শিরোনাম
রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
মর্গে স্বজনদের আর্তনাদ

পোড়া লাশই চাই

আলী আজম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় আগুনের পর নিখোঁজদের খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে ভিড় করছেন তাদের স্বজনরা। তাদের আহাজারি আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ। কেউ এসেছেন মায়ের খোঁজে, কেউবা সন্তানের, কেউবা আবার স্বজনদের খোঁজে। কিন্তু উদ্ধার লাশগুলো এতটাই পুড়েছে যে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হচ্ছে। স্বজনরা যখন জানতে পারেন ডিএনএ টেস্ট করা ছাড়া লাশ পাওয়া যাবে না, তখন তাদের কান্নার রোল পড়ে যায়। তারা বলতে থাকেন, ‘পোড়া লাশই চাই।’ অবশ্য পরে তাদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডি।

সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুশরাত ইয়াসমিন জানান, রূপগঞ্জে আগুনের ঘটনায় ৪৮টি মরদেহের মধ্যে ৪০টির দাবিদার পাওয়া গেছে। দাবিদারদের পরিবারের পক্ষ থেকে ৫৬ জনের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নিখোঁজদের স্বজনরা বলছেন, ‘আমরা কিছুই চাই না। আমরা আমাদের স্বজনের লাশ চাই। পোড়া লাশই চাই।’ কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলছে, লাশের পরিচয় শনাক্তে সময়ের প্রয়োজন। ঢামেক মর্গ সূত্র জানায়, মোট ৫১টি মরদেহ এসেছে। তিনজনের মরদেহ শনাক্তের পর গতকাল পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ৪৮ জনের মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় আগুনের পর তিনজনের লাশ আনা হয় ঢামেক মর্গে। তাদের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। শুক্রবার ৪৮ জনের মৃতদেহ ঢামেক মর্গে নিয়ে আসে ফায়ার সার্ভিস। এগুলো এতই পোড়া যে নারী-পুরুষ বোঝাও দুষ্কর। তাদের স্বজনরা ঢামেক মর্গে ভিড় করলেও শনাক্ত না হওয়ায় লাশ হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ৪৮টির মধ্যে ঢামেক মর্গে ৩৩ জনের এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ১৫ জনের লাশ রাখা হয়েছে।

খালা রোজিনা ও খালু হাতিম মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে নিখোঁজ মা অমৃতা বেগমকে খুঁজতে এসেছে সাত বছরের সুমা আক্তার। ঢামেক মর্গে মায়ের ছবি হাতে নিয়ে মাকে খোঁজ করছে সে। ছোট্ট এই শিশু বলছে, ‘আমার মাকে এনে দেন। আমি আমার মাকে চাই।’ তার মাকে যে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না এ কথা তাকে বোঝানোর ভাষা কারও জানা নেই। জানা গেছে, অমৃতার স্বামী রিকশাচালক সেলিম। মৃতের বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার রামপুরে।

শিশু সুমার খালা রোজিনা বলেন, ‘আমি এবং অমৃতা সেজান জুস কারখানায় কাজ করতাম। ঘটনার দিন ভোর সাড়ে ৬টায় আমরা বের হই। তখন সুমা ঘুমিয়ে ছিল। দুই বোন দুই সেকশনে কাজ করি। সেজান জুস কারখানার চতুর্থ তলায় কাজ করতেন অমৃতা। আমরা ছিলাম পাশের ভবনে। আগুন লাগার খবর শুনে ওই ভবনে গিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে। নিচে ও চতুর্থ তলায় তালা লাগানোর ফলে কেউ বের হতে পারেনি। আমার বোনকে চাই, বোন হত্যার বিচার চাই।’

নিখোঁজ মো. মহিউদ্দিনের (২২) খোঁজ নিতে ঢামেক মর্গে আসেন চাচা মো. শাহেদ। তিনি বলেন, ‘মহিউদ্দিনের বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া থানার ২ নম্বর চর নঙ্গলিয়ায়। তার বাবার নাম মো. ইউসুফ ও মায়ের নাম শাহেনা। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে বড়। রমজানের ঈদের পর সে সেজান জুস কারখানায় কাজ নেয়। কারখানার পাশেই একটি মেসে থাকত সে। আগুন লাগার খবর শুনে মহিউদ্দিনের সন্ধানে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসেছি। সেজান জুস কারখানায় খোঁজ করেছি। আশপাশের হাসপাতালে খোঁজ করেছি। কিন্তু তার সন্ধান মেলেনি। গতকাল সকালে মহিউদ্দিনের একটি ব্যাগ ধরিয়ে দেন ওই কারখানার কন্ট্রাক্টর আলমগীর। সেখানে নিখোঁজ মহিউদ্দিনের কাপড়-চোপড় পাওয়া গেছে। শুনেছি আমার ভাতিজা ওই কারখানার চতুর্থ তলায় কাজ করত। মহিউদ্দিনের বাবা-মা সন্তানের জন্য পাগলপ্রায়। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা নেই। তারা বারবার সন্তানের সন্ধান চাইছেন।’

নিখোঁজ মিনা খাতুনের (৪২) সন্ধানে এসেছেন তার ছেলে দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার কলেজ পড়ুয়া বোন শম্পা আক্তার এবং মা মিনা খাতুন সেজান জুস কারখানায় কাজ করত। আগুন লাগা ভবনের চতুর্থ তলায় মা কাজ করত আর বোন কাজ করত পাশের ভবনে। আমাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদরের গাগলাইলে। বাবার নাম মো. মনজিল ভূঁইয়া।’

দেলোয়ার বলেন, ‘মায়ের সন্ধানে আগুন লাগা ভবনে জীবনের রিস্ক নিয়ে আমি গিয়েছিলাম। সেখানে ধোঁয়া ও ছাই ছাড়া কিছু দেখতে পাইনি। বিভিন্ন হাসপাতালে খুঁজেও মাকে পাইনি। শুক্রবার ঢামেক মর্গে এসে মায়ের সন্ধানে ডিএনএ নমুনা দিয়েছি। আজ (গতকাল) একজন খবর দিল, ঢামেক মর্গে তোমার মায়ের সন্ধান মিলেছে। তাই ছুটে এসেছি। কিন্তু মায়ের সন্ধান মেলেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনএ নমুনায় মিল পাওয়া গেলে মাসখানেক পর তার সন্ধান মিলতে পারে।’

নিখোঁজ নাজমা খাতুনের (৩০) সন্ধানে এসেছেন খালাতো ভাই মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন সকাল ৮টায় কাজের জন্য বের হন নাজমা। তিনি কারখানার চতুর্থ তলায় কাজ করতেন। তার স্বামীর নাম তৌহিদুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে। কারখানার পাশে ১ নম্বর কোয়ার্টারে থাকতেন তিনি।’

নিখোঁজ সাগরিকা শায়লার (১৮) খোঁজ নিতে এসেছেন চাচা সেলিম। তিনি বলেন, ‘কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে বাড়ি শায়লার। তারা তিন ভাই ও এক বোন। সে সবার বড়। বাবা মাছ ব্যবসায়ী স্বপন। পুড়ে যাওয়া ভবনের তৃতীয় তলায় কাজ করত শায়লা।’

নিখোঁজ তাসলিমার (২০) খোঁজ নিতে এসেছেন দিনমজুর বাবা বাচ্চু মিয়া। তিনি বলেন, তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের গৌরীপুরে। দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তাসলিমা বড়। তিনি ওই কারখানার চতুর্থ তলায় কাজ করতেন।

মরদেহ হস্তান্তর : ঢামেক মর্গ থেকে মোরসালিন হকের মরদেহ নিয়ে গেছেন তার স্বজনরা। তিনি ঢামেক হাসপাতালে মারা যান। গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার নুরুন নবী। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে দাফন-কাফন বাবদ ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে মারা যাওয়া স্বপ্না রানী ও নিনার মরদেহ শুক্রবার রূপগঞ্জ থেকে তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আহত তিন শ্রমিককে আর্থিক সহায়তা : ঢামেক হাসপাতালের ২০৩ ও ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আমেনা বেগম, মাজেদা বেগম ও হালিমা আক্তার নামে তিন নারীশ্রমিককে ৫০ হাজার টাকার চেক প্রদান করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম আবদুস সালাম। এ সময় তিনি বলেন, ‘যারা জীবন বাঁচাতে ওপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মারা গেছেন, তাদের পরিবারকে ২ লাখ টাকার চেক প্রদান করেছি। পর্যায়ক্রমে আহত সবাইকে ৫০ হাজার টাকা করে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে সহায়তা করা হবে।’

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর