শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ মার্চ, ২০২১ ২৩:৩৮

আইসিইউর জন্য হাহাকার

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে ফাঁকা মাত্র পাঁচটি হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে রোগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

আইসিইউর জন্য হাহাকার
ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি রোগী -বাংলাদেশ প্রতিদিন

রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সংকট চরমে। আইসিইউয়ের জন্য হাহাকার করছেন রোগীর স্বজনরা। আইসিইউয়ের জন্য ঘুরতে হচ্ছে হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে। গতকাল রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে মাত্র পাঁচটি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৪৫টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল।

গত বছর করোনা রোগী বাড়লে আইসিইউ নিয়ে হাহাকার দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এবারও বদলায়নি চিত্র। রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় রাজধানীর পাঁচটি সরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানকে কভিড চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। পরিস্থিতি সামলাতে সাধারণ শয্যার পাশাপাশি আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গতকাল কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে কোনো আইসিইউ ফাঁকা ছিল না। সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে একটি, শেখ রাসেল গ্যাসট্রোলিভার হাসপাতালে মাত্র দুটি ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে দুটি আইসিইউ ফাঁকা ছিল। রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত ৪৫টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল। এর মধ্যে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আটটি, আসগর আলী হাসপাতালে ১২টি, স্কয়ার হাসপাতালে ছয়টি, ইউনাইটেড হাসপাতালে সাতটি, এভারকেয়ার হাসপাতালে চারটি, ইম্পালস হাসপাতালে চারটি, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চারটি আইসিইউ ফাঁকা ছিল। আইসিইউ শয্যা ফাঁকা না থাকায় রোগী নিয়ে হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হচ্ছে স্বজনদের। তবু মিলছে না আইসিইউ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন মরিয়ম বেগম (৬১)। হঠাৎ রোগীর পরিস্থিতি খারাপ হলে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন বলে জানান চিকিৎসকরা। মরিয়ম বেগমের ছেলে সৈকত হায়দার বলেন, ‘আইসিইউয়ের জন্য সরকারি সব হাসপাতালে যোগাযোগ করেছি, কোনো হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা মেলেনি। বেসরকারিতেও আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। এমপি, মন্ত্রীকে দিয়ে ফোন করিয়ে আইসিইউয়ের ব্যবস্থা করানোর পরিস্থিতি আমাদের নাই। পরবর্তীতে এই হাসপাতালেই হাই ফ্লো অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে মাকে।’ চট্টগ্রামে সরকারি হাসপাতালে ১১টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল। সরকারি হাসপাতালের মধ্যে চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয়টি এবং বিআইআইটিতে পাঁচটি শয্যা ফাঁকা ছিল। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ কয়েক প্রকারের করোনাভাইরাসের ভেরিয়েন্ট। প্রথম করোনাভাইরাসের যে ভেরিয়েন্ট সারা বিশ্বে সংক্রমণ ঘটিয়ে ছিল সেটি কভিড-১৯। এরপর দ্বিতীয় ভেরিয়েন্টের নাম ইউকে ই-১১৭, তৃতীয় ভেরিয়েন্টের নাম ইউকে ই-১৫২৫, চতুর্থ সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট ই-১৩৫, পঞ্চম ভেরিয়েন্ট ব্রাজিলিয়ান পি-১। যে টিকাগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলো বেশিরভাগ ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু কোনো কোনো ভেরিয়েন্টের ব্যাপারে কাজ করে না বা কাজ করে কি না এটা এখনো প্রমাণিত হয়নি। তাই টিকা নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় জোর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ও দেশে নতুন ভেরিয়েন্টের কারণে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। করোনাভাইরাসের জিন বিশেষণে নতুন দুটি ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে। যার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অত্যধিক সংক্রমণকারী ভেরিয়েন্টের মিল রয়েছে। এবার অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও করোনা গবেষক ডা. তুষার মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত বছরের জুন-জুলাইতে করোনা আক্রান্ত সর্বোচ্চ রোগী ছিল। তখন আমার চিকিৎসা দেওয়া ১০০ জন রোগীর মধ্যে তিনজনকে হাসপাতালে পাঠাতে হতো। অথচ এই কয়েক দিনে ১০০ জন রোগীর ২০ জনকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। এসব রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ায় আইসিইউ সাপোর্টও লাগছে। যে পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিয়ে এতদিন রোগী সুস্থ করে তুলেছি এখন আর তা কাজ করছে না। করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট আসায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রোগীদের জন্য আইসিইউয়ের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে তরুণদের হার বেশি। তাই সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।’ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রোগী শনাক্তের হার ছিল ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। হঠাৎ করেই পরের দিন ১ মার্চ শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩১। গতকাল করোনা আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৬৭৪ জন, মারা গেছেন ৩৯ জন। শনাক্তের হার ছিল ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। গতকাল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিন হাজার ৪২৫ জন। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৪৮ জন।

১১০ দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ, ১০২ দিনে সর্বাধিক মৃত্যু : দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৩ হাজার ৬৭৪ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত পাঁচ দিন ধরেই দৈনিক করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের ওপরে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৩৯ জন, যা ১০২ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু। এ ছাড়া গতকাল সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষের দেহে, যা ১১০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হার। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, আগের সপ্তাহের তুলনায় গত সপ্তাহে (২১ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ) ২৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোয় রোগী শনাক্ত বেড়েছে ৮৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে মৃত্যু বেড়েছে ৪২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪ হাজার ৬৬৪টি নমুনা পরীক্ষায় সংক্রমণ শনাক্ত হয় ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষের দেহে। সর্বশেষ এর চেয়ে বেশি (১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ) সংক্রমণ হারের তথ্য জানানো হয়েছিল গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ এর চেয়ে বেশি মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছিল গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর। সেদিন ৪০ জনের মৃত্যু হয়। গত এক দিনে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৯৭১ জন।

গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে মোট করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৫ লাখ ৯১ হাজার ৮০৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯২২ জন ও মারা গেছেন ৮ হাজার ৮৬৯ জন। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯০ দশমিক ২২ শতাংশ ও মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত এক দিনে মারা যাওয়া ৩৯ জনের মধ্যে ২৪ জন ছিলেন পুরুষ ও ১৫ জন নারী। সবার মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে। বয়স বিবেচনায় মৃতদের মধ্যে ২৫ জনই ছিলেন ষাটোর্ধ্ব, ১০ জন ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব, একজন চল্লিশোর্ধ্ব ও তিনজনের বয়স ছিল ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ২৮ জন ঢাকা, পাঁচজন চট্টগ্রাম, দুজন রাজশাহী, দুজন খুলনা এবং একজন করে সিলেট ও রংপুর বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। বাংলাদেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্তের তথ্য জানানো হয় ও ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদফতর।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর