শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ মে, ২০২১ ২৩:১৭

যাদের দলিল নষ্ট হয়েছে তাদের কী হবে?

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

যাদের দলিল নষ্ট হয়েছে তাদের কী হবে?
Google News

ধর্মব্যবসায়ীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া আক্রমণকালে যেসব অসমাধানযোগ্য ধ্বংস করেছে তার মধ্যে রয়েছে ভূমি রেজিস্ট্রেশন এবং এসিল্যান্ডের অফিসে রক্ষিত মহামূল্যবান দলিলপত্র যেগুলো নতুন করে সৃষ্টি করা বা মেলানো অসম্ভব বলা ভুল হবে না।

ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে যেসব দলিল থাকে তার দ্বিতীয় কোনো কপি সাধারণত অন্যত্র রাখা হয় না বিধায় সেই দলিলগুলোই জমি মালিকানার একমাত্র মৌলিক প্রমাণ। বিধায় এগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে ধর্মান্ধরা যে অপূরণীয় ক্ষতি করল তার সমাধান কীভাবে হবে সেটি সংশ্লিষ্ট সবাইকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করতে বাধ্য। তাদের তান্ডব এটাও প্রমাণ করে যে, দেশের এবং জনগণের স্বার্থের প্রতি ন্যূনতম সহমর্মিতা এই ধর্মান্ধদের নেই। এ ধরনের ঘটনা পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘটিয়েছিল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। দস্যু সৈন্যরা বহু ভূমি রেকর্ড অফিস জ্বালিয়ে দিয়ে লাখ লাখ দুষ্প্রাপ্য ভূমি দলিল ধ্বংস করে দিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর জমি বেদখলের নিদারুণ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। দলিলের অভাবে পেশিশক্তিই হয়ে পড়েছিল জমি দখলের পন্থা। যার গায়ে বেশি শক্তি সে-ই লুট করেছে অন্যের জমি। লুট হয়েছে বহু হিন্দুর জমি এবং সেসব মানুষের জমি যারা বাড়ি খালি ফেলে রেখে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। যেসব পাকিস্তানি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, দলিলের শূন্যতার কারণে সেসব সম্পত্তির জন্য ভুয়া দলিল তৈরির হিড়িক পড়ে গিয়েছিল, যার জের আজও শেষ হয়নি। শুধু পাকিস্তানিদের নয়, ভুয়া দলিল তৈরি করা হয়েছিল হাজার হাজার সম্পত্তির বিষয়ে। কেননা সেসব সম্পত্তির দলিল ধ্বংস করা হয়েছিল বলে ভুয়া দলিলগুলো চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরসহ বাংলাদেশের সর্বত্র জমি দখলের এবং ভুয়া দলিল তৈরির হিড়িকের মধ্য দিয়ে রাতারাতি তৈরি হয়েছিল বেশকিছু সম্পদশালী লোক যাদের একমাত্র পুঁজি ছিল ভূমিদস্যুতা। বহু নিম্নআয়ের মন্দা প্রকৃতির লোক রাতের অন্ধকারেই হঠাৎ আলাউদ্দিনের চেরাগের জোরে কোটিপতিতে পরিণত হয়েছিল এবং অন্যদিকে বহু প্রকৃত ভূমি মালিক তাদের জমি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে পথে বসেছিল। যেসব দলিল পাকিস্তানি দস্যুরা পুড়িয়ে ফেলেছিল সেগুলো নতুন করে তৈরি করার চেষ্টা হলেও বহুলাংশে সেই চেষ্টা সফল হয়নি, বরং ভুয়া দলিলই এবং জবরদখলদাররাই প্রাধান্য পেয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিন্তু একই ধরনের ঘটনা ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। শোনা যাচ্ছে এরই মধ্যে ভুয়া দলিল তৈরি এবং জবরদখলের পাঁয়তারা শুরু হয়ে গেছে। সরকার নিশ্চয় তা প্রতিরোধের পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু হাজারও দলিল পুড়ে যাওয়ার ফলে এ কাজ মোটেও সহজসাধ্য হবে না। এ দুঃসাধ্য কাজের জন্য প্রচুর দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মী, কর্মকর্তার প্রয়োজন হবে। রাজকোষে যথেষ্ট পয়সা থাকলেও এত অধিকসংখ্যক দক্ষ কর্মী/কর্মকর্তা পাওয়া কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। এসিল্যান্ডের অফিসে থাকে মিউটেশন বা নামজারির রেকর্ড যেগুলো জমি মালিকানার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সেগুলোও পুড়িয়ে ফেলেছে নব্য পাকিস্তানি হায়েনারা, অর্থাৎ ধর্ম ব্যবসায়ীরা, এদের মধ্যে কয়েকজন আবার বখতিয়ার খিলজি স্টাইলে ঘোড়ায় চরে তরবারি হাতে এসেছিল। ইসলাম ধর্মের রক্ষক বলে দাবি করে এরা কতটুকু ধর্মবিরোধী কাজ করেছে সেই জবাব দিতে পারবেন প্রকৃত ধার্মিক লোকেরা। ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে জনগণের যে ক্ষতি এই দস্যুরা করলেন তার কারণে এদের অনেকেরই জেল জরিমানা হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু যাদের মহামূল্যবান দলিল ধ্বংস হয়ে গেল তাদের সমস্যা তো আর দস্যুদের জেল জরিমানার ফলে সমাধান হবে না। শুধু দলিল ধ্বংস করেই এসব ধর্মের মুখোশ পরা হারমাদরা ক্ষান্ত হয়নি তারা আরও বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য স্মৃতিও ধ্বংস করেছিল, যার মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বহু স্মৃতি যা আর কোনোদিনও উদ্ধার করা যাবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া গোটা উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক জগতে এক গর্বিত নাম আর সেই গর্বের অন্যতম কারণ এটি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তির জন্মস্থান। এ সাংস্কৃতিক সভ্যতায় ভরপুর অঞ্চলটি কীভাবে ধর্ম ব্যবসায়ীদের দখলে গেল তা গবেষণার বিষয় বৈকি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি ধ্বংসের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আর্যদের দ্বারা মহেনজোদারো হরপ্পার সভ্যতা ধ্বংস করা, জুলিয়াস সিজারের দ্বারা আলেকজান্দ্রিয়া পাঠাগার ধ্বংসের কথা, হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ নগরীর বহু স্মৃতি ধ্বংসের কথা, বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক ছয় মাসব্যাপী নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগুন লাগিয়ে ধ্বংসের কথা, ব্রাহ্মণ ধর্ম ত্যাগ করে সদ্য নওমুসলিম রাজিব লোচন রায় ধর্মান্তরিত হয়ে কালাপাহাড় নাম ধারণ করে কামরুপ মন্দির ধ্বংস করা, গজনির দাস বংশীয় সুলতান মাহমুদ কর্তৃক ১৭ বার ভারত আক্রমণ করে বহু স্মৃতি ধ্বংস করা, আবদেল আল লতিফ কর্তৃক তার স্বীয় পিতা তৈমুর লংয়ের দৌহিত্র সুলতান উলুগ বেগমে হত্যা করে উলুগ বেগের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার মান মন্দির ধ্বংস করা, মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহর শাসন আমলে পারস্যের সুলতান নাদির শাহ কর্তৃক দিল্লি আক্রমণ এবং তিন দিনব্যাপী যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল সেসব কথা, এবং বেশ কয়েক বছর আগে তালেবানদের দ্বারা আফগানিস্তানে একটি বিরল বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করার কথা। বিশ্ব দস্যু চেঙ্গিস খান এবং তৈমুর লং অজস্র স্মৃতি এবং গবেষণা দলিল। এ ধরনের ধ্বংসকার্য না চালালে আজ মানব সভ্যতা এবং বিজ্ঞান আরও অনেক বেশি অগ্রসর অবস্থায় থাকত।

এসব ধর্ম ব্যবসায়ী কিন্তু আসল ধর্মের বাণী অনুসরণ করেনি। ইসলাম ধর্মের কয়েকজন কৃতী পুরুষ যথা- মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি, ইবনে সিনা, আল ফারাবি, ইবনে রুশদ সব সময়েই বলতেন জ্ঞানচর্চা ধর্মের অংশ। বলা হতো জ্ঞান আহরণের জন্য প্রয়োজনে চীন যেতে হবে। অথচ এসব ধর্ম ব্যবসায়ী জ্ঞানভান্ডারগুলো ধ্বংস করে দিল ইসলামী মুখোশ পরে।

আরও দুঃখজনক হলো- এ যে ধর্ম ব্যবসায়ীরা যখন যজ্ঞ চালাচ্ছিল তখন কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং পুলিশ নীরব ছিল যার জন্য স্বয়ং পুলিশপ্রধানই তাদের ব্যর্থতা, গাফিলতি এবং অপেশাদারত্বের সমালোচনা করে এদের তিরস্কৃত করেছেন। এদের মধ্যে নিশ্চয় অনেকে মনে মনে হেফাজত সমর্থক। এদের বাছাই করতে হবে এবং শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক