শিরোনাম
সোমবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৩ ০০:০০ টা
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব

শান্তি সমৃদ্ধি কামনায় আখেরি মোনাজাত

গাজীপুর ও টঙ্গী প্রতিনিধি

শান্তি সমৃদ্ধি কামনায় আখেরি মোনাজাত

গাজীপুর জেলার টঙ্গীর তুরাগতীরে দুনিয়ায় শান্তি, মঙ্গল এবং আখেরাতে মুক্তিলাভের আশায় মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে মোনাজাতের মাধ্যমে গতকাল শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমা। এটি ছিল তাবলিগ জামাতের ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমা। মোনাজাতে লাখ লাখ মুসল্লি নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং দুনিয়ার সব বালামুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য কেঁদে বুক ভাসান। মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি কামনা করা হয়। উম্মাহর অগ্রগতি, ইহলৌকিক শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি এবং দীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার তৌফিক কামনা করা হয় আল্লাহতায়ালার কাছে। বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি ভারতের মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ বিন সা’দ কান্ধলভী আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। তিনি দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট থেকে ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ৩০ মিনিট স্থায়ী মোনাজাত পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াত এবং উর্দু ভাষায় পরিচালনা করেন। তাৎপর্যপূর্ণ এই  আখেরি মোনাজাতে জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তি, আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত চাওয়া হয়।

আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে গতকাল সূর্য উদয়ের আগে থেকে শুরু হয় ইজতেমামুখী ধনী দরিদ্র যুবক বৃদ্ধ নির্বিশেষে লাখো মানুষের ঢল। যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় গাড়ি না পেয়ে পায়ে হেঁটে মুসল্লিরা ধাবিত হয় ইজতেমা ময়দানে। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মুসল্লিরা অবস্থান নেন মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলিগলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে। ইজতেমাস্থলে পৌঁছতে না পেরে মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। ভোর থেকেই ফজরের নামাজ ও আখেরি মোনাজাতের জন্য পুরান খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন শিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষ। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি নারীরাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন। অনেকে ইজতেমা ময়দানে আসতে না পেরে মোবাইল ফোনে দূরদূরান্ত থেকেও মোনাজাতে শরিক হন।

যারা বয়ান করলেন : গতকাল ফজরের পর ভারতের মাওলানা মুরসালিনের বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার শেষ দিনের কার্যক্রম। তার বয়ান তর্জমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা আশরাফুল। পরে নাস্তার বিরতি দিয়ে ৯টা থেকে মাওলানা মোশাররফ তালিমের বয়ান করেন। সকাল সাড়ে ৯টার পর থেকে আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত তাবলিগের গুরুত্ব তুলে ধরে হিদায়াতি (দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি) বয়ান করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি ভারতের মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ বিন সা’দ কান্ধলভী। এ সময় তার বয়ানের বাংলায় অনুবাদ করেন বাংলাদেশের মাওলানা জিয়া বিন কাসিম। হিদায়াতি বয়ানের পর হয় আখেরি মোনাজাত।

বয়ানে যা বলা হয়েছে : হিদায়াতি বয়ানে বলা হয়, যে ব্যক্তি দীন ইসলামের বিধান অনুসারে চলবে এবং হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করবে, সে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াবি অর্জন করবে। নামাজের আগে আমাদের দিলে একিন বা ইমান পয়দা করতে হবে। তা না হলে নামাজের ফজিলত পাওয়া যাবে না।

ইজতেমায় নিরাপত্তা : বিশ্ব ইজতেমা ও আখেরি মোনাজাত ঘিরে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। র‌্যাব, পুলিশ, আনসার ব্যাটালিয়ন, গোয়েন্দা পুলিশসহ (ডিবি) বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করেন। মোড়ে মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা ও র?্যাবের হেলিকপ্টার দিয়ে টহল দেওয়া হয় ইজতেমার ময়দানসহ আশপাশের এলাকায়। এদিকে রাত থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও কামারপাড়া সড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

বিদেশিদের অংশগ্রহণ : বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের (নিজামুদ্দিন মারকাজের) মিডিয়া সমন্বয়কারী মো. সায়েম জানান, ৬৩টি দেশের ৯ হাজার ১১০ জন মুসল্লি যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, জর্ডান, আরব আমিরাত, ইথিওপিয়া, আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মুসল্লিরা অংশ নেন।

দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় ছয় মুসল্লির মৃত্যু : দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় ছয় মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। সবশেষ শনিবার রাতে আবু তাহের (৬৫) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জে। ইজতেমা ময়দানে জানাজা শেষে লাশ গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মিডিয়া সমন্বয়ক মোহাম্মদ সায়েম গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১৯ জানুয়ারি) ও শুক্রবার (২০ জানুয়ারি) রাতে অসুস্থ হয়ে পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু হয়। তারা হলেন- ঢাকার কদমতলী থানার পূর্ব জুরাইন এলাকার আবদুল হান্নান, গুলিস্তানের বঙ্গবাজার এলাকার ব্যবসায়ী বোরহান, সাভারের বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম, গাইবান্ধার আবদুল হামিদ মন্ডল ও বরগুনার মফিজুল ইসলাম। এর আগে প্রথমপর্বে আট মুসল্লি মারা যান। দুই পর্বে ১৪ মুসল্লি মারা গেছেন।

মোনাজাত শেষে জনজট ও যানজট : আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষজন নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লিরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করেন। এতে টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট। ১৩ জানুয়ারি আম বয়ানের মাধ্যমে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হয়। ১৫ জানুয়ারি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্ব শেষ হয়। চার দিন বিরতির পর ২০ জানুয়ারি শুরু হয় দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা। তা মোনাজাতের মধ্য দিয়ে গতকাল শেষ হয়। সেই সঙ্গে শেষ হলো এবারের (২০২৩ সালের) বিশ্ব ইজতেমা।

সর্বশেষ খবর