শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ জুন, ২০২১ ২৩:৩৫

মোটা চাল চিকন করা যাবে না

নীতিমালা করছে সরকার, চিহ্নিত হচ্ছে চালের উৎস ও ধানের জাত

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

Google News

দেশে উৎপাদিত চালের ৮৫ শতাংশই মোটা, মাত্র ১৫ ভাগ চিকন। অথচ বাজারে উল্টো দেখা যায়। সেখানে ৮৫ ভাগ চাল চিকন, ১৫ ভাগেরও কম পাওয়া যায় মোটা চাল। কী এমন জাদু আছে যা দিয়ে খেতের মোটা ধান বাজারে যেতে যেতে চিকন হয়ে যায়? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে মাঠে নেমেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। তারা বাজারে প্রাপ্ত চালের উৎস ও ধানের জাত নির্ণয়ে কাজ করছে। আর এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে সরকার এমন একটি নীতিমালা করে দেবে যাতে আর মোটা চাল চিকন করতে পারবেন না মিল মালিকরা। নির্দিষ্ট জাতের ধান, নির্দিষ্ট নামে বাজারজাত করতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষক যে ধান উৎপাদন করছেন বাজারে সে নামের চাল নেই। আবার বাজারে মিনিকেট, নাজিরশাইল, কাজললতা নামে যে চাল পাওয়া যাচ্ছে সে নামে কোনো ধান নেই। বোরো ও আমন মৌসুমে উৎপাদিত ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ জাতের ধানকে অটো রাইস মিলে কেটে ছেঁটে বিভিন্ন নামে বস্তাজাত করে সারা দেশে বাজারজাত করা হয়। এ পরিস্থিতিতে চালের উৎস ও ধানের জাত নির্ণয়ের জন্য ২১ জেলায় সমীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। এগুলো হলো- যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, বগুড়া, নওগাঁ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ। বাজারে প্রাপ্ত চালের সঠিক উৎস ও ধান নির্ণয় বিষয়ক সমীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফল নিয়ে ৩০ মে একটি বৈঠক হয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাজারে যেসব চাল পাওয়া যায় তার বেশির ভাগই মেশিনে ছাঁটাই করা। এ ছাঁটাই কতটা হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। আমরা এটি নির্ধারণে কাজ করছি যাতে মিলাররা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি চালের উপরিভাগের আবরণ ছাঁটাই করে ফেলে না দিতে পারেন।’ সচিব জানান, চালের উপরিভাগের আবরণেই প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল বেশি থাকে। আর পুরো চালে থাকে কার্বোহাইড্রেট। ভোক্তা যেহেতু পরিষ্কার ও সরু চাল পছন্দ করেন, মিলগুলো এই ওপরের আবরণ তুলে ফেলায় হারিয়ে যায় চালের প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল। ফলে স্বাভাবিক চাল থেকে ফ্যাট, ভিটামিন বি-২সহ যেসব খাদ্য ক্যালরি পাওয়ার কথা বাজারের চালে তার কিছুই পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই দশক আগেও বাজারে ঢেঁকিছাঁটা মোটা চাল ও হাসকিং মিলে ছাঁটাই করা চাল পাওয়া যেত। কিন্তু হাসকিং মিলে ছাঁটাই করা চাল দেখতে অপরিষ্কার হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা কম। এ অবস্থায় মিল মালিকরা হাসকিং মিলগুলোয় নতুন মেশিন লাগিয়ে অটো রাইস মিলে রূপান্তর শুরু করেন। এখন দেশে বেশির ভাগই অটো রাইস মিল, যাতে একদিকে ধান দেওয়ার পর অন্যদিকে চাল হয়ে বেরিয়ে যায়। এ অটো রাইস মিলগুলোয় বিভিন্ন চাপ ও তাপে বিভিন্ন আকারের চাল বের করা হয়, যেগুলোর কোনোটা হয় নাজিরশাইল আবার কোনোটা মিনিকেট কিংবা কাজললতা। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মেসার্স জয়লক্ষ্মী অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী অসীম দত্ত হাবলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, তাঁদের জোড়া গাভী নাজিরশাইল চালের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশে। তবে নাজিরশাইল নামে কোনো ধান নেই। মূলত ‘পাইজাম’ ধান থেকে এ চালটি তৈরি করেন তাঁরা। মিল মালিকরা জানান, অটোমেটিক ড্রায়ার রাইস মিলে একবারে ধান দিয়ে দেওয়া হয়। সেগুলো সেদ্ধ হয়ে কালার সর্টার মেশিনের মধ্য দিয়ে ঝকঝকে চাল বের হয়ে আসে। আবার হাসকিং মিলের চালও কালার সর্টারে দিয়ে চকচকে করা যায়। জানা গেছে, মেঝেতে রাখা চাল মেশিনের সাহায্যে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ওপরে। সেখানে পানি মিশিয়ে চাপ ও তাপ দিয়ে চালের উপরিভাগের আবরণ তুলে ফেলা হয়। এরপর ওই চাল পলিশ করার জন্য দেওয়া হয় অটোমেটিক কালার সর্টার মেশিনে। একেকটি মেশিনে সেট করা আছে অর্ধশতাধিক ক্যামেরা। কম্পিউটারাইজড সেই ক্যামেরা বাছাই করছে বিভিন্ন রঙের চাল, যেগুলোর উপজাত ও ময়লা বিভিন্ন পথে বের করে দিয়ে একটি পথে বের হচ্ছে ঝকঝকে চাল। মেশিনে কমান্ড দিয়ে আবার এ চালের রং ও আকার বদলে দেওয়া যায়। আর এভাবেই ধান খেতে উৎপাদিত ব্রি-২৮ বা ব্রি-২৯ হয়ে যায় মিনিকেট বা নাজিরশাইল।

এই বিভাগের আরও খবর