সোমবার, ২৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

টেলিটকেই অবৈধ ভিওআইপি বাণিজ্য

বিটিআরসির তদন্ত প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য, দেদার ভুয়া সিম নিবন্ধন, শনাক্ত করতে নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

টেলিটকেই অবৈধ ভিওআইপি বাণিজ্য

একজন ব্যক্তির নামে সর্বোচ্চ ১৫টি সিম নিবন্ধন করা সম্ভব। অথচ একটি চক্র অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) ব্যবসায় টেলিটকের ৩ হাজার ৪০০ সিম ব্যবহার করে আসছিল। এর সঙ্গে জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। তাদের যোগসাজশে ভুয়া নিবন্ধনের মাধ্যমে চক্রটি এসব সিম সংগ্রহ করেছে। প্রথমবার নিবন্ধিত সিমের বায়োমেট্রিক নমুনা বিভিন্ন সময় অ্যাকটিভেশন অ্যাপে সন্নিবেশের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয় একাধিক সিম। এসব সিমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একজন গ্রাহক এক দিনেই ১৪ বার একই রিটেইলার পয়েন্টে গিয়ে বায়োমেট্র্কি নমুনা দিয়ে গভীর রাতেও (রাত ৩টা ১৮ মিনিট) দোকান খুলে আঙুলের ছাপ দিয়ে সিম সংগ্রহ করেছে, যা অবাস্তব। শুধু তা-ই নয়, একটি সিমে একই সঙ্গে ৮০টির বেশি মোবাইল নম্বর নেটওয়ার্কে যুক্ত ছিল, যা স্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ এসব সিম দিয়ে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা করা হয়েছে। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে খোদ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তদন্ত প্রতিবেদনে। ২৩ জুন প্রতিবেদন জমা দেয় বিটিআরসির তদন্ত কমিটি। এতে ছয় দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার। গতকাল তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিটিআরসির অবৈধ ভিওআইপি অভিযানে টেলিটকের ৩ হাজার ৪০০টি সিম একসঙ্গে জব্দ করা হয়। তা নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আর টেলিটকের কারা ভিওআইপি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত তা খুঁজে বের করতে টেলিটক কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের সময় যে মামলা হয়েছে, সেগুলোর তদন্তকাজ চলছে।’

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ৩ ফেব্রুয়ারি র‌্যাব-১০ এবং বিটিআরসির এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেটের পরিদর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শক দল রাজধানীর নিউমার্কেট, তুরাগ ও শাহআলী থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক মালামাল জব্দসহ ওই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতারের পর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়। জব্দ মালামালের মধ্যে টেলিটকের ৩ হাজার ৪০০ সিমের রিটেইলারে সম্পৃক্ততা যাচাই করতে বিটিআরসি ও র‌্যাবকে চিঠি দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসির পরিদর্শক দল ২৩ ও ২৪ মার্চ টেলিটকের নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার এবং প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেয়।

সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে সুপারিশে বলা হয়, অবৈধ ভিওআইপিতে ব্যবহৃত সিমগুলো একই  এনআইডির অনুকূলে একই সেলস পয়েন্ট থেকে কেনা হয়েছে। ওই এনআইডির অনুকূলে ব্যবহৃত এমএসআইএসডিএনএ সংযুক্ত আইএমইআইএর অনুকূলে একাধিক নম্বর বরাদ্দের ক্ষেত্রে টেলিটক ব্যবহৃত বায়োমেট্রিক নিবন্ধন/অ্যাকটিভেশন সিস্টেমটি ত্রুটিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে টেলিটকের সেলস ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড সিআরএম ডিভিশন এবং সিস্টেম অপারেশন ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সহায়তাসহ রিটেইলাররা সরাসরি এই অবৈধ কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এতে সিমগুলোর নিবন্ধন কাজে টেলিটকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়সহ টেলিটক মনোনীত ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলারের প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার বিষয়টি সুস্পষ্ট।

অবৈধ কল শনাক্তের যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার হচ্ছে না জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, টেলিটকের স্থাপনায় সরেজমিন পরিদর্শক দল কর্তৃক সেলফ রেগুলেটরি লজিকসমূহ নেটওয়ার্কে চালু করে সংখ্যাধিক সিম শনাক্ত করা হয়, যা প্রতিনিয়ত টেলিটকের কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে প্রয়োগ করার কথা। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে টেলিটকের ওই কার্যক্রম সঠিকভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির রেগুলেটরি টিম, আইটি ও বিলিং বিভাগের অনাগ্রহ রয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।

এতে আরও বলা হয়, অ্যাকটিভেশন প্রসেসে রিটেইলারের এলাকাপ্রতি আইডেন্টিফিকেশন করার পদ্ধতি না থাকায় অনায়াসে দেশের যে কোনো পয়েন্ট থেকে, এমনকি ঘরে বসেই দুষ্টচক্র সুবিধাজনক ব্যবস্থায় সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। একজন গ্রাহক ২৪ ঘণ্টায় ১৪ বার একই রিটেইলার পয়েন্টে এসে তার বায়োমেট্রিক নমুনা দিয়ে, এমনকি গভীর রাতে দোকান খুলে আঙুলের ছাপ দিয়ে সিম সংগ্রহ করবে, বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয়। পুরো পদ্ধতিটি ভুয়া সিম নিবন্ধন করার সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এ ক্ষেত্রে টেলিটকের সিস্টেম অপারেশন ডিভিশনের সম্পৃক্ততা ও রিটেইলারের ভূমিকা সন্দেহজনক মর্মে প্রতীয়মান হয়। এখানে প্রথমবার নিবন্ধিত সিমের বায়োমেট্রিক নমুনা কীভাবে অন্যান্য সময় অ্যাকটিভেশন অ্যাপে সন্নিবেশ করা হয় তা আরও অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে নিরূপণ করা প্রয়োজন।

টেলিটকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত থাকার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩ ফেব্রুয়ারি অবৈধ ভিওআইপি অভিযানে টেলিটকের জব্দ করা ৩ হাজার ৪০০টি সিম ডি-অ্যাকটিভেট করার জন্য বিটিআরসি বা অন্য কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নির্দেশনা দেয়নি। তা সত্ত্বেও টেলিটক কর্তৃপক্ষ স্বপ্রণোদিত হয়ে সিমসমূহ তাদের নেটওয়ার্কে ডি-অ্যাকটিভেট করেছে, যাতে করে তাদের অবৈধ ভিওআইপি কাজে ব্যবহৃত সিমগুলো চালু অবস্থায় অসাধু ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদান করে। অভিযানের পর পরই দ্রুত বন্ধ অর্থাৎ নেটওয়ার্কের তথ্য গোপন করায় সহায়তা প্রদানের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়।