বুধবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

এসব ষড়যন্ত্র কীসের আলামত

উন্নয়ন অগ্রযাত্রা থামাতে তৎপর রাষ্ট্রবিরোধী চক্র, আড়ালের রহস্যময় সিন্ডিকেট কারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে যখন করোনা মহামারী, অর্থনীতিকে সচল রাখার তীব্র সংগ্রাম, তখন কিছু মহল গভীর ষড়যন্ত্রে নেমেছে। পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল ও অস্থির করার চেষ্টা করছে। এ রকম ষড়যন্ত্রের একটি দৃশ্যমান ঘটনা ঘটল সোমবার। ঢাকার ৮ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা একটি মামলা সারা দেশকে হতবাক করেছে। এ মামলায় পরিকল্পিতভাবে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প পরিবার বসুন্ধরা গ্রুপকে টার্গেট করা হয়েছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, এটি আদতে কোনো হত্যা বা ধর্ষণের মামলা নয়, বরং বসুন্ধরা গ্রুপকে ধ্বংসের একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এ মামলায় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানকে আসামি করা হয়েছে, মুনিয়ার ঘটনার সঙ্গে যার কোনো ধরনের সংশ্রব বা সংশ্লিষ্টতা নেই, যিনি একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব। এই উদ্দেশ্যমূলক মামলায় মোট আটজন আসামির মধ্যে পাঁচজনই নারী।

রাজধানীর গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে ২৬ এপ্রিল মোসারাত জাহান মুনিয়া আত্মহত্যা করেন। তার মৃত্যুর পর তার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা করেন গুলশান থানায়। প্রশ্ন উঠেছে, মুনিয়ার মৃত্যুর পরপরই নুসরাত জাহান তানিয়া এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বললেন, আবার এখন তিনিই এটাকে হত্যাকান্ড বলছেন। কেন? অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে ব্লাকমেলিংয়ের উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা বলছেন, আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় নুসরাত শুধু বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অভিযুক্ত করেছিলেন। এখন তিনি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন আরও ব্যক্তিদের জড়ালেন। এর পেছনে উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। উদ্দেশ্য হলো বসুন্ধরা গ্রুপকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, এই গ্রুপের সুনাম হানি করা।

এ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় মুনিয়া ও হুইপপুত্র শারুনের কথোপকথন থেকে। এদের দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মুনিয়ার সঙ্গে শারুনের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে শারুন লিখেছিল, ‘তুমি কিছু করলে বসুন্ধরা গ্রুপ শেষ হয়ে যাবে।’ তাহলে কি বসুন্ধরা গ্রুপকে শেষ করতেই এই সাজানো মামলা? এমন প্রশ্ন এখন সর্বমহলে।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, কিছুদিন ধরেই সাইবারযুদ্ধে রয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে যুদ্ধাপরাধীদের টাকায় কিছু ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নোংরা, কুৎসিত, ভয়ংকর অপপ্রচারে নেমেছে। তারা আজগুবি সব কল্পকাহিনি ছড়িয়ে সরকার সম্পর্কে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এই গোষ্ঠী মুনিয়া ইস্যুকে লুফে নেয়। আবার সোমবারের মামলায় নুসরাতের আইনজীবী হলেন বিতর্কিত আইনজীবী এম সারোয়ার হোসেন, যিনি স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীর আইনজীবী। তাহলে এই মামলা কি রাষ্ট্রদ্রোহী, যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী এবং লন্ডনে পলাতক গোষ্ঠীর পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র? অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যারিস্টার সারোয়ারের বাড়ি পিরোজপুরের ইন্দুরকানী। তার বাবা আবদুল হাকিম হাওলাদার ছিলেন মুসলিম লীগের সদস্য এবং চিহ্নিত রাজাকার। উত্তরাধিকারসূত্রে তার পরিবারের সব সদস্যই বিএনপির রাজনীতি করে আসছেন। একসময় তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ছিলেন। ২০০৪ সালের দিকে সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে পরিচয় হয় তারেক রহমানের সঙ্গে। বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ২০১৩ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জ্বালাও-পোড়াও, নাশকতা ও রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকান্ডের নেতৃত্বেও ছিলেন সারোয়ার। এ-সংক্রান্ত মামলায় পাঁচ মাস জেলও খাটেন তিনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচনের জন্য সারোয়ারকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছিলেন তারেক রহমান। এখনো দেশের বাইরে বসে গ্রেনেড হামলা মামলার সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি তারেক রহমানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত রয়েছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রবিরোধী গুজব ও অপপ্রচার চালিয়ে যাওয়া সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যতম হোতা এই সারোয়ার। অনলাইনে আইপি টিভি এবং ফেসবুকে নামে-বেনামে পেজ খুলে চালিয়ে যাচ্ছেন ভয়াবহ অপপ্রচার। দেশের সাধারণ মানুষের আবেগ ও সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন সার্বক্ষণিক। মুনিয়া ইস্যুকে পুঁজি করে শুরু থেকেই সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে তির্যক মন্তব্য করে আসছিল চক্রটি। বসুন্ধরা গ্রুপের কর্ণধারসহ নিরপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসানোর অপচেষ্টা চক্রটির রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের সর্বশেষ সংযোজন। সরকারের বিরুদ্ধেই এটি আরেকটি চক্রান্ত। কারণ বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের রুটিরুজির সম্পর্ক রয়েছে। দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ এই শিল্পগ্রুপের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এ ধরনের কুৎসিত, আপত্তিকর ও ভিত্তিহীন অভিযোগে যদি এই গ্রুপটি ব্যবসা গুটিয়ে ফেলে তাহলে এর বিরূপ প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার, রাষ্ট্র। ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, শুধু বসুন্ধরা গ্রুপ নয়, এ ধরনের খামখেয়ালির মামলা ও মিথ্যাচার অন্য বড় শিল্পোদ্যোক্তাদেরও আতঙ্কে ফেলবে। তারাও ব্যবসা গুটিয়ে নেবেন। করোনা সংকটের এই সময়ে এটি দেশের অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইতিপূর্বে ওয়ান-ইলেভেনের আগে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের খেলায় মেতেছিল। এটি ছিল ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। এর পরপরই এসব ভুয়া এবং সাংবাদিকতার রীতিনীতিবিবর্জিত রিপোর্ট দিয়েই ওয়ান-ইলেভেন সরকার ক্ষমতা দখল করেছিল। সে রকম একটি পরিস্থিতি তৈরি করার জন্যই কি এ মামলা? মুনিয়ার মৃত্যুর পর পুলিশ তিন মাস ধরে তদন্ত করেছে। এরপর দেখা গেছে এটি আত্মহত্যা। একটি আত্মহত্যাকে হত্যাকান্ড বানানোর এই মহা ষড়যন্ত্রে নুসরাত একটি পুতুল। আর এই চক্রটিকে উসকে দিয়ে অর্থের জোগান দিচ্ছেন ভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী সংসদ সদস্য ও হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ওরফে বিচ্ছু সামশু এবং তার ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। এরা রাষ্ট্র এবং সরকারের জন্য বিপজ্জনক। আরও যারা এদের সঙ্গে রয়েছেন তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনই সংকটে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।

অর্থের জোগানদাতা বিচ্ছু সামশু সিন্ডিকেট : বিচ্ছু সামশু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারি করোনা ভ্যাকসিন চুরি, ইয়াবা ব্যবসা, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, ব্যাংকার মোর্শেদ হত্যাসহ একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছিল বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন গণমাধ্যম। এর জের ধরে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং এমডির বিরুদ্ধে এর আগেও মামলা করেছেন হুইপ সামশুল। মুনিয়া ইস্যুতে নুসরাতকে ‘দাবার গুটি’ বানিয়ে ফের অপতৎপরতা শুরু করেছেন তিনি। অনুসন্ধান বলছে, মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। শারুনের বিরুদ্ধে মুনিয়াকে হত্যার অভিযোগও উঠেছিল। বিচ্ছু সামশু এবং তার ছেলের বিপক্ষে কেউ অবস্থান নিলেই নেমে আসে ভয়ংকর নির্যাতন। প্রতিশোধ নিতে শারুন চৌধুরী এতটাই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন যে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেন না। আর নিজের অপকর্ম ঢাকতে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মুনিয়ার বোন নুসরাতকে কোটি টাকা দিয়ে বশ করে সাজানো মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিকে ফাঁসানোর অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ছয় নম্বর আসামি শারুন চৌধুরীর সাবেক স্ত্রী সাইফা রহমান মিম। তথ্যমতে, মুনিয়ার সঙ্গে শারুনের পরকীয়ার জের ধরে স্বামীর সংসার ছেড়ে এসেছিলেন মিম। শারুনের নানা অপকর্মের সাক্ষী থাকায় এবং শারুনের বিরুদ্ধে মামলা করায় ক্ষুব্ধ হয়ে নুসরাতের মামলায় এই মিমকেও ফাঁসানোর অপচেষ্টা হয়েছে। এমনকি প্রথম মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাকে সত্য তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করায় নতুন মামলায় আসামি করা হয়েছে নিরপরাধ বাড়িমালিক দম্পতিকেও। এ ছাড়া এ মামলায় আসামি করা হয়েছে গত মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসাকেও, যিনি গ্রেফতারের পর রিমান্ডে শারুন চৌধুরী সম্পর্কে স্পর্শকাতর বহু তথ্য ফাঁস করে দিয়েছিলেন।

সর্বশেষ খবর