শিরোনাম
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

জামানত জটিলতায় ঋণ পাচ্ছে না বড় বিনিয়োগ

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

জামানত জটিলতায় ঋণ পাচ্ছে না বড় বিনিয়োগ

দেশে সরকার যে অর্থনৈতিক জোনগুলো করছে, সেখানে বড় বিনিয়োগে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। গ্যাস, বিদুৎ, পানি সমস্যার চেয়েও এখন বড় সমস্যা জামানত জটিলতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের জমি যেহেতু সরকারের মালিকানাধীন থাকে ফলে ওই জমি জামানত হিসেবে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের সেখানে জমির মালিকানা পাওয়ার সুযোগ নেই। এর ফলে সরকারের অর্থনৈতিক জোনে বেসরকারি খাতের বড় বিনিয়োগ বাধার মুখে পড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশে ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক জোন পৃথক পৃথক নীতিতে পরিচালিত হওয়ায় জামানতের ক্ষেত্রে জটিলতা আরও বেড়েছে। মোংলা অর্থনৈতিক জোনে উদ্যোক্তারা রেজিস্টার্ড মর্টগেজ সুবিধা পেলেও দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে খ্যাত মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে রেজিস্টার্ড মর্টগেজ সুবিধা নেই। সে কারণে সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত জমি জামানত রেখে ঋণ গ্রহণের সুবিধা পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা।

শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়, জামানত জটিলতায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) খাতে গৃহীত বড় বড় প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে। অর্থায়নের অভাবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি বেশ কিছু সুপারিশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ পিপিপি কর্তৃপক্ষ।

গত জুনে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো ওই চিঠিতে পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব) সুলতানা আফরোজ উল্লেখ করেন, ‘প্রকল্পের চুক্তিস্বাক্ষরের পর বেসরকারি অংশীদারগণ যে প্রকল্প কোম্পানি বা প্রকল্পের নামে যে একটি বিশেষ কোম্পানি গঠন করে থাকে, ওই কোম্পানির পক্ষে ঋণ গ্রহণের জন্য জামানত প্রদানের সক্ষমতা থাকে না। কেন না, প্রকল্পের জমি যেহেতু সরকারের মালিকানাধীন থাকে, ওই জমি জামানত হিসেবে দেওয়ার সুযোগ নেই।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রকল্পে অর্থায়ন দ্রুত করার জন্য ১৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (পিপিপি ফাইন্যান্সিং পার্টনারশিপ) করলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি উদ্যোক্তারা আর্থিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ছেন।

অর্থনৈতিক জোন এবং পিপিপি প্রকল্পে বড় বিনিয়োগে অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের জামানত জটিলতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিডার এক কর্মকর্তা বলেন, ইকনোমিক জোনগুলোর প্রপার্টির মালিক যেহেতু সরকার, সে কারণে ওই জমি জামানতে ব্যবহার করতে পারেন না বেসরকারি উদ্যোক্তারা। এ সমস্যা সমাধানে আমরা একটি নীতিমালা করার বিষয়ে বেজাকে তাগিদ দিয়েছিলাম। ওই কর্মকর্তা জানান, বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণ প্রদান সংক্রান্ত একটি কমিটিও আছে যার চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও সাচিবিক দায়িত্বে রয়েছে বিডা। ওই কমিটির পক্ষ থেকেই এ ধরনের নীতিমালা করার প্রস্তাব ছিল। এখন জামানত সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে নীতিমালা হোক বা বিধিমালা হোক একটা কিছু করতে হবে। নয়তো পরে বড় বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব এলেও সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ঋণ প্রদানে জামানত জটিলতা শুধু সরকারি জমির ক্ষেত্রে নয়, বেসরকারি জমি নিয়েও নানা সমস্যায় পড়েন উদ্যোক্তারা। দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইলে একদিকে যেমন বেসরকারি জমি রেজিস্ট্রেশনের বিষয়গুলো সহজীকরণ করতে হবে, পাশাপাশি সরকারি জমি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের নামে এমনভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া উচিত যাতে অর্থায়ন দ্রুত হতে পারে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব : অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই জটিলতা এড়াতে ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এর ২৬-এর (খ)(১) এবং ২০১৬ সালের ১৬ মে প্রকাশিত বিআরপিডির একটি প্রজ্ঞাপন সংশোধনের সুপারিশ করেছে পিপিপি কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পিপিপি প্রকল্পের জন্য একক ঋণ প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বন্ড মার্কেট তৈরি, পেনশন ফাইন্ড, ইন্সুরেন্স ফান্ড থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

পিপিপির কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৬(খ)(১) এবং বিআরপিডির সার্কুলার অনুযায়ী কোনো প্রকল্পে ব্যাংক মোট মূলধনের সর্বাধিক ৩৫ শতাংশের বেশি অর্থায়ন করতে পারে না। অথচ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার। আইনগত দিক থেকে ব্যাংকগুলো এককভাবে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করতে সক্ষম নয়। এ ছাড়া স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রভিশনিংয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করতে হয়। এ অবস্থায় পিপিপি প্রকল্পে দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনসহ বড় বিনিয়োগে জামানত জটিলতা দূর করার বিষয়ে সরকারকে সুনির্দ্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।