শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ জুন, ২০২১ ২৩:১৪

খুন হওয়ার চার বছর পর স্বীকারোক্তি দিল আজমল!

তুহিন হাওলাদার

Google News

‘প্রদীপ নামে এক দারোগা দুই-তিন বার আমাদের বাড়িতে যায়। আমার বাপ-মাসহ এলাকার লোকজনের কাছে আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। এলাকার চেয়ারম্যানের কাছে আমার জন্মনিবন্ধন চায়। ছবি চায়। প্রদীপ দারোগাকে সবাই বলে আমার নাম আজমল। পরে ঢাকায়  একটা অফিসে আইসা প্রদীপ দারোগা ডিএনএ টেস্ট করায়। আমার বাপ বলছে ডিএনএ টেস্ট করে মজিবরের স্যাম্পলের সঙ্গে। মজিবরের সঙ্গে ডিএনএ না মেলায় আমার বাপ গ্রামের বাড়ি চইল্লা যায়। প্রদীপ দারোগা মজিবরকে ইমরান ভাইবা আমার বাপকে মামলার বাদী হইতে কইছিল। আমার বাপ রাজি হয় নাই। এ জন্য প্রদীপ দারোগা আমার বাপকে উল্টাপাল্টা ভয় দেখায়। প্রদীপ দারোগা মজিবরকে কেন আজমল (ইমরান) বানাইতে চাইছে তা আমি জানি না। এই মামলায় মারা গেছে মজিবর।’ খুন হওয়ার চার বছর পর রাজধানীর কদমতলী থানার ৬১(৫)১৭ নম্বর মামলায় ঢাকার মুখ্য মাহনগর হাকিম আদালতে আজমল এমন তথ্য দিয়ে সম্প্রতি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দেন। এর আগে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম আসামি আজমলের জাবানবন্দি রেকর্ড করেন।

আদালত সূত্র জানায়, স্বীকারোক্তিতে আজমল বলেন, ‘২০১৭ সালের মে মাসে আমি ও মজিবর ঘুমিয়ে ছিলাম জামালের ঘরে। তখন অনেক বৃষ্টি হইতেছিল। বিজলি চমকাচ্ছিল। রাত অনুমান সাড়ে ১১টায় বাহির হতে টিনের ঘরের দরজা খুইলা কালা সুমন, ভাতিজা সুমন, পান্নার পোলা মহিন, জামাল ও রসুলপুরের তিন-চারজন লোক নাম জানি না, দেখলে চিনি, ঘরে ঢোকে। বৃষ্টি বেশি থাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। মজিবর টের পেয়ে জাইগ্গা ওঠে। ওই সময় কালা সুমন আমার মাথায় একটা পিস্তল ঠেকায়। মজিবররে ধরতে কয়। কালা সুমন, পান্নার পোলা মহিন, ভাতিজা সুমন, মজিবররে হাত দিয়া চাইপ্পা ধরে। কালা সুমন আমারে শালার পো কইয়া গালি দিয়া কয়, মজিবররে ধর। আমি ভয় পাইয়া মজিবরের পা চাইপ্পা ধরি। কালা সুমন ঘরের মইধ্যে শিলপুতা দিয়া মজিবরের মাখায় তিন-চারটা বাড়ি দেয়। মজিবরের মাথা দিয়া রক্ত বাহির হইতেছিল। মজিবরের মোখে ভাতিজা সুমন গামছা ও খাতা দিয়া চাইপা ধইরা রাখায় মজিবরের চিৎকারের আওয়াজ বাহিরে আসে নাই। চার-পাঁচ মিনিট পরে মজিবর মারা যায়। এরপর পান্নার পোলা নিহত মজিবরের গায়ে এক ধরনের মেডিসিন ঢালে। মেডিসিন ঢালার কারণে মজিবরের শরীর কালা হয়া যায়। ঘটনার দিন মজিবর আমার কাছ থেকে একটা জামা-প্যান্ট নিয়া পইরা ঘুমাইয়া ছিল। মজিবর মইরা যাওয়ার পর কালা সুমন ও জামাল আমাকে বলে, মজিবরের লাশ রিকশার গ্যারেজে রুটি বেল্লালের বেকারির গাড়ির পাশে রাইখা আয়। আমি পারমু না কইলে কালা সুমন ওর হাতে থাকা পিস্তল দিয়া বাড়ি দিয়া আমার মাথায় ফাটাইয়া দেয়। পরে জামালের ভাতিজা সুমন, কালা সুমন, রসুলপুরের নাম না জানা দুই-তিনজন আমারে জামালের ভাবির ঘরে রশি দিয়া হাত-পা বাইন্ধা রাখে। ফজরের আজানের পর জামালের ভাতিজা সুমন, জামালের ভাবি, আমার হাত-পায়ের রশি খুইল্লা দিয়া ওই জায়গা হইতে চইল্লা যাইতে বলে। পরে ভোলার গ্রামের বাড়ি যাই। পরে জেদ্দা ডায়িং ফ্যাক্টরিতে চাকরির সময় জামাল আমারে বলে, তুই তোর নাম ইমরান বলবি। কেন ইমরান নাম বলব, তা জামাল জানায় নাই। জেদ্দা ডায়িং ফ্যাক্টরিতে আমি ইমরান নামেই কাজ করছি। এর পর থেইকা আমার নাম ইমরান হয়। আমি কদমতলী থানায় তিন দিন রিমান্ডে ছিলাম। এ সময় জানতে পারি, ২০১৭ সালে মজিবরকে আমার নাম আজমল বানাইয়া মার্ডার মামলা হইছিল। ২০১৭ সালে জামালের ঘরে মজিবরকে মারার পর কী হইছে তা আমি জানি না। জানার চেষ্টাও করি নাই। মজিবররে মারছে কালা সুমন, ভাতিজা সুমন, পান্নার পোলা মহিন, জামাল, রসুলপুরের তিন-চারজন মিলা। মৃত্যুর ভয় দেখানোর পর আমি নিজেও মজিবরের পা ধরছি। আঘাত করি নাই। মজিবরের সঙ্গে আমি ঘুমাইছি, খাইছি। মজিবরের সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা ছিল না। মজিবর মারা যাওয়ায় আমি খুবই ভয় পাইয়া যাই। আমি কোনো হত্যায় জড়িত না। আমি ফাইস্যা গেছি।’ মামলা সূত্রে জানা গেছে, এ খুনে জড়িত সন্দেহে পুলিশ একে একে গ্রেফতার করে পাঁচজনকে। এর মধ্যে তিনজন স্বীকার করে বলেছেন, তারাই আজমলকে খুন করেছেন। কিন্তু আজমল খুনের আসল সত্য বেরিয়ে আসে ঘটনার প্রায় তিন বছর পর। আজমলের লাশের ডিএনএ প্রোফাইল তার বাবার প্রোফাইলের সঙ্গে মেলেনি। তদন্ত নাটকীয়তায় মোড় নেয়। জীবিত আজমলের সন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, আজমল আছেন কারাগারে। খুনের শিকার অজ্ঞাত ওই ব্যক্তির নাম মজিবর। সে সময় কদমতলী থানায় করা এজাহারে ১১ জনের নাম উল্লেখ করেছেন বাদী এসআই লিটন মিয়া (বিপি-৭৩৯৩০৮৯১৬৪) মামলা করেন। সেখানে ৫ নম্বরে রয়েছে খুন হওয়া মজিবরের নাম। এ মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা কদমতলী থানার সাবেক এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ডু (বিপি-৭৪৯২০৮৩৯৪০) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার সময়ে আমি মামলার তদন্ত সঠিক করেছি। এ মুহূর্তে কিছু আর মনে নেই। রিমান্ডে নিয়ে ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ সঠিক নয়।’ আজমল ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা এলাকার রতন মাঝির ছেলে।