বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

ইসির নির্দেশনা মানছে না কেউ

বিদায় বেলায় ইউপি নির্বাচন নিয়ে পাহাড় অভিযোগ

গোলাম রাব্বানী

দ্বিতীয়, তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ ও ৮ম ধাপের পৌরসভায় নির্বাচন ঘিরে অভিযোগের পাহাড় জমেছে নির্বাচন কমিশনসহ সারা দেশের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে। তবে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে মাঠ কর্মকর্তাদের নির্বাচন কমিশন নির্দেশনা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। বর্তমান কমিশনের বিদায় বেলায় কেউ তাদের নির্দেশনা মানছেন না। নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাত-সংঘর্ষ দিন দিন বেড়েই চলছে। সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় অনেকটা উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশন। কমিশন এ বিষয়ে বিব্রতবোধ হচ্ছে। তাই আজ মাঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করবে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি। ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছি। প্রশাসনের মাঠ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে আজ নির্বাচনী সহিংসতা, সংঘাত কমানোর বিষয়ে বৈঠক রয়েছে। ইসির কিছু কঠোর নির্দেশনা থাকবে। নির্বাচনী সংঘাত-সহিংসতার বিষয়ে মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে সেটা ঠিক, আমরা সেটি প্রত্যক্ষ করেছি। নির্বাচনের ব্যাপারে মাঠপর্যায়ে কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া দরকার সেটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। যেগুলো নিয়ে আমরা বিব্রত।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আমাদের একটাই মাত্র বক্তব্য সেটা হলো নির্বাচনের যেই সব বিষয় আপনারা (সাংবাদিকরা) উল্লেখ করেছেন, ওই ধাপগুলো মূলত নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। আপনাদের মাধ্যমে তাদের কাছে আমরা সোজা মেসেজ দিতে চাই। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে পরে কিন্তু এর দায় তাদের উপরই বর্তাবে। আমরা তাদেরও জবাবদিহিতার   অধীনে আনব। দলীয়ভাবে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন। যদিও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই বেশি অভিযোগ এসেছে ইসি সচিবালয়ে। অধিকাংশ প্রার্থী সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতসহ হয়রানিরও অভিযোগ তুলেছেন অনেক চেয়ারম্যান ও সাধারণ, সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীরা। এ জন্য নির্বাচনের সাত দিন আগে নির্বাচনী এলাকায় বিজিবি-র‌্যাব মোতায়েন করার আবেদনও করেছেন কয়েকজন  চেয়ারম্যান প্রার্থী। এ ছাড়া নির্বাচনে স্বাক্ষর জাল করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে ইসি একটি তদন্ত কমিটিও করেছে।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ৬ নং রাজগঞ্জ ইউপি নির্বাচনে সংঘর্ষ ও রক্তপাত এড়াতে নির্বাচনের সাত দিন আগে এলাকায় বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ মোতায়েনের আবেদন করেছেন ওই ইউপির স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদ আলম। তিনি ওই ইউপির আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। লিখিত অভিযোগে এই প্রার্থী বলেছেন, এই ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান নৌকার মার্কা পাওয়ার পর প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করছে। তাই তিনি নির্বাচনের সাত দিন আগে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের আবেদন করেছেন। 

বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনী পোস্টার ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে নির্বাচন অফিসে অভিযোগ দিয়েছে দুই পক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার রাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু তালেব আকন্দের নির্বাচনী পোস্টার ছেঁড়ার ঘটনা ঘটে। এটাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবু তালেব আকন্দের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী সংঘর্ষ হচ্ছে। এ বিষয়ে নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন অফিসে বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে। এ বিষয়ে বগুড়ার সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার মো. মাহবুব আলম শাহ্ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, আমাদের কাছে ১০/১২টি অভিযোগ এসেছে। আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি। বগুড়ার নির্বাচনী পরিবেশ ভালো রয়েছে।

এদিকে নির্বাচন কমিশন এ নির্বাচনে সহিংসতা কীভাবে কমানো যায়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে বসছে। ইসি সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকারের সভাপতিত্বে অনলাইনে আজ এই বৈঠক হবে। অনলাইন মিটিংয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে সংযুক্ত থাকবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। আর বিশেষ অতিথি হিসেবে সংযুক্ত থাকবেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। আসন্ন ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত সভায় যোগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সব বিভাগীয় কমিশনার, উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক, পুলিশ কমিশনার ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের সংযুক্ত থাকতে বলা হয়েছে।

তৃতীয় ধাপে ২২ ইউপিতে নৌকার প্রার্থী নেই : ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে ১ হাজার ৩টির মধ্যে ৯৮১টিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। বাকি ২২টিতে দলটির প্রতীকে কোনো প্রার্থী নেই। ফলে এসব ইউপি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকছে। মঙ্গলবার তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে আজ। বাছাইয়ে বাতিল বা বৈধ মনোনয়নপত্রের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের শেষ সময় আগামী ৭ নভেম্বর। আপিল নিষ্পত্তির শেষ দিন আগামী ১০ নভেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ আগামী ১১ নভেম্বর। চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে আগামী ১২ নভেম্বর। ওইদিন থেকেই শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার। আগামী ২৮ নভেম্বর এসব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ইসি জানিয়েছে, তৃতীয় ধাপে চেয়ারম্যানসহ তিনটি পদে ৫৩ হাজার ৮০১ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তাদের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৫ হাজার ২৮৫ জন, সংরক্ষিত সদস্য পদে ১১ হাজার ৪৬৯ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ৩৭ হাজার ৪৭ জন রয়েছেন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ২০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা অংশ নিয়েছেন এই ধাপে। তৃতীয় ধাপে ৫ হাজার ২৮৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে ৩ হাজার ৫৩৮ জন স্বতন্ত্র। তাদের বড় অংশই সরকারি দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। বিএনপি দলীয়ভাবে এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তবে তাদের সমর্থিত কেউ কেউ চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করছেন। তৃতীয় ধাপের জন্য ১৮৭টি ইউনিয়ন পরিষদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৪৩৮টিতে, জাকের পার্টি ৬৪টিতে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ২৫টিতে এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ১০টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী দিয়েছে। বাকি দলগুলোর প্রার্থীর সংখ্যা ১০ জনের কম। এ ছাড়া সংরক্ষিত সদস্যপদে ১১ হাজার ৪৬৯ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ৩৭ হাজার ৪৭ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। প্রথম ধাপে চলতি বছরের ২১ জুন ২০৪টি ইউপি এবং ২০ সেপ্টেম্বর ১৬০টি ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় ধাপে ৮৪৮টি ইউপির ভোট হবে আগামী ১১ নভেম্বর।

সর্বশেষ খবর