামসুজ্জামান খান

মাতৃভাষা শেখাও শ্রমসাধ্য কাজ
Google News

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলায় বক্তৃতা করার সময় কখনো অন্য ভাষার শব্দ মেশান না। বাংলা ভাষায় আগে থেকে চালু হওয়া বিদেশি শব্দ ব্যবহার করেন কিন্তু ইংরেজি আর বাংলা মিলিয়ে বলেন না। বড় মাপের মানুষরা ভাষাকে এতটা গভীরভাবে আত্মস্থ করেন যে, তাদেরকে দু-তিন ভাষা মিলিয়ে কথা বলতে হয় না। অথচ, এখন আমরা অনেকেই বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলি। এটা একেবারেই অনুচিত। একাধিক ভাষার মিশ্রণে কথনভঙ্গি নষ্ট হয়ে যায়। এতে আমাদের ভাষার সৌন্দর্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই ভাষার প্রাণশক্তি শেষ পর্যন্ত থাকবে না। একটি জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার মৌলিক অংশ হলো ভাষা। এই ভাষা বিধৃত জাতিসত্তার ওপর নির্ভর করেই সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ। পাকিস্তান আমলের ষাটের দশকে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলা একাডেমিতে আসতেন। তারা এতটা যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে বাংলা শিখতেন, যে চমৎকার বাংলা বলতে পারতেন। চীনের প্রশিক্ষণার্থীদের বাংলা শেখায় প্রায় কোনো ত্রুটিই থাকত না। অন্য দেশের শিক্ষার্থীরাও যথাসাধ্য চেষ্টায় বাংলা ভাষায় দক্ষতা অর্জন এবং অনুবাদে সুযোগ্য হয়ে উঠতেন। অথচ, মাতৃভাষা হলেও আমরা সঠিকভাবে বাংলা বলতেও পারি না, লিখতেও পারি না। এটা দুঃখজনক। ভাষা শিক্ষা, সেটা মাতৃভাষা হলেও শ্রমসাধ্য কাজ। একজন রুশ গবেষক রাইসা ভালুয়েবা আমাদের সঙ্গে বসে গবেষণামূলক কাজ করতেন। তিনি আমাদের বলতেন, ‘তোমরা বাঙালি। বাংলা তোমাদের মাতৃভাষা। কিন্তু, তোমরা কেন মাতৃভাষায় কথা বলা এবং লেখালেখির সময়ে এত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করো? আমরা তো বিদেশি ভাষা শিখলে শুদ্ধভাবে শিখি এবং আমাদের নিজের ভাষাও শুদ্ধভাবে শিখি, লিখি এবং বলি। যেনতেনভাবে ভাষা শেখাও যায় না, মানসম্পন্নভাবে বলা বা লেখাও যায় না। তোমাদের ভাষা চর্চা খুবই ত্রুটিপূর্ণ। এ ব্যাপারে তোমাদের যত্নবান হওয়া উচিত।’ রাইসা ভালুয়েবা যথার্থই বলেছিলেন। আমাদের ভাষার দুর্বলতা ক্রমশ বাড়ছে। দুই ভাষা মিলিয়ে কথা বলার কারণে অনেক দেশই দুর্বল হয়ে গেছে। যেমন ফিলিপাইন। এ ব্যাপারে তরুণদের সচেতন হতে হবে। বাংলা ভাষায় বাংলা শব্দই ব্যবহার করতে হবে। বাংলা ভাষায় কিছু ইংরেজি, আরবি, পর্তুগিজ শব্দ ঔপনিবেশিক আমলে ঢুকে গেছে, সেটা আমাদের সাহিত্য ও ভাষারই অংশ হয়ে গেছে। এখন বাংলার সঙ্গে নতুন নতুন ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে উদ্ভটভাবে কথা বলা অনুচিত। আমাদের শিক্ষকদেরও উচিত ক্লাসে পড়ানোর সময় মাতৃভাষায় কথা বলা ও বলতে উৎসাহিত করা। ঔপনিবেশিক আমলে যে সব বিদেশি এখানে আসতেন এবং বাংলা শিখতেন, উইলিয়াম কেরি হোক বা অন্য বিদেশিরা- তারাও বিশুদ্ধ বাংলা বলার চেষ্টা করতেন। বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার মিশ্রণ ঘটাতেন না। এখনো অনেক বিদেশি আছেন যারা বাংলা শিখেছেন, তারাও এটা পছন্দ করেন না। বিদেশিরা শুদ্ধভাবে বাংলা বলছেন, আবার অন্য ভাষায়ও কথা বলছেন। অথচ, মাতৃভাষা হওয়ার পরও আমরাই শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে পারছি না! এটা লজ্জার। এই বাংলা ভাষার জন্যই আমাদেরকে রক্ত দিতে হয়েছিল। বিশ্বের অন্য কোনো ভাষাভাষীকে এতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। বাংলা সাহিত্যের কথা বললে, এর বিকাশ খুব ভালোও নয়, খুব খারাপও নয়। বড় মাপের বা বিশ্বমানের সাহিত্য এখানে এখন পর্যন্ত খুব একটা উপলব্ধি করতে পারছি না। অবশ্য বিশ্বমানের সাহিত্য খুব সহজে হয় না। এর জন্য সময় দিতে হয়। নতুন প্রজন্মের লেখকরা আসছেন। অনেকের মধ্যেই সম্ভাবনা আছে। তাদের মধ্যে থেকেই হয়তো বড় মাপের এক বা একাধিক সাহিত্যিক বেরিয়ে আসবে। আমাদের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত আলীর মতো সাহিত্যিক ছিলেন। আরও অনেকেই ছিলেন যারা আমাদের সাহিত্যকে অনেক সমৃদ্ধ করেছেন। সেই জায়গাটায় নতুন প্রজন্ম আসবে। সেটা ১০ বছর বা ১০০ বছর পরও আসতে পারে। বর্তমান সময়টা অত্যন্ত জটিল, জঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। বিশ্বে নানারকম সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই অবস্থার মধ্যে নিজেকে স্থীর রেখে যিনি সাহিত্য চর্চা করতে পারবেন তিনিই সফল হবেন।

লেখক : বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক। অনুলেখক : শামীম আহমেদ।

 

এই বিভাগের আরও খবর