মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার দেওয়ার চাপ

জমির মালিকানা ও ব্যবসা-চাকরির সুযোগ দিতে বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে জাতিসংঘের সায়, বাংলাদেশের প্রত্যাখ্যান

জুলকার নাইন

বাংলাদেশে সাময়িক আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবারিত চাকরির সুযোগদানের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গারা যেন দেশের যে কোনো স্থানে জমির মালিকানা ও আইনি অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারে সে কথাও বলা হচ্ছে। এমনকি আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকারদানের জন্যও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া এসব প্রস্তাবের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের ওপর শর্ত আরোপ করে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে জাতিসংঘ। অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব ‘ফরমায়েশি’ প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘এখন হয়তো আলোচনার মাধ্যমে আপসরফা হবে। তবে এটা নিশ্চিত তারা আমাদের একটা চাপের মধ্যে রাখবে। হয়তো টাকাপয়সা দিতে ঝামেলা করবে।’

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাবের কথা আমরা জানতে পারলাম জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের থেকে। তারা ভাসানচরে যাওয়ার জন্য যেসব শর্ত দিয়েছে তার একটি হলো বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাব গ্রহণ। সেখানে বলা আছে, রোহিঙ্গাদের সব ধরনের আইনি অধিকার দিতে হবে। বাকি বাংলাদেশিদের মতো অধিকার দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের কাজ করার অধিকার দিতে হবে, তাদের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন করতে হবে, তাদের যেখানে খুশি সেখানে চলাচলের স্বাধীনতা দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের ইচ্ছামাফিক বসতি গড়ার জন্য জমি কেনার অধিকার অর্থাৎ মালিকানার অধিকার, যা ইচ্ছা ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে। তারপর তাদের ভোটাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে যাতে তারা ইচ্ছামতো তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে। তারা যেন সহজে যে কোনো চাকরি পেতে পারে তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। অর্থাৎ চাকরি ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবে বৈষ্যমের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এসব করা হলে বিশ্বব্যাংক তাদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার মতো একটা ফান্ড দেবে। আর এ অধিকারগুলো না দেওয়া হলে সংঘাত হবে বলা হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা বাংলাদেশের বক্তব্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে আমরা এসব প্রস্তাব গ্রহণ করছি না।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক যে রিপোর্ট তৈরি করেছে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, ১৬টি দেশের জন্য। যেসব দেশে শরণার্থী আছে মূলত তাদের জন্য। এসব শরণার্থীকে কীভাবে হোস্ট কান্ট্রিতে আত্তীকরণ করা যায় সে উদ্দেশ্যে এটা করা করা। যাতে শরণার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের দ্ধন্ধ-সংঘাত কমানো যায়। পাশাপাশি শরণার্থীদের জন্য একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেওয়া যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমত আমরা এর মধ্যে থাকার কথা নয়। কারণ বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের শরণার্থী মর্যাদা দেয়নি। তাদের বাস্তুচ্যুত হিসেবে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। আমাদের অগ্রাধিকার হলো রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে হবে। মিয়ানমারও তাদের ফেরত নেওয়ার কথাই বলে আসছে। চার বছরে তারা ফেরত না গেলেও মিয়ানমার কখনো বলেনি তারা ফেরত নেবে না। সুতরাং এটা স্পষ্ট রোহিঙ্গারা এখানে ক্ষণিকের অতিথি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক যে প্রস্তাব দিয়েছে সেখানে রোহিঙ্গাদের একীভূত করতে বলা হয়েছে।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু রোহিঙ্গারা শরণার্থী নয় তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের কোনো অধিকার দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বিশ্বব্যাংক রোহিঙ্গাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এসব কথা বলছে আমরা তাদের বলেছি তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ একমাত্র মিয়ানমারে ফিরলেই আসবে। এটাই একমাত্র রাস্তা। আর বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রকল্প হাতে নিয়েছে বা নিচ্ছে। আমরা দীর্ঘকালীন এসব প্রকল্পের পক্ষে নই। আমরা মনে করি সাময়িক সময়ের জন্য প্রকল্প নিতে হবে।’ ‘রোহিঙ্গাদের নামে যেসব টাকাপয়সা আসে আমরা তার চেহারাও দেখি না’ উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সব টাকা খরচ করে ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের নামে টাকা পাঠায় কিন্তু এগুলো যায় রোহিঙ্গাদের কাছে, যায় বিভিন্ন সংস্থার কাছে। এসব সংস্থা কীভাবে টাকাপয়সা খরচ করে তারও কোনো হিসাব-নিকাশ আমরা পাই না। আমরা শুধু শুনি বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের জন্য টাকাপয়সা দিয়েছে, আমরা চোখেও দেখি না। আর তারা বড় বড় গলায় বলে যে খুব সাহায্য করছি। রোহিঙ্গাদের সাহায্য করা তো তাদের দায়িত্ব, একা বাংলাদেশের দায়িত্ব নয়। রোহিঙ্গাদের সাহায্য করা সবার দায়িত্ব।’ বাংলাদেশ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর এখন কী হবে- জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় এখন আলোচনার মাধ্যমে হয়তো নতুন এগ্রিমেন্ট হবে। সেখানে আমরা তাদের ফরমায়েশি সব প্রস্তাব বাদ দিতে বলব। আমাদের কথামতো তারা রাজি হলে এ এগ্রিমেন্ট হবে।’ তিনি বলেন, ‘এখানে বাংলাদেশেও কিছু লোক আছে যারা এসব অনৈতিক প্রস্তাবের পক্ষে কথা বলছেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর টাকায় চলা এ লোকগুলো আমাদের বোঝানোরও অপচেষ্টা করছেন। তাদের বিষয়ে আমাদের সবারই সাবধান হওয়া উচিত।’ জানা যায়, বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ‘রিফিউজি পলিসি রিভিউ ফ্রেমওয়ার্ক’ নামের একটি প্রস্তাব পাঠায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে। সেখানে দিনক্ষণ বেঁধে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে মতামত না পেলে প্রস্তাবটি সরকার মেনে নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, বিশ্বব্যাংকের এমন প্রস্তাব মেনে নিয়ে সংস্থা থেকে ঋণ নিলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বদলে চিরতরে বাংলাদেশে রেখে দিতে হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাবে পরিবর্তন আনা না হলে উদ্বাস্তুসংক্রান্ত কোনো অর্থ সংস্থাটির কাছ থেকে না নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।