শনিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

দুর্ঘটনা না মৃত্যুফাঁদ

গ্যাস লিকেজ

জিন্নাতুন নূর

দুর্ঘটনা না মৃত্যুফাঁদ

গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর তালিকা কেবল বড়ই হচ্ছে। প্রচারের পরও কোনোভাবে এ দুর্ঘটনা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন গ্যাস লিকেজ থেকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর মতো করুণ পরিণতিকে সংশ্লিষ্টরা দুর্ঘটনা না বলে এক ধরনের মৃত্যুফাঁদ বলছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় যে গ্যাসলাইন বসানো আছে তা ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরনো। এগুলো থেকে গ্যাস লিক হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। এজন্য নিরাপত্তার স্বার্থে মাসে অন্তত একবার হলেও গ্যাসের গ্রাহকদের ঘরে গ্যাস লিক হচ্ছে কি না তা তদারকি করা প্রয়োজন বলে তারা পরামর্শ দিয়েছেন। গ্যাস লিকেজ থেকেই চলতি বছরের ২৭ জুন রাজধানীর মগবাজারের তিন তলা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয় বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার লোকজন ধারণা করেন। এ ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন শতাধিক মানুষ।

এ ছাড়া গত বছর নারায়ণগঞ্জের বাইতুস সালাত মসজিদে গ্যাস লিকেজের কারণে মারাত্মক দগ্ধ হন শিশুসহ ৩৭ মুসল্লি। মারা যান ২৪ জন। সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে তিনজন দগ্ধ হন। এর মধ্যে মামুনুর রশিদ মামুন নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলীর আদনান  টাওয়ারের সাত তলা ভবনের চার তলায় এ গ্যাস লিকেজ ঘটে। আর অক্টোবরে রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দুই যুবক গুরুতর আহত হন। তাদের শরীরের ৯০ শতাংশের বেশি পুড়ে যায়। ঘটনাস্থলে এসে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস লিকেজ থেকে এ বিস্ফোরণ ঘটেছে। চলতি নভেম্বরের শুরুতেই চট্টগ্রাম মহানগরের আকবর শাহ থানার উত্তর কাট্টলীতে ছয় তলা ভবনের ফ্ল্যাটে গ্যাসের লিকেজ থেকে আগুনে দগ্ধ হয়ে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। আর আগস্টে রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের একটি বাসার নিচতলায় বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট আগুনে শিশুসহ সাতজন দগ্ধ হন। ধারণা করা হচ্ছে, এখানেও গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে বিস্ফোরণটি ঘটেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ও আশপাশে যে অগ্নিদুর্ঘটনাগুলো ঘটছে তার প্রায় ৩০ শতাংশই গ্যাসসৃষ্ট। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির তথ্যে, ২০১৯-২০ সালে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে ৪ হাজার ৪৯৬টি। আর একই বছর এ কারণে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে ৩০৬টি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী সারা দেশ থেকে মাসে আগুনে পোড়া ৫০০ রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি হন। এর এক-পঞ্চমাংশেরই মৃত্যু হয় এবং এর ৪০ শতাংশই গ্যাসের আগুনে দগ্ধ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানী ঢাকায় এখন যে গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক আছে তা ‘টিকিং টাইম বোম’-এর মতো। যে কোনো মুহূর্তে এ বোম বিস্ফোরিত হয়ে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। কারণ ঢাকায় যে গ্যাসলাইন বসানো আছে তা ১৫-২০ বছর পুরনো। আর এগুলো থেকে গ্যাস লিক হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। তারা আরও বলেন, ঢাকায় যে লাইন দিয়ে ৫০ জন গ্রাহকের লাইনে গ্যাস আসার কথা সে লাইন দিয়ে ৫০০ গ্রাহককে গ্যাস দেওয়া হয়। ফলে সে লাইনে চাপ বেড়ে যাচ্ছে। আবার পাইপলাইনগুলো দুর্বল হওয়ায় এর প্রেসার নেওয়ার ক্ষমতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ লাইনগুলোয় জং ধরছে এবং যে লাইনগুলো খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা থেকেও গ্যাস লিক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঢাকা শহরের গ্যাস পাইপলাইনগুলোর কত জায়গায় যে লিকেজ আছে তা কেউ জানে না। আমাদের এখানে যখন একটি দুর্ঘটনা ঘটে তখন সবাই হুমড়ি খেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ লাইন মেরামত করে। এতে কোনো লাভ নেই। শহরে অসংখ্য অবৈধ লাইন আছে যে স্থানে ছোট-বড় লিকেজ হচ্ছে। এজন্য এ থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনা রোধে সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে। এর আওতায় পুরো পাইপলাইনটিকে সার্ভে করে অবৈধ সংযোগের মতো বিপজ্জনক পয়েন্ট চিহ্নিত করতে হবে এবং পুরনো লাইনগুলোও একই সঙ্গে পরিবর্তন করতে হবে। আর এমনটি করা না গেলে কেউই বিপন্মুক্ত হতে পারবে না।’ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ‘গ্যাসের গ্রাহকদের নিজেদেরই গ্যাসসৃষ্ট সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। গ্যাস লিকেজের মতো ঘটনায় গ্রাহকদের গা-ছাড়া ভাবের কারণে অনেক সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়। মাসে অন্তত একবার হলেও সবাইকে ঘরে গ্যাস লিক হচ্ছে কি না তা নিরাপত্তার স্বার্থে তদারকি করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংস্থাকেও এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর