বুধবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ টা

দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩

আগের থেকে এক ধাপ উন্নতি তবে স্কোর অপরিবর্তিত, দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা হতাশাজনক

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩

বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। টানা চতুর্থবারের মতো দুর্নীতিতে বাংলাদেশের স্কোর অপরিবর্তিত ২৬। গত এক দশকে দুর্নীতির সূচকের স্কোর ও অবস্থান একই থাকায় দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা হতাশাজনক। দুর্নীতির পেছনে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতা, মতপ্রকাশ ও জবাবদিহির অভাবকে অন্যতম কারণ বলে মনে করে টিআইবি। এ বছরও দুর্নীতির চিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী এ সংস্থার (টিআই) প্রকাশ করা ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২১’-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। যা গতকাল প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের হয়ে টিআইবি প্রতিবেদনটি ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে অষ্টমবারের মতো এবারও বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন (দুর্নীতির দ্বিতীয় শীর্ষ) এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১ দেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন, যা বিব্রতকর, উদ্বেজনক ও হতাশাজনক।

এর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ভয় বা অনুকম্পা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’র (জিরো টলারেন্স) কার্যকর প্রয়োগ এবং অপরাধের ‘দায়মুক্তি’র চর্চা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। দুর্নীতিবাজদের শক্তি, অবস্থান ও পরিচয় আমলে না নিয়ে শুধু দুর্নীতিবাজ হিসেবেই তাদের বিচারের আওতায় আনতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে (টিআইবি)।

সংস্থাটির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মন্জুর-ই-আলমের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২১ সালের সিপিআই অনুযায়ী ৮৮ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। ৮৫ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর, সুইডেন ও নরওয়ে এবং ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। আর ১১ স্কোর পেয়ে তালিকার সর্বনিম্ন দক্ষিণ সুদান, ১৩ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তালিকার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন সিরিয়া ও সোমালিয়া এবং ১৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে ভেনেজুয়েলা।

সিপিআই ২০২১ অনুযায়ী ১৮০ দেশের মধ্যে তালিকার নিচের দিক থেকে বাংলাদেশ গত বছরের সমান ২৬ স্কোর পেয়ে ১৩তম অবস্থানে আছে। গত (২০২০ সাল) বছর নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে ছিল ১২তম। দেশ ও অঞ্চলের ২০২১ সালের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) ১৪৭ নম্বরে।

এদিকে টিআইবির সূচকে ৮৮ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে যৌথভাবে তালিকার শীর্ষে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। এসব দেশে দুর্নীতি হয় সবচেয়ে কম। ৮৫ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর, সুইডেন ও নরওয়ে এবং ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় সুইজারল্যান্ড। এরপর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ডস (স্কোর ৮২), পঞ্চম লুক্সেমবার্গ (৮১), ষষ্ঠ জার্মানি (স্কোর ৮০), সপ্তম যুক্তরাজ্য (স্কোর ৭৮) ও অষ্টম স্থানে রয়েছে হংকং (৭৬)। ৭৪ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে নবম স্থানে আছে কানাডা, আয়ারল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও অস্ট্রিয়া। যৌথভাবে দশম স্থানে আছে ৭৩ স্কোর নিয়ে অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জাপান ও উরুগুয়ে।

আর ২০২১ সালের তালিকায় ১১ স্কোর পেয়ে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে দক্ষিণ সুদান। ১৩ স্কোর পেয়ে তালিকার নিম্নক্রম অনুযায়ী দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিরিয়া ও সোমালিয়া এবং ১৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন ভেনেজুয়েলা। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় কম দুর্নীতিগ্রস্তের দিক দিয়ে ৬৮ স্কোর নিয়ে ২৫তম অবস্থানে থেকে সবার ওপরে ভুটান, ৮৫তম ভারত (স্কোর : ৪০), ১০২তম শ্রীলঙ্কা। আর দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নিচে ১৭৪তম অবস্থানে আফগানিস্তান।

প্রতিবেদন তুলে ধরে বাংলাদেশের এ অবস্থানকে খুবই হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি জানান, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আটটি জরিপের ফলাফল থেকে সূচকটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে বাংলাদের দুর্নীতির চিত্র অনুযায়ী স্কোর পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ দুর্নীতি আগের মতোই আছে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘স্কোরটা হচ্ছে মূল বিষয়। অন্য কোনো দেশ খারাপ করার কারণে আমাদের অবস্থান আগের চেয়ে এক ধাপ এগিয়েছে। কিন্তু আমাদের স্কোর আগের মতোই ২৬ রয়ে গেছে। তাই আমাদের দুর্নীতি আসলে কমেনি। এটা হতাশাজনক। ১০ বছর ধরে আমরা ২৫, ২৬, ২৭ এ রকম প্রায় একই অবস্থানে আছি। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমরা আফগানিস্তানের পরে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে। কাজেই এ স্কোর আমাদের জন্য বিব্রতকর।’ তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির দুষ্ট চক্রের গ্রাস থেকে বের হতে পারিনি। কভিডের সময় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে। আমাদের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান, বিচারহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির কারণে দুর্নীতির উন্নয়নে ঘাটতি রয়েছে। সরকারের জিরো টলারেন্স থাকার পরও না কমার মূল কারণ এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের হাতে তারাই দুর্নীতিগ্রস্ত। দুর্নীতি কমানোর যে প্রতিষ্ঠানগুলো সেগুলো ভালো নয়। এর পাশাপাশি আরেকটি কারণ হলো প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আমরা দুর্নীতির হাতিয়ার মনে করি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কারণে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।’

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ২-৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি খাতে সেবা নিতে গিয়ে যারা ঘুষ প্রদানে বাধ্য হন তার ৮৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবায় অভিগম্যতা অসম্ভব। দুর্নীতি এখন আমাদের সাধারণ জীবনাচারের অংশ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুফল সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে তবে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক “যদি-কিন্তু” রয়েছে। আমাদের আইন আছে, রাজনৈতিক অঙ্গীকারও আছে। কিন্তু যাদের ওপর এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ভার, তার একাংশই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, দুর্নীতির ফলে লাভবান, দুর্নীতিকে সুরক্ষা দেন এবং দুর্নীতির প্রসারে কাজ করেন। তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনস্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।’

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর