শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ আগস্ট, ২০২১ ২৩:৩০

বিদেশি বিনিয়োগে করোনার ধাক্কা

আগের প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহামারী, চীন ছাড়া অন্য কোনো দেশ থেকে আসছে না তেমন কোনো বিনিয়োগ, ২০২০ সালে কমেছে ১১ শতাংশ, চলতি বছর শেষে আরও কমার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

মানিক মুনতাসির

বিদেশি বিনিয়োগে করোনার ধাক্কা
Google News

দেশে কোনোভাবেই বাড়ছে না বিদেশি বিনিয়োগ। আগের প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস মহামারীর অচলাবস্থা। ফলে চীন ছাড়া অন্য কোনো দেশ থেকে তেমন কোনো বিনিয়োগ আসছে না। জাতিসংঘের শিল্প ও বাণিজ্য উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদনের তথ্যমতে ২০২০ সালে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১১ শতাংশ। চলতি বছর শেষে আরও কমার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ করোনা মহামারীকে সঙ্গী করেও বিদেশি বিনিয়োগ টানছে মিয়ানমার, ভারত, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। চীন থেকে সরিয়ে নেওয়া জাপানের ৮৬ কোম্পানির একটিও বাংলাদেশে আসেনি। তবে ভারত, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামে গেছে। এসব কোম্পানি বাংলাদেশে না আসার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে বিনিয়োগের উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারা। একই সঙ্গে মুনাফা ও পুঁজির নিশ্চয়তা দিতে না পারা এবং অবকাঠামো দুর্বলতা। অবশ্য দেশজুড়ে ১০০ ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার যে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা)। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রায় দুই ডজন বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারতের আদানি, জাপানের ফুজি, মিতসুবিশি, ম্যাকডোনাল্ডসহ আরও অনেক বিদেশি কোম্পানি ইতিমধ্যে সেখানে কারখানাও স্থাপন শুরু করেছে। এ শিল্পনগরের কাজ শেষ হলে দেশের বিনিয়োগের চিত্র পাল্টে যাবে বলে আশা করছেন সদ্যবিদায়ী বেজা চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী।

সবশেষ ২২ জুন, ২০২১ প্রকাশিত আঙ্কটাডের প্রতিবেদনের তথ্যমতে ২০২০ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই) কমেছে ৩১ কোটি মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা; যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২০ সালে দেশে এফডিআই এসেছে ২৫৮ কোটি ডলার। যা ২০১৯ সালে ছিল ২৮৯ কোটি ডলার; যার বেশির ভাগই পুনর্বিনিয়োগ এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চীনের। তবে চলমান করোনা মহামারীর মধ্যেও প্রতিবেশী দেশ চীন, মিয়ানমার ও ভারতে এফডিআই বেড়েছে।

অবশ্য করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপীই বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। ২০২০ সালে সারা বিশ্বে মোট বিদেশি বিনিয়োগ ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন থেকে কমে ১ ট্রিলিয়নে নেমে এসেছে। শতকরা হিসাবে কমেছে ৩৫ শতাংশ। চলতি বছর শেষে এ হার নেতিবাচকই থাকবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে কভিড-১৯-পরবর্তী এক নতুন বিশ্বের যাত্রা হলে বিনিয়োগের অপার সুযোগ সৃষ্টি হবে আর তার জন্য বাংলাদেশকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করেন বেজার সাবেক চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী।

এদিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কতগুলো চ্যালেঞ্জের কথাও বলেছে আঙ্কটাড। এর মধ্যে বাংলাদেশের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনটি চ্যালেঞ্জকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জমির অভাব, অবকাঠামো-স্বল্পতা এবং বিশ্বব্যাংকের ইজ অব ডুইং বিজনেস (সহজ ব্যবসা করার সূচক) র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা। বর্তমানে ১৯০টি দেশের মধ্যে এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮। এসব সমস্যা সমাধানে অবশ্য বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিডা কর্তৃপক্ষ।

আঙ্কটাডের তথ্যমতে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গত বছরের নিম্নগতি এ বছরও চলমান রয়েছে। কভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এ বছর শেষে এ নেতিবাচকতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে যে দেশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পারবে সে দেশে সংক্রমণের ঝুঁকি কমার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে বলে মনে করে আঙ্কটাড। ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এসেছে। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের চেয়ে যা ২০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শুধু ভারতের এফডিআই এসেছে ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। আগের বছরের চেয়ে যা ২৭ শতাংশ বেশি। পাকিস্তানে ৬ শতাংশ কমেছে। শ্রীলঙ্কায় কমেছে ৪৩ শতাংশ। এ ছাড়া নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানে আগের বছরের মতো স্থিতিশীল। বাংলাদেশের বেলায় বিনিয়োগ কমেছে ১১ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রে বরাবরের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখনো শীর্ষেই রয়েছে। যদিও বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ এখন পড়তির দিকে। অবশ্য বিডায় বিনিয়োগের অসংখ্য প্রস্তাব নিবন্ধিত হলেও চূড়ান্তভাবে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে না। সবশেষ ২০১৮ সালে জাপান টোব্যাকোর একটি বড় বিনিয়োগ এসেছিল বাংলাদেশে। যা ছিল ১৫০ কোটি ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা)। এরপর আর কোনো বড় বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। চীন ও আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে চীন থেকে ৮৬টি জাপানি কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ সরিয়ে নেয় অন্যত্র। এ ক্ষেত্রে জাপানি ওইসব কোম্পানি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, মিয়ানমারে গেলেও বাংলাদেশে আসেনি। তবে অতিসম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু ওই শিল্পনগরের বিদেশি কোম্পানির শিল্প স্থাপন অংশের নির্মাণের সময়সীমা দুই বছর পেছানো হয়েছে। ফলে এখানে যেসব বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে তাদের এ ঘোষণা চূড়ান্তভাবে বিনিয়োগে রূপ নিতে অপেক্ষার প্রহর আরও বাড়বে। তবে সরকারের বিভিন্ন দফতরের তথ্যমতে বাংলাদেশের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে চীন। এ দেশের উন্নয়নে চীন সরকার ঋণ ও অনুদান দুই-ই দিয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে এবার নতুন করে যোগাযোগ, রেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি, স্যানিটেশন, আইসিটি, শিপিং এ আট খাতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে চায় দেশটি। চীন বাংলাদেশকে এ পর্যন্ত ৫৮ দশমিক ৮ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৯৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৯৪ দশমিক ২ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে দেশটি। বিগত ২২ বছরে ১৮ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা চীনা ঋণ এসেছে বাংলাদেশে। এমনকি চীনা বিনিয়োগের সূত্র টেনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘চীন আমাদের বহু পুরনো দিনের পরীক্ষিত বন্ধু। একইভাবে ভারতও আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীন আমাদের জন্য অনন্য ভূমিকা রাখছে।’

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশে অনেক দিন ধরেই কাক্সিক্ষত হারে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে আগে থেকেই মন্দাভাব ছিল। করোনাভাইরাস মহামারী এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। নতুন করে বিনিয়োগে কেউ ঝুঁকি নিচ্ছে না।’ পুঁজির নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তার জন্য তারা অনেকটা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে তিনি মনে করেন। এদিকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সব ধরনের আইনি জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা), অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করছে। এসব সংস্থা, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধনে কাজ করছে বিডা। এ ছাড়া ১১টি সংস্থার ৪১ ধরনের পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এসব সংস্থার সার্বিক কার্যক্রমে গতি আনার নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

এই বিভাগের আরও খবর